03/05/23

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

 হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) এর জীবনী

“প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকে আর এই উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি আবু উবায়দা।” [তাঁর শানে রাসূল -এর উক্তি]

তিনি ছিলেন উজ্জ্বল সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট হালকা-পাতলা ও বেশ লম্বা। তিনি এমন ছিলেন যাঁকে দেখলে চক্ষু ঠাণ্ডা হতো, যাঁর সাক্ষাতে হৃদয় সান্ত্বনা পেত আর অন্তর প্রশান্তি পেত ।
তিনি অনেক নম্র ভদ্র ছিলেন এবং অনেক লাজুক ছিলেন, কিন্তু যখন তিনি কোনো কঠিন কাজ সমাধান করতে যেতেন তখন তিনি সিংহের মতো সাহসী ও শক্তিশালী হয়ে যেতেন ।
যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল ধারালো তরবারির ন্যায়। তাঁর সাহসিকতা এমন ছিল যাঁকে মানুষ সাহসিকতার উদাহরণ হিসেবে পেশ করত ৷ তিনি হচ্ছেন উম্মতে মুহাম্মদীর আমীন (আমানতদার) ‘আমের বিন আব্দুল্লাহ বিন আল জাররাহ' । যিনি সবার কাছে আবু উবায়দা নামে পরিচিত ছিলেন । তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন: কোরাইশদের মধ্যে তিনজন ব্যক্তি যাঁরা সবচেয়ে উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী, উত্তম ব্যবহারের অধিকারী ও অত্যন্ত লাজুক। যদি তাঁরা কোনো কথা বলেন তবে মিথ্যা বলেন না। আর যদি কেউ তাঁদেরকে কোনো কথা বলে তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেন না। তাঁরা হচ্ছেন আবু বকর সিদ্দিক, উসমান বিন আফ্ফান ও আবু উবায়দা বিন জাররাহ।
হযরত আবু উবায়দা শুনিয়া তার প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের সারিতে ছিলেন। হযরত আবু বকর ইসলাম গ্রহণ করার পরের দিন তাঁর হাতেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত আবু বকর তাঁকে ও আব্দুর রহমান, উসমান বিন মাজউন, আরকাম বিন আবুল আরকামকে নিয়ে রাসূল -এর নিকটে যান । তাঁরা রাসূল -এর সম্মুখে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন । হযরত আবু উবায়দা ইসলাম গ্রহণ করার পর যতদিন মক্কায় অবস্থান করেছেন ততদিন তাঁকে কাফেরদের পক্ষ থেকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তিনি অন্য সাধারণ মুসলমানদের সাথে এমন কষ্ট-যাতনা, দুঃখ- বেদনা সহ্য করলেন যে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীরা সহ্য করেনি। মতো কষ্ট ভোগ করার পরও তিনি কখনো ইসলাম থেকে সামান্য বিচ্যুত হননি। কঠিন মসিবতেও তাঁর ধৈর্য ছিল পাহাড়সম। তিনি প্রতিটি কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাস্তবায়ন করতেন । কিন্তু বদরের যুদ্ধে আবু উবায়দা-কে এতো বেশি কষ্টে পতিত হতে হলো যে, যা কেউ ধারণাও করতে পারেনি।

মরণজয়ী যোদ্ধা যাঁরা আর যুদ্ধ থেকে ফিরে আসতে চাইত না হযরত আবু উবায়দা তাদের মতো শত্রুদের কাতারকে ভেদ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর আক্রমণ দেখে মুশরিকরা প্রচণ্ড ভয় পেল। অবস্থা এমন হয় যে, তিনি যার দিকে ছুটতেন সে অন্যদিকে দৌড়ে পালিয়ে যেত। তিনি এমনভাবে যুদ্ধ করতে লাগলেন যেন মৃত্যুই তাঁর একমাত্র কাম্য। কিন্তু এক লোক বার বার তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল। সে সবদিক দিয়ে মুশরিকদের মাঝে আর তাঁর মাঝে প্রাচীরের মতো অবস্থান নিল। তার কারণে আবু উবায়দা কোনোভাবেই সামনের দিকে যেতে পারছিলেন না। তিনি যতই সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে ছিলেন সে তাকে তত কঠিনভাবে তাঁর পথ রোধ করতে লাগল ।

অবশেষে আবু উবায়দা ইসলামের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে ওই লোকটির মাথায় তরবারি দিয়ে এক আঘাত করে দুখণ্ড করে দিলেন। এতে করে লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রিয় পাঠক! আপনি কি জানেন আবু উবায়দা কার মাথায় তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেছেন? হ্যাঁ সে আর কেউ নই, স্বয়ং আবু উবায়দার জন্মদাতা পিতা আব্দুল্লাহ বিন জাররাহ। আল্লাহর রাস্তায় তাঁর বাবা যখন বাধা হয়ে দাঁড়িছে তখন তিনি নিজ হাতেই তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেছেন। কতটুকু ঈমানের বলে বলীয়ান হলে তিনি এ কাজ করতে পেরেছেন তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না !!!
তাঁর এই কাজের প্রশংসা করে মহান আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন- لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَاذَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا وَابَاءَهُم أوْ أَبْنَاءَهُم أَوْ إِخْوَانَهُم أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أَوْلَابِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الإيْمَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوجِ مِنهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِى مِنْ تَحْتِهَا الانْهارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أَوْلَابِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থ- “(হে রাসূল) আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছে এমন কোনো জাতিকে আপনি পাবেন না যে, তারা এমন লোক ভালোবাসে যারা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, যদিও তারা তাদের পিতা, ছেলে, ভাই কিংবা নিজেদের গোত্রের লোক হয়ে থাকে.............” । [সূরা মুজাদালা-২২]

ইসলামের জন্য নিজ হাতে পিতাকে হত্যা করা হযরত আবু উবায়দা -এর জন্য আশ্চর্যজনক কিছুই নয়। কেননা তাঁর ঈমান এত বেশি ছিল তাঁর জন্য এটি কোনো ব্যাপারই ছিল না। যার কারণে রাসূল তাঁকে এই উম্মতের 'আমীন' (বিশ্বস্ত) বলে ঘোষণা করেন। হযরত মুহাম্মদ বিন জাফর বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: একদিন রাসূল -এর নিকটে খ্রিস্টানদের এক দল লোক আগমন করে । তারা বলল: হে আবুল কাসেম! আপনি আপনার সাহাবীদের থেকে এমন একজন লোক আমাদের মাঝে প্রেরণ করুন, যিনি আমাদের মাঝে আমাদের সম্পদগুলো বণ্টন করে দিবে। কেননা আপনারা মুসলমানরা আমাদের অতি প্রিয়ভাজন । রাসূল বললেন: তোমরা আমার নিকটে বিকালে এসো, আমি তোমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে প্রেরণ করব । হযরত উমর বলেন: আমি সেই দিন যোহরের নামাজে তাড়াতাড়ি গিয়েছি কেননা আমি ধারণা করেছি আমিই সেই ব্যক্তি হব ।

নামাজ শেষে রাসূল মামাহার তাঁর ডানে বামে তাকাতে লাগলেন। আমি একটু মাথা উঁচু করে বসেছি যাতে করে তিনি আমাকে দেখেন। আমার দিকে তাকানোর পূর্বেই রাসূল আবু উবায়দাকে দেখে তাঁকে ডাকেন । রাসূল বললেন: তুমি এদের সাথে গিয়ে তাদের মাঝের সমস্যাটি সঠিকভাবে সমাধান করে আস । আমি বললাম: আবু উবায়দা ‘রাসূল -এর বলা' সেই গুণের অধিকারী হয়ে গেল। হযরত আবু উবায়দা শিক্ষা শুধু বিশ্বস্তই ছিলেন না; বরং তাঁর মাঝে বিশ্বস্ততার মূল শক্তি প্রকাশিত হতো। আর বিভিন্ন ঘটনার দ্বারা তা প্রকাশিত হয়েছে। তেমনি একটি ঘটনা- রাসূল একদল লোককে কোরাইশদের এক কাফেলার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যে প্রেরণ করেন। হযরত আবু উবায়দাকে তাঁদের আমীর বানালেন। রাসূল -এর পক্ষ থেকে তাঁদের খাদ্য হিসেবে শুধু এক ব্যাগ খেজুর দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রতিদিন তাঁর সাথিদেরকে একটি করে খেজুর দিতেন। তাঁরা ওই খজুরটিকে বাচ্চারা যেমন মায়ের স্তন চুষতে থাকে তেমন করে চুষতে থাকতেন এরপর পানি পান করতেন। এভাবে ভ্রমণে একটি খেজুর দিয়ে তাঁরা সারা দিন কাটিয়ে দিতেন। তাঁর বিশ্বস্ততার আরেকটি ঘটনা- উহুদের যুদ্ধের সময় যখন মুসলমানরা মুশরিকদের আক্রমণে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিলেন, তখন তিনি সেই দশ জনের মধ্যে একজন ছিলেন, যাঁরা রাসূল -কে চারদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। যাতেকরে মুশরিকদের কোনো আক্রমণ রাসূল -এর গায়ে আঘাত না হানতে পারে । কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, রাসূল -এর দাঁত মোবারক ভেঙ্গে গেছে এবং তাঁর মাথায় লোহার দুইটি টুকরা ঢুকে গেছে। হযরত আবু বকর লোহার টুকরা দুইটি বের করার জন্য এগিয়ে গেলেন ।

হযরত আবু উবায়দা বললেন: আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আপনি একাজ আমাকে করতে দিন। হযরত আবু বকর তা তাঁকে করতে দিলেন। তিনি ভাবলেন যদি আমি এটি হাত দিয়ে খুলতে যাই তাহলে রাসূল কষ্ট পাবেন। তাই তিনি দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে টান দিলেন এতে লোহার একটি টুকরা বের হয়ে গেল, কিন্তু সাথে তাঁর সামনের একটি দাঁতও পড়ে গেল । তিনি আবার দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে টান দিলেন এতে লোহার দ্বিতীয় টুকরাটিও বের হয়ে গেল আর সাথে সাথে তাঁর সামনের দ্বিতীয় দাঁতটিও পড়ে গেল । হযরত আবু বকর বললেন: দাঁত ভেঙে যাওয়া লোকদের মধ্যে হযরত আবু উবায়দা সবচেয়ে উত্তম লোক ছিলেন।

প্রিয় পাঠক! কারণ তাঁর দাঁত অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো ভাঙ্গেনি; বরং তাঁর দাঁত রাসূল -এর খেদমতে ভেঙ্গেছিল। হযরত আবু উবায়দা রাসূল -এর সাথে সব যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। হযরত আবু বকর -এর হাতে খেলাফতের বাইয়াতের দিন হযরত উমর আবু উবায়দাকে বললেন: তোমার হাতটি প্রসারিত কর আমরা তোমার হাতে বাইয়াত হব। কেননা রাসূল বলেছেন: প্রতিটি উম্মতের একজন আমীন (বিশ্বস্ত) রয়েছে। আর এই উম্মতের আমীন (বিশ্বস্ত) হচ্ছ তুমি। হযরত আবু উবায়দা বললেন: আমি এমন ব্যক্তি থেকে অগ্রগামী হতে চাই না যাকে রাসূল তাঁর অসুস্থ অবস্থায় ইমামতি করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আর তিনি রাসূল -এর ইন্তেকাল পর্যন্ত আমাদের নামাজের ইমামতি করেছেন। (অর্থাৎ আবু বকর রা.')এরপর সবাই হযরত আবু বকর -এর হাতে বাইয়াত করলেন। হযরত আবু উবায়দা কতই না উত্তম ছিলেন। তিনি নিজে খেলাফতের দায়িত্ব পেয়েও তা ছেড়ে দিয়েছেন । হযরত আবু বকর -এর ইন্তেকাল হওয়ার পর খেলাফতের দায়িত্ব হযরত উমর -এর ওপর বর্তালো।

তিনি হযরত উমর -এর নেতৃত্ব আনুগত্যের সাথে মেনে নিলেন। তিনি কখনোই খলীফার নির্দেশ অমান্য করেননি। তবে একবার করেছিলেন । প্রিয় পাঠক! আপনি কি জানেন সেই নির্দেশটি কি ছিল? তখন হযরত আবু উবায়দা সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন যখন তাঁরা আল্লাহর সাহায্যে সিরিয়ার এলাকাগুলো একের পর এক বিজয় করছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে সিরিয়ার সব অঞ্চলে বিজয় দান করেন ৷ তিনি যখন সিরিয়ার ফোরাত নদীর তীরে পৌঁছেন, তখন সিরিয়াতে এমন মহামারী শুরু হয় যা সিরিয়াবাসীরা কখনো দেখেনি। এতে একের পর এক মানুষ মারা যেতে লাগল ।

হযরত উমর তাড়াতাড়ি তাঁর নিকটে পত্র দিয়ে একজনকে প্রেরণ করেন। তিনি যা লেখেছেন তা- আমার এক কাজে তুমি থাকা খুবই প্রয়োজন, তুমি ব্যতীত সেই কাজ কেউ করতে সক্ষম হবে না। সুতরাং যদি তোমার কাছে আমার এই পত্র সকালে আসে তাহলে তুমি আমার কাছে আসতে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেরি করবে না। আর যদি তোমার কাছে আমার পত্র সন্ধ্যায় আসে তাহলে তুমি আমার কাছে আসতে সকাল করবে না। হযরত আবু উবায়দা পত্রটি পেয়ে বললেন: আমীরুল মুমিনীনের প্রয়োজনের কথা আমি জানি । তিনি এমন একজনকে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছেন যে বেঁচে থাকার নয় । তারপর তিনি লেখলেন-
হে আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনার প্রয়োজনের কথা জানি। আমি মুসলমান সৈন্যদের মধ্যে আছি আর তাদেরকে ছেড়ে যাওয়ার আমার কোনো ইচ্ছা নেই। এমনকি যতক্ষণ না আমার আর সৈন্যদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা কোনো ফয়সালা করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।

যখন উমর এই চিঠি পাঠ করে তার চোখের কোণে পানি জমে গেল এবং তা টপটপ করে পড়তে শুরু করল। তাঁর কান্না দেখে তাঁর আশপাশের লোকেরা জিজ্ঞেসা করল- আবু উবায়দা কি মারা গেছে? তিনি বললেন: না, তবে মৃত্যু তার অতি নিকটে । হযরত উমর -এর ধারণা মিথ্যা হয়নি। অবশেষে হযরত আবু উবায়দা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তিনি মৃত্যুর আগে তাঁর সেনাবাহিনীকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন: তোমরা নামাজ কায়েম করবে, রমজানের রোজা রাখবে, সকাহ করবে, হজ্ব ও উমরা আদায় করবে, অন্যকে ভালো উপদেশ দিবে আর তোমাদের আমীরদের কল্যাণ কামনা করবে এবং তাঁদের সাথে প্রতারণা করবে না। তোমাদেরকে যেন দুনিয়া ধ্বংস করে না দেয়। কেননা কোনো ব্যক্তি যদি হাজার বছরও বেঁচে থাকে তবুও তাকে মরতে হবে ।
আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানদের জন্য মৃত্যুকে আবশ্যক করেছেন। সুতরাং তারা মৃত । তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম সে, যে তার প্রতিপালকের আনুগত্য করে এবং পরকালের জন্য আমল করে। তোমাদের ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক । তারপর তিনি মুয়াজ -এর দিকে তাকিয়ে বললেন: হে মুয়াজ! তুমি এদের নামাজের ইমামতি করবে। এর কিছুক্ষণ পর তাঁর পবিত্র রূহ মোবারক উড়ে গেল ।

তারপর মুয়াজ মানুষের উদ্দেশ্যে বললেন: হে মানুষ সকল! তোমরা এমন একজন মানুষকে হারিয়েছ, আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর থেকে অধিক পুণ্যবান লোক দেখতে পাইনি, যিনি গুনাহ্ থেকে অনেক দূরে থাকতেন এবং পরকালের ব্যাপারে অধিক আগ্রহী ছিলেন। মানুষের কল্যাণকামী তাঁর মতো আর কাউকে আমি দেখিনি। তোমরা তাঁর জন্য রহমতের দোয়া কর আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করবেন।

তথ্য সূত্র
১. ত্বাবাকাতু ইবনি সা'দ - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
২. আল ইসাবা - ২য় খণ্ড, ২৫২ পৃ.।
৩. আল ইসতিয়া’ব -৩য় খণ্ড, ২ পৃ.।
৪. হুলিয়াতুল আওলিয়া - ১ম খণ্ড, ১০০ পৃ.
৫. আল বাউ ওয়াত্ তারীখ – ৫ম খণ্ড, ৮৭ পৃ.
৬. ইবনু আসাকির - ৭ম খণ্ড, ১৫৭ পৃ.
৭. সিফাতুস্ সফওয়া ১ম খণ্ড, ১৪২ পৃ.
৮. আশ্হারু মাশাহীরিল ইসলাম - ৫০৪ পৃ.।
৯. তারীখুল খামীস - ২য় খণ্ড, ২৪৪ পৃ.।
১০. আর রিয়াদুন নাদরাহ্ - ৩০৭ পৃ. ।

 হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এর জীবনী

“কোরআন যেভাবে সিক্ত সতেজ নাযিল হয়েছে সেইভাবে পড়তে যার ভালো লাগে সে যেন ইবনে উম্মে আব্দ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ)-এর মতো করে পড়ে।” [তাঁর কিরাত সম্পর্কে রাসূল -এর উক্তি]

তখন তিনি খুব ছোট ছিলেন। কিশোর বয়স তাঁর থেকে তখনো কাটেনি। সেই সময়ে তিনি জন-মানব থেকে অনেক দূরে মক্কা নগরীর এক কোণে উব্বা বিন আবু মুয়িতের ছাগল চরাতেন। উব্বা ছিল মক্কার নেতাদের অন্যতম যে রাসূল ও মুসলমানদেরকে অনেক বেশি কষ্ট দিত। এই ছোট বালকটিকে মানুষ ইবনে উম্মে আবদ বলে ডাকতো। তাঁর নাম আব্দুল্লাহ আর তাঁর পিতার নাম মাসউদ।
মক্কার অন্যান্য মানুষের মতো এই বালকও রাসূল-এর আগমনের কথা শুনেছেন। কিন্তু তাঁর বয়স কম হওয়ার কারণে তাঁর মাঝে এ ব্যাপারে কোনো উদগ্রীব সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া তিনি সমাজ থেকে অনেক দূরে ছিলেন। সম্ভবত এ কারণেও তাঁর মাঝে এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। তিনি প্রতিদিন সকাল বেলা ছাগল নিয়ে বের হয়ে যেতেন আর সন্ধ্যা বেলা ফিরে আসতেন । তারই মধ্যে একদিন এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। তিনি দুইজন বয়স্ক ব্যক্তিকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। তাঁরা অনেক ক্লান্ত ছিলেন। তাঁদের পিপাসাও চরমে ছিল। পিপাসার কারণে তাঁদের দুই ঠোঁট ও গলা শুকিয়ে গেছে । তাঁরা তাঁর নিকটে এসে সালাম দিয়ে বললেন: হে বালক! তোমার বকরিগুলো থেকে আমাদেরকে সামান্য দুধ দোহন করে দাও। যাতেকরে আমরা দুধ পান করে নিজেদের পিপাসা নিবারণ করতে পারি এবং শিরা উপশিরাগুলো সিক্ত করতে পারি ।

তিনি বললেন: আমি তা করব না। কেননা ছাগলগুলো আমার নয়, আমি এগুলোর জিম্মাদার মাত্র। তিনি আরো বললেন: এ কথা বলার পরেও ওই দুই লোকের মাঝে কোনো হতাশা আসেনি; বরং তাঁরা তাঁর কথা শুনে তাঁর ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন । তারপর তাঁদের একজন বললেন: আমাদেরকে এমন একটি ছাগল দেখিয়ে দাও যে এখনো দুধ দেয়নি। তিনি একটি ছোট ছাগল দেখিয়ে দিলেন। তখন তাঁদের দুইজনের একজন ছাগলটির কাছে গিয়ে সেটিকে ধরলেন। তারপর লোকটি ছাগলের ওলানে হাত বুলাতে লাগলেন। তিনি তাতে বিসমিল্লাহ পাঠ করলেন। আর বালকটি অবাক চোখে দেখতে লাগল ।

তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন- এই ছোট ছাগল যার এখনো স্তনের বোঁটা ও ফুটেনি সে দুধ দিবে? কিন্তু কিছুক্ষণ পর ছাগলটির স্তন ফুলে উঠল এবং তীব্র বেগে দুধ দিতে শুরু করল। অন্য লোকটি মধ্যখানে গভীরতাবিশিষ্ট একটি পাথর নিয়ে এলেন এবং তা দুধ দ্বারা পূর্ণ করে নিলেন। তারপর তাঁরা উভয়ে দুধ পান করলেন । বালকটি বললেন: কিন্তু আমি নিজ চোখে যা দেখেছি তা নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না । এটা কিভাবে সম্ভব?
যখন তাঁরা চলে যাচ্ছিলেন তখন বরকতময় হাতওয়ালা লোকটি ছাগলের স্তনকে লক্ষ্য করে বললেন: বন্ধ হয়ে যাও। তারপর তা আগের মতো হয়ে গেল । তিনি বললেন: তখন আমি ওই লোকটিকে বললাম: আপনি যে কথা বলে এই কাজ করেছেন তা আমাকে শিখিয়ে দিন ।
লোকটি বললেন: অবশ্যই (অতিশীঘ্রই) তুমি শিক্ষাপ্রাপ্ত বালক হবে।

এ ঘটনা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ-এর প্রথম ঘটনা, যা তাঁকে ইসলামের দিকে পথ দেখাল ৷ সম্মানিত পাঠক! আপনি কি জানেন ওই দুইজন লোক কে ছিলেন? তাঁরা আর অন্য কেউ না; বরং তাঁদের একজন স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ আর অন্যজন তাঁরই সাহাবী হযরত আবু বকর । ওই দিন তাঁদেরকে কাফেররা অনেক বেশি কষ্ট দেওয়ার কারণে তাঁরা সেই গিরিপথের দিকে যান। আর তীব্র গরমের কারণে অনেক পিপাসার্ত হয়ে গেলেন। আর এ কারণে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের এই অলৌকিক ঘটনা দেখার সৌভাগ্য হলো। এ বালক রাসূল -কে ও তাঁর সাহাবীদেরকে অনেক বেশি মহব্বত করতেন। তাঁর আমানতদারিতা ও হিম্মত দেখে স্বয়ং রাসূল অবাক হতেন। তাছাড়া তিনি ভালো কাজে অনেক অগ্রগামী ছিলেন ।

এরপর কিছু দিন পার না হতেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি নিজেকে রাসূল -এর খেদমত করার জন্যে পেশ করেন। রাসূল তাঁর এই আরজিকে কবুল করেন এবং তাঁকে তাঁর খাদেম হিসেবে রেখে দিলেন। ওই দিন থেকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ছাগল চরানো বাদ দিয়ে শ্রেষ্ঠ মানবের খেদমতে নিয়োজিত হলেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ তখন থেকে রাসূল -এর খেদমতে নিজেকে উজাড় করে দিতে লাগলেন। তাঁর আবাসে-নিবাসে, ঘরে-বাইরের সঙ্গী হয়ে গেলেন। রাসূল যখন ঘুমাতেন তিনি জাগ্রত থেকে পাহারা দিতেন। গোসল ও অযু করার সময় পানি এনে দিতেন। রাসূল ঘর থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করলে তিনি জুতা পরিয়ে দিতেন। আবার ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে তিনি জুতা খুলে দিতেন। তিনি রাসূল-এর মিসওয়াক ও লাঠি বহন করতেন। আর যখন রাসূল কক্ষে প্রবেশ করতেন তিনি তাঁর সাথে প্রবেশ করতেন। তাঁর সাথে রাসূল এর সাথে এমন সম্পর্ক হয়ে যায় যে, তিনি রাসূল -এর কাছে যখন ইচ্ছে তখন আসার অনুমতি পেয়ে ছিলেন।

রাসূল -এর ঘরে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রনি বেড়ে উঠেন। আর তাই তিনি রাসূল -এর প্রচারিত আদর্শে আদর্শিত হয়ে এবং তাঁর চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে বড় হলেন। তিনি রাসূল -কে প্রতিটি কাজে অনুসরণ করতেন। আর এই কারণে তাঁকে বলা হতো তিনি চরিত্র ও আকৃতির দিক দিয়ে রাসূল -এর সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন । হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাসূল -এর নিকটে থাকার কারণে তিনি শরিয়তের জ্ঞান সম্পর্কে ভালো জানতেন। আর তিনিই ছিলেন সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ক্বারী এবং সবচেয়ে বড় ফকীহ।
তাঁর জ্ঞান কেমন ছিল তা একটি ঘটনা বর্ণনা করলেই আমাদের বুঝে আসবে । হযরত উমর আরাফার ময়দানে অবস্থান করছিলেন। তখন এক লোক তাঁর দিকে এগিয়ে এসে বলল: হে আমীরুল মুমিনীন! আমি ‘কুফা’ থেকে এসেছি এবং সেখানে এমন একজন লোককে রেখে এসেছি যে নিজের থেকে কোরআনের ব্যাখ্যা করে। হযরত উমর এই কথা শুনে খুব রাগান্বিত হলেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে মতো বেশি রাগান্বিত হতেন না। তিনি বললেন: তোমার ধ্বংস হতো ! সেই লোকটি কে? লোকটি বলল: তিনি হলেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ । আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ঘুম-এর কথা শুনে তাঁর রাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেল এবং তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসলেন । হযরত উমর বললেন: তোমার জন্য আফসোস্ ! আমার জানা মতে, কোরআনের ব্যাখ্যা করার মতো তাঁর থেকে অধিক যোগ্য আর কেউ নেই । তিনি আরো বললেন: একদিন রাসূল আবু বকরের নিকটে গিয়ে মুসলমানদের সম্পর্কে আলোচনা করলেন তাদের সাথে আমিও ছিলাম। এরপর রাসূল সেখান থেকে বের হলে আমরাও তাঁর সাথে বের হলাম। এমন সময় আমরা দেখলাম এক ব্যক্তি নামাজ পড়তেছে, কিন্তু তাঁকে আমরা চিনতে পারিনি ।

রাসূল দাঁড়িয়ে তাঁর কেরাত শুনতে লাগলেন। এরপর বললেন: কোরআন যেভাবে সিক্ত সতেজ নাযিল হয়েছে যার ইচ্ছা সেভাবে পড়বে সে যেন উম্মে আবদ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ)-এর মতো করে পড়ে । তারপর আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ দোয়া করতে বসলেন। রাসূল বললেন: তুমি চাও আর তুমি যা চাইবে তা তোমাকে দেওয়া হবে, তুমি চাও আর তুমি যা চাইবে তা তোমাকে দেওয়া হবে। এরপর হযরত উমর আম বললেন: আমি মনে মনে বললাম: রাসূল তাঁর দোয়ার সাথে আমীন বলেছেন এ সুসংবাদটি কাল সকালে অবশ্যই আমি তাঁকে দিব। আমি সকালে তাঁকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্যে গেলাম। গিয়ে দেখি আবু বকর আমার আগে তাকে সুসংবাদ দিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়........ আল্লাহর কসম করে বলি, আমি কখনো কোনো ভালো কাজে আবু বকরকে পেছনে ফেলতে পারিনি।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর জ্ঞানের পরিমাণ মতো বেশি ছিল যে, তিনি নিজেই বলেতেন- যে সত্ত্বা ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ্ নেই তাঁর শপথ! কোরআনের এমন কোনো আয়াত নেই সেটি সম্পর্কে আমি জ্ঞাত নই। প্রতিটি আয়াত কোথায় নাযিল হয়েছে এবং কোন প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে সে সম্পর্কে আমি পূৰ্ণ জ্ঞাত আছি। আমি যদি জানতে পারি, কোরআন সম্পর্কে কেউ আমার থেকে অধিক জানে, আর তাঁর কাছে গমন করা আমার সক্ষম হয় তাহলে অবশ্যই আমি তাঁর কাছে গমন করতাম । হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের বলা কথাটি একটু অতিরিক্ত ছিল না; বরং তাঁর জ্ঞান সাহাবীদের দ্বারা স্বীকৃত ছিল।

আর এরূপ একটি ঘটনা- হযরত উমর একটি কাফেলার সাথে পথ চলছিলেন, তখন ছিল অন্ধকার রাত। আর ওই কাফেলাতে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদও ছিলেন। হযরত উমর এক ব্যক্তিকে এ কথা ঘোষণা করার নির্দেশ দিলেন যে, কাফেলা কোথায় থেকে এল? কাফেলার ভেতর থেকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ উত্তর দিলেন- বহু দূর দূরান্ত থেকে । হযরত উমর বললেন: তোমরা কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছ?

তিনি উত্তরে বললেন: প্রাচীন গৃহে ৷ হযরত উমর বললেন: নিশ্চয়ই এই কাফেলায় কোনো আলেম আছেন। তিনি এক লোককে নির্দেশ দিলেন, জিজ্ঞেস কর- কোরআনের কোনো আয়াতটি সবচেয়ে ফযিলত পূর্ণ ?
তিনি উত্তরে বললেন:
اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَومٌ.
অর্থ- “আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরজীবী ও অবিনশ্বর তাকে ঘুম ও তন্দ্রা স্পর্শ করে না......” (সূরা বাকারাহ্ ২৫৫নং আয়াত)

হযরত উমর আমিতো বললেন: তাঁদের কে জিজ্ঞেস কর, কোরআনের কোন আয়াতটি অধিক প্রজ্ঞাময়? তিনি উত্তরে বললেন: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَنِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمُنكَرِ وَالبَغِي يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُم تَذَكَّرُونَ
অর্থ- “অবশ্যই আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণতা, সদাচারণ ও আত্মীয় স্বজন কে দান করার নির্দেশ দেন” (সূরা নাহলো ৯০নং আয়াত)

হযরত উমর জমির মা বললেন: তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কোরআনের কোন আয়াতটি সব থেকে ব্যাপক? তিনি উত্তরে বললেন: فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
অর্থ- “যে ব্যক্তি সামান্য পরিমাণ নেক আমল করবে সে তার প্রতিদান দেখতে পাবে, আর যে ব্যক্তি সামান্য পরিমাণ বদ আমল করবে সে তারও প্রতিদান দেখতে পাবে” (সূরা যিলযাল ৭৩৮ নং আয়াত)

হযরত উমর রাদিয়ালার বললেন: তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কোরআনের কোন আয়াতটি অন্তরে অধিক ভয় সৃষ্টি করে? তিনি উত্তরে বললেন:
لَّيسَ بِأَمَانِيَكُم وَلَا أَمَانِ أَهْلِ الْكِتَبِ مَن يَعْمَلْ سُوءًا يُجِزَ بِهِ وَلَا يَجِد لَهُ . مِن دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
অর্থ- “তোমাদের ইচ্ছে মতো নয় আবার আহলে কিতাবদের ইচ্ছে মতও নয়; বরং যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজ করবে তাকে তার শাস্তি পেতে হবে, সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিজের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী হিসেবে পাবে না” (সূরা নিসা ১২৩নং আয়াত)

হযরত উমর বললেন: তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কোরআনের কোন আয়াতটি অন্তরে আশা জাগায়? তিনি উত্তরে বললেন: قُل يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِم لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحِمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَعْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
অর্থ- “আপনি বলুন, আমার যে সকল বান্দারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে তারা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নৈরাশ না হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল এবং দয়ালু”(সূরা যুমার : ৫৩নং আয়াত)

হযরত উমর বললেন: তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তোমাদের মাঝে কি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ আছে? তাঁরা বললেন: হ্যাঁ। হযরত উমর -এর করা প্রশ্নগুলোর উত্তর হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ দিয়েছেন। এতে বুঝা যায় তার জ্ঞানের পরিধি কত বিশাল ছিল । হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ শুধু কেবল আলেম, কারী ও আবেদই ছিলেন না; বরং তিনি একজন সাহাসী, অগ্রগামী একজন মুজাহিদও ছিলেন। রাসূল -এর পর পৃথিবীর বুকে তিনিই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে উচ্চ স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন ৷ রাসূল -এর সকল সাহাবী একত্রিত হয়ে পরামর্শ করতে লাগলেন কে কোরইশদেরকে কোরআন পাঠ করে শুনাবে। কেননা মুসলমানগণ তখন খুবই দুর্বল ছিলেন।

তাঁরা বলতে লাগলেন- আল্লাহর শপথ! কোরাইশরা কখনো এই কোরআন উচ্চ স্বরে শুনেনি সুতরাং কে এমন আছে যে কোরাইশদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনাবে? হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বললেন: আমি তাদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনাব । তিনি বললেন: আল্লাহর রহমত । হযরত উসমান বদিয়ারায় বললেন: তুমি গত দুই বছর ধরে যে ভাতা নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন, আমি কি সে ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দিব?

তিনি বললেন: আমার তা প্রয়োজন নেই । হযরত উসমান বললেন: তোমার মৃত্যুর পর তা তোমার মেয়েদের কাজে লাগবে । তিনি বললেন: আমার মেয়েরা গরিব হয়ে যাবে আপনি কি এ ভয় করছেন? আমি তাদেরকে প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়া পাঠ করার আদেশ দিয়েছি। আর আমি রাসূল -কে বলতে শুনেছি- তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়া পাঠ করবে তাকে কখনো দারিদ্র্যতা স্পর্শ করবে না । যখন রাত ঘনিয়ে আসল হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ তাঁর প্রভুর জিকির করতে করতে তাঁর নিকটে চলে গেলেন । মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামাজ আদায় করেন। তাদের মধ্যে জুবাইর বিন আওয়ামও ছিলেন । তারপর তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। আল্লাহ তাঁর প্রতি বিশেষ
রহমত করুন ।

তথ্য সূত্র ১. আর ইসাবা - ২য় খণ্ড, ৩৬৮ পৃ.। ২. আল ইসতিয়া’ব - ২য় খণ্ড, ৩১৬ পৃ. ৩. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী - ২য় খণ্ড, ১০০-১০৪ পৃ.। ৪. তাযকিরাতুর হুফ্ফাজ - ১ম খণ্ড, ১২-১৫ পৃ.।
৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া - ৭ম খণ্ড, ১৬২-১৬৩ পৃ. ।
৬. ত্ববাকাতুশ্ শা’রানী - ২৯-৩০ পৃ. ৷
৭. শাযরাতুয্ যাহাব - ১ম খণ্ড, ৩৮-৩৯ পৃ.
৮. উসদুল গবাহ্ - ৩য় খণ্ড, ৩৮৪-৩৯০ পৃ.
৯. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা - ১ম খণ্ড, ৪৬১-৫০০ পৃ.।
১০. সিফাতুস্ সয়া ১ম খণ্ড, ১৫৪-১৬৬।
১১. মুসনাদুল ইমাম আহমাদ - ৫ম খণ্ড, ২১০ পৃ.।
১২. দালায়িলুন নুবুয়্যাহ্ - ২৭৩ পৃ. ।

 হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহ্স (রাঃ) এর জীবনী

“ইসলামে যাঁকে সর্বপ্রথম আমীরুল মুমিনীন বলে অভিহিত করা হয়েছে।” যে সকল সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে আব্দুল্লাহ বিন জাস তাঁদের মধ্যে একজন । ইসলামের প্রথম যুগে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি রাসূল -এর ফুফাতো ভাই ছিলেন। কেননা আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা উমাইমা ছিলেন তাঁর মাতা। যিনি রাসূল নাহার-এর আপন ফুফু ছিলেন। অন্যদিকে তিনি রাসূল -এর শ্যালক ছিলেন। কেননা তাঁর বোন যায়নাব বিনতে জাস রাসূল -এর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

তাছাড়াও হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহস ইসলামের ঝাণ্ডা বহনকারী প্রথম যোদ্ধা ছিলেন। তিনি সেই ব্যক্তি যাকে সর্বপ্রথম আমীরুল মুমিনীন বলে ডাকা হয় । রাসূল সাপ্নাহার দারুল আরকামে প্রবেশ করার পূর্বে আব্দুল্লাহ বিন জাহস ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন । কোরাইশদের অত্যাচার বেড়ে গেলে রাসূল মুসলমানদেরকে দ্বীন বাঁচানোর জন্যে মদিনায় হিজরত করতে অনুমতি প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ বিন জাহস অনুমতি পেয়ে মদিনায় হিজরত করেন। তিনি হিজরতকারীদের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি। তাঁর পূর্বে শুধু আবু সালামা হিজরত করেছিলেন। কিন্তু ঘর- বাড়ি, পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে হিজরত করা তাঁর অপরিচিত ছিল না । কেননা মদিনায় হিজরত করার পূর্বে তিনি হাবশায়ও হিজরত করেছিলেন।

তাই মদিনায় হিজরত করার সময় হিজরত করার কষ্ট তাঁর জন্য নতুন ছিল না। তাঁর হাবশায় হিজরত ছিল একাকি, কিন্তু মদিনায় হিজরত ছিল অনেক ব্যাপক। কারণ তখন তাঁর সাথে তাঁর বাবার সকল সন্তান, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী ও দাস-দাসীসহ পুরো পরিবারের সকলে একত্রে মদিনায় হিজরত করেন। তাঁর পরিবারটি ছিল একটি ইসলামী পরিবার। যে পরিবারের সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা সামান্য দূরে না যেতেই, তাঁদের ঘরগুলো নিরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল । মনে হয় যেন কখনো কোনো মানুষ এই বাড়িতে ছিল না। কোনো লোক কোনো দিন এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেনি। তাঁরা হিজরতে যাওয়ার কিছুদিন পরই মক্কার নেতারা বের হলো মুসলমানদের কে কে চলে গেছে আর কে কে বাকি আছে তা দেখার জন্যে। আবু জাহেল, উতবা ও অন্যান্যরা ঘুরে ঘুরে তা দেখতে লাগল । উতবা দেখল জাহসের ছেলেদের ঘরগুলোর দরজা বন্ধ, সেখানে সব কিছু একেবারে নিস্তব্ধ। সে বলল: জাহসের ছেলেদের ঘরগুলো তাদের জন্য কাঁদছে। আবু জাহেল বলল: এরা এমন কে যাদের জন্য তাদের ঘর কাঁদবে? তারপর আবু জাহেল আব্দুল্লাহ বিন জাহসের ঘরে ঢুকে যা কিছু পেল সব নিয়ে গেল । মনে হচ্ছিল সে এগুলোর মালিক । যখন এ কথাগুলো আব্দুল্লাহ বিন জাহসের কানে যায় তিনি তা রাসূল -এর নিকটে বলেন। রাসূল তাঁকে বললেন: এই ঘরের বিনিময়ে জান্নাতে তোমার জন্য একটি ঘর হবে তুমি কি এতে খুশি না?

তিনি বললেন: অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল বললেন: তাহলে তোমার জন্যে তাই হবে।
এ কথা শুনে তাঁর অন্তর শান্তি পেল এবং তাঁর চক্ষু শীতল হলো। হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহস মদিনায় গিয়ে এখনো ভালোভাবে অবস্থান গ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি মক্কা থেকে হিজরত করে আসার কষ্ট ক্লান্তিও দূর হয়নি। এর মধ্যেই আল্লাহ তাআলা চাইলেন তাঁকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন করবেন। তিনি এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে এ পর্যন্ত মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হননি । আপনাদেরকে জানানোর জন্যে আমরা সেই ঘটনা নিচে তুলে ধরলাম । রাসূল তাঁর আটজন সাহাবীকে ইসলামের প্রথম সামরিক দায়িত্ব দিয়ে মক্কার পথে প্রেরণ করেন। তাঁদের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন জাহস ও সা'দ বিন ওক্কাস্ ছিলেন। রাসূল বললেন: আমি তোমাদেরকে অবশ্যই এ ব্যাপারে আদেশ দিচ্ছি যে, তোমরা ক্ষুধা ও পিপাসায় ধৈর্য ধারণ করবে। তারপর তিনি আব্দুল্লাহ বিন জাহসকে তাঁদের আমীর বানিয়ে তাঁর হাতে ঝাণ্ডা তুলে দিলেন। এ কারণেই তিনি হলেন মুসলমানদের প্রথম ব্যক্তি যাকে রাসূল মুসলমানদের আমীরের দায়িত্ব প্রদান করেন ।

রাসূল তাঁদের যাওয়ার দিক ঠিক করে দিলেন। তিনি আব্দুল্লাহর নিকটে একটা চিঠি দিয়ে বললেন: তিনি যেন এই চিঠি দুই দিন সফর করার পূর্বে খুলে না দেখেন। যখন দুই দিন সফর শেষ হলো তিনি তা খুলে দেখলেন। তাতে লেখা ছিল- যখন তুমি আমার এই চিঠি খুলে দেখবে তখন তোমরা ওই খেজুরের বাগান পর্যন্ত অতিক্রম করে যাবে, যা মক্কা ও তায়েফের মাঝে অবস্থিত। অতঃপর সেখানে বসে কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখবে এবং তাদের সম্পর্কে আমাদেরকে তথ্য দিবে । তিনি তা পড়ে শেষ করে বললেন: আল্লাহর রাসূল যা বলেছেন তা শুনলাম এবং আনুগত্য স্বীকার করলাম । তারপর তিনি তাঁর সাথিদেরকে বললেন: রাসূল আমাদেরকে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যাতেকরে আমরা কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখি এবং তাঁদের সম্পর্কে রাসূল এর নিকটে সংবাদ পৌঁছিয়ে দেই।

রাসূল আমাকে তোমাদের সাথে জোর করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং তোমাদের যার ইচ্ছা সে আমার সাথে আস আর যার ইচ্ছা চলে যাওয়ার সে কোনোরূপ অভিযোগ ব্যতীতই চলে যেতে পার। তাঁরা সবাই বলল: আমরা রাসূল এর কথা শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। আপনি যেখানে আমাদেরকে আদেশ করেন আমরা সেখানেই যাব । সকলে ঐকমত্য হয়ে রাসূল সালাহাই-এর আদেশ পালনে নাখলার দিকে অগ্রসর হলেন। রাসূল -এর আদেশমতো তাঁরা সেখানে অবস্থান নিলেন এবং পথেপ্রান্তরে ঘুরে ঘুরে কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলেন।

হঠাৎ করে তাঁরা দেখলেন কোরাইশদের একটি ব্যবসায়ী কাফেলা আসছে। সেখানে চারজন লোক ছিল। তারা হচ্ছে আমর বিন আল হাজরমী, হাকাম বিন কায়সান, উসমান বিন আব্দুল্লাহ ও তার ভাই মুগীরা। তাদের সাথে তাদের ব্যবসায়ী মালপত্র ছিল। উল্লেখযোগ্য মালের মধ্যে চামড়া, কিসমিস আরো অন্যান্য পণ্যসামগ্রী যা দ্বারা তারা ব্যবসা বাণিজ্য করত। এ সময় রাসূল - এর প্রেরিত সেই আটজন সাহাবী বসে পরামর্শ করতে লাগলেন। দিনটি ছিল মুহাররম মাসের শেষ দিন । তাঁরা বললেন: যদি আমরা আজ যুদ্ধ করি তাহলে আমরা হারাম মাসে যুদ্ধ করলাম। আর এ কারণে সকল আরববাসী আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হবে ।

আর অন্যদিকে যদি আমরা আজ তাদেরকে ছেড়ে দেই তাহলে তারা হারাম এলাকায় পৌঁছে যাবে এবং আমাদের থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। অনেকক্ষণ যাবত পরামর্শ সভায় আলোচনা করার পর তাঁরা এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে যে, তাঁরা ওদেরকে আক্রমণ করবে এবং যা কিছু পায় তা গনীমত হিসেবে নিয়ে নিবে। এরপর তাঁরা ওদেরকে আক্রমণ করে আমর বিন হাজরামীকে হত্যা করে, দুইজনকে আটক করে আর অন্য একজন পালিয়ে যায় ।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহস গনীমতের মাল ও বন্দিদেরকে মদিনায় রাসূল এর নিকটে নিয়ে আসেন। তিনি রাসূল কে যা ঘটেছে সব কিছুর বিবরণ দিলেন । রাসূল আলামি ঘটনা শুনে কঠোরভাবে নিন্দা জানান । তিনি তাঁদেরকে বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেইনি; বরং আমি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি তোমরা কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখবে এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে আমাদেরকে জানাবে।
রাসূল ওই দুই বন্দিদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালার অপেক্ষা করতে লাগলেন এবং কাফেলার অর্জিত গনীমত থেকে কোনো কিছুই গ্রহণ করলেন না।

এ অবস্থায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহস ও অন্য সাতজনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তাঁরা ধারণা করতে লাগলেন তাঁদের এই কাজ রাসূল -এর নির্দেশ বিরোধী হয়েছে আর এ কারণে না জানি তাঁরা ধ্বংস হয়ে যায়। তাঁদের জন্য ব্যাপারটি আরো কঠিন হয়ে গেল যখন অন্যান্য মুসলিম ভাইয়েরা তাঁদেরকে পরিত্যাগ করে চলতে লাগলেন। দেখা হলে তাঁদেরকে এ কাজের জন্য নিন্দা জানাতেন। এমনকি তাঁরা তাঁদেরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে অন্য পথে চলে যেতেন। মুসলমানগণ তাঁদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলতেন: এরা রাসূল -এর নির্দেশের বিপরীত কাজ করেছে। সমস্যাটি দিন দিন আরো বাড়তে লাগল। যখন তাঁরা জানতে পারল কোরাইশরা রাসূল -এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন গোত্রের নিকটে এই বলে প্রচার করতে লাগল যে, মুহাম্মদ হারাম মাসগুলোতেও যুদ্ধ বৈধ করে দিয়েছে। সে হারাম মাসে মানুষ হত্যা করেছে, মাল লুট করেছে এবং বন্দি করেছে। সুতরাং এতে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে না কতটুকু কষ্টের বোঝা তাঁদের মাথার ওপর ছিল। একদিকে তাঁদের কাজটি রাসূল -এর নির্দেশের বিপরীত হয়েছে অন্যদিকে তাঁদের কাজের জন্য কাফেররা রাসূল এর কুৎসা রটনা করছে।

দিনের পর দিন যখন তাঁদের ওপর কষ্ট আর মসিবত বাড়তে লাগল হঠাৎ এমন সময়ে এক লোক এসে বলল: আল্লাহ তোমাদের কাজের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর নবীর ওপরে অহী প্রেরণ করেছেন । এ সংবাদ শুনার পর তাঁদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করে। মনের মতো কষ্ট ও দুঃখের সময় এ সংবাদ শুনার পর তাঁরা কতই না খুশি হয়েছেন তা প্রশ্ন করার অবকাশ রাখে না। এ সংবাদ শুনে অন্যান্য মুসলমানগণ তাঁদেরকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসলেন এবং তাঁদের সাথে কোলাকুলি করতে লাগলেন। তাঁদের কর্মের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ যে আয়াতগুলো নাযিল করেছেন তা তেলাওয়াত করে শুনাতে লাগলেন । তাঁদের সম্মানে নাযিলকৃত আয়াতগুলো...........
يَسْئَلُونَكَ عَن الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالِ فِيهِ قُل قِتَالُ فِيهِ كَبِيرٌ وَصَلَّ عَنْ سَبِيلِ اللهِ وَكُفَرُ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاخْرَاجُ اَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ وَلَا يَزَالُونَ يُقَتِلُونَكُم حَتَّى يَرُدُّوكُم عَنْ دِينِكُمْ إِن اسْتَطَعُوا وَمَنْ يُرْتَدِدُ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُوْلَاتَكَ حَبِطَتْ
أعملُهُم في الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأَوْلَائِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ
অর্থ- “তারা আপনাকে হারাম মাসে যুদ্ধ করার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, আপনি বলুন তা অনেক জঘন্য, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় কাউকে বাধা দেওয়া, তাঁর সাথে ও মসজিদে হারামের মধ্যে কুফরী করা এবং এর অধিবাসীকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া আল্লাহর নিকটে আরো জঘন্য ।” [সূরা বাকারাহ্- ২১৭]

এ আয়াতে কারীমা নাযিল হওয়ার পর রাসূল -এর অন্তরও খুশিতে ভরে গেল। তিনি গনীমতে অংশগ্রহণ করেন এবং বন্দিদের থেকে মুক্তিপণ আদায় করেন। আর এ কাজের জন্য তিনি আব্দুল্লাহ বিন জাহস ও তাঁর সাথিদের ওপর অনেক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। যার কারণেই এ ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসে অনেক গুরুত্ব লাভ করে । কেননা এ যুদ্ধের গনীমত মুসলমানদের জন্য প্রথম গনীমত । এ যুদ্ধে যাকে হত্যা করা হয় সে প্রথম নিহত মুশরিক, যে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে। এ যুদ্ধে যারা বন্দি হয় তারা মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দি । আর এ যুদ্ধের আমীর ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাস যিনি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আমীরুল মুমিনীন নামে খ্যাত হয়েছিলেন।

বদরের পর উহুদের যুদ্ধে তাঁর ও তাঁর সাথি সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস -এর সাথে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা যা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। সে ঘটনা হযরত সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: ওহুদের যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহস আমার সাথে দেখা করে বলে- তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবে না? আমি বললাম: অবশ্যই করব। তারপর আমরা এককোণে গিয়ে দোয়া করলাম, আমি বললাম: হে আমার প্রতিপালক! আমি যখন শত্রুর সম্মুখীন হব আপনি আমার সাথে এক শক্তিশালী ব্যক্তিকে সাক্ষাৎ করাবেন যে খুব সাহসী এবং খুব রাগী, আমি তার সাথে লড়াই করব এবং সে আমার সাথে লড়াই করবে। এরপর তাকে পরাজিত করার জন্য তুমি আমাকে সাহায্য করবে, এতে আমি তাকে হত্যা করব এবং তার থেকে গনীমত নিয়ে নিব। দোয়া শেষে হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহস আমীন বলেন ।

এরপর আব্দুল্লাহ বিন জাহ্য় দোয়া করতে লাগলেন- হে আল্লাহ! আমার সাথে এক শক্তিশালী ব্যক্তিকে সাক্ষাৎ করাবেন যে খুব সাহসী এবং প্রচণ্ড রাগী, আমি তার সাথে লড়াই করব আর সে আমার সাথে লড়াই করবে। এরপর সে আমাকে ধরে ফেলবে এবং আমার নাক-কান কেটে ফেলবে। যখন আমি কিয়ামতের দিন তোমার সাথে সাক্ষাৎ করব তুমি বলবে: তোমার নাক কান কেন কাটা হয়েছে? আমি বলব- তোমার জন্য এবং তোমার রাসূলের জন্য । তুমি বলবে: তুমি সত্য বলেছ । হযরত সা'দ বলেন: আমার দোয়া থেকেও আব্দুল্লাহ বিন জাহসের দোয়া উত্তম ছিল। আমি দিনের শেষে দেখেছি সে নিহত হয়েছে এবং তার নাক-কান কেটে ফেলা হয়েছে। তার নাক ও কান একটি গাছের ডালে সুতা দিয়ে ঝুলানো ছিল ।

আল্লাহ তাআলা হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাহসের দোয়া কবুল করেছেন এবং তাঁকে শহীদি মর্যাদা দান করেছেন যেমনিভাবে তাঁর মামা হযরত হামজা জল -কে দান করেছেন। রাসূল তাঁকে ও হযরত হামজা -কে একই কবরে দাফন করেন। তখন তাঁর অশ্রু শাহাদাতের সুঘ্রাণে ভরা কবরকে সিক্ত করেছে।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবা – ২য় খণ্ড, ২৮৬ পৃ.।
২. ইমতাউল আসমা – ১ম খণ্ড, ৫৫ পৃ.
৩. হুলিয়াতুল আওলিয়া - ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃ.
৪. হুসনুস্ সাহাবা - ৩০০ পৃ.।
৫. মাজমুয়াতুল ওসায়িকিস্ সিয়াসিয়্যাহ্ - ৮ পৃ.

 হযরত আমর বিন আল জামুহ (রাঃ) এর জীবনী

“এই বৃদ্ধ লোক তাঁর খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করার সংকল্প করেন।” হযরত আমর জাহিলোী যুগে ইয়াসরিবের বিশিষ্ট নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি বনী সালামার প্রধান নেতা ছিলেন। তাছাড়াও তিনি একজন দানবীর ছিলেন এবং আরবদের সাহসী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন । তৎকালীন আরবদের সম্মানিত ব্যক্তিদের একটি প্রথা ছিল তারা প্রত্যেকে নিজের ঘরে একটি মূর্তি রাখত। সকাল-সন্ধ্যা মূর্তিটির পূজা করত এবং এর সন্তুষ্টির জন্যে পশু জবাই করত। আর বিপদে পড়লে মূর্তিটির প্রার্থনা করত এবং তার নিকটে সাহায্য চাইত । হযরত আমর পর পর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যে মূর্তিটি তাঁর ঘরে রাখতেন তার নাম ছিল মানাত। মূল্যবান কাঠ দিয়ে তিনি মূর্তিটি তৈরি করেন এবং এই মূর্তির পেছনে অনেক অর্থ ব্যয় করতেন। এর জন্যে উন্নত সুগন্ধি ব্যবস্থা করতেন। সর্বোপরি তিনি একে অনেক ভালোভাবে পরিচর্যা করতেন ।

হযরত আমর তাঁর জীবনের ষাট বছর শিরকের ওপর অতিবাহিত করেছেন। তখন মদিনাতে প্রথম সুসংবাদ প্রদানকারী হযরত মুসয়াব বিন উমাইর আহ্বানে মদিনায় একের পর এক করে সবাই মুসলমান হতে লাগল। তাঁর দাওয়াতে মদিনাতে দিনে দিনে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। হযরত আমর পরিমানের-এর তিন ছেলেও তাঁর হাতে মুসলমান হয়ে গেলেন। তাঁরা হচ্ছেন মুআউয়াজ, মুয়াজ ও খাল্লাদ । এ তিন জনের সাথে তাঁদের মায়েরাও মুসলমান হয়ে গেছেন। অথচ হযরত আমর পর তাঁদের ঈমান আনার ব্যাপারে কিছুই জানতে পারেননি ।
হযরত হিন্দ রাদিআল্লাহ হযরত আমর স্ত্রী ছিলেন। তিনি দেখলেন ধীরে ধীরে মদিনাতে ইসলামের প্রভাব বাড়তে লাগল এবং তাঁর স্বামী ব্যতীত মদিনার অধিকাংশ মান্যগণ্য নেতাগণ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তখন মদিনার পরিবেশ এমন ছিল যে, খুব কম লোকই ইসলামের বিরোধিতা করত। তাছাড়া হযরত আমর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত হিন্দ তাঁকে বেশি ভালোবাসতো ! আর এই কারণে তিনি তাঁর ব্যাপারে খুবই চিন্তিত ছিলেন। কেননা যদি হযরত আমর সম কাফের অবস্থায় মারা যান তাহলে তাঁকে জাহান্নামে যেতে হবে । ওই দিকে হযরত আমর তাঁ ছেলেদের নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। তাঁরা যদি আবার মুসয়াব বিন উমাইরের ফাঁদে পড়ে নিজেদের বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে। তাঁর চিন্তার কারণ ছিল মুসয়াব বিন উমাইর যেভাবে অল্প দিনেই মদিনার অনেক লোকের হৃদয়কে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে সুতরাং তাঁর ছেলেদের হৃদয় পরিবর্তন হতে আর কতক্ষণ লাগবে। যদিও তার এই চিন্তা অনেক আগেই সত্যের রূপ নিয়েছে, কিন্তু সে সম্পর্কে তিনি সামান্যটুকুও জানতে পারেননি। হঠাৎ একদিন তিনি তাঁর স্ত্রী হিন্দাকে বললেন: তোমার ছেলেদেরকে ওই ব্যক্তি থেকে সতর্ক করবে যাতেকরে ভুলেও তারা তার সাথে দেখা না করে। তিনি ওই ব্যক্তি দ্বারা মুসয়াব (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করলেন। তাঁর স্ত্রী বললেন: আপনার কথা শুনলাম এবং মেনে নিলাম, কিন্তু আপনার ছেলে মুয়াজ তাঁর কথা শুনলে আপনার সমস্যা কোথায়? তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস্! আমার ছেলে নিজের বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করবে অথচ আমি জানব না?

তাঁর প্রতি তাঁর স্ত্রীর মনে দয়া হলো, তাই তিনি বললেন: না তা কখনো হতে পারে না, কিন্তু আপনার ছেলে মুয়াজ তার এক সভায় উপস্থিত ছিল এবং সে যা বলেছে তা থেকে কিছু কথা মুখস্থ করে রেখেছে । তিনি বললেন: তাকে আমার নিকটে ডেকে আন......। যখন তাঁর ছেলে উপস্থিত হলো তিনি বললেন: এই লোক যা বলেছে তা থেকে আমাকে কিছু শুনাও। তাঁর ছেলে তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন-
الحَمدُ لِلَّهِ رَبِّ العَلَمِينَ . الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ . اهْدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ ، صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيهِم غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيْهِم وَلَا الضَّالِّينَ . অর্থ- পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করলাম । সকল প্রশংসা বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য । যিনি দয়ালু ও দয়াময় । যিনি বিচার দিনের মালিক । আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি আর তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি ।
তুমি আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।
তাদের পথ যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ ।
তাদের পথ না যারা অভিশপ্ত আর পথভ্রষ্ট।

সূরা ফাতিহা শুনার পর হযরত আমর বললেন: আহ! কতই না সুন্দর বাণী আর প্রতিটি বাক্যকে কতই না উত্তম অলংকারে সাজানো হয়েছে। তাঁর প্রতিটি কথা কি মতো সুন্দর? তাঁর ছেলে হযরত মুয়াজ বললেন : বাবা; বরং এর থেকেও সুন্দর। আপনি কি তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করবেন; অথচ আপনার পুরো জাতি তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে। এ কথা শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ ছিলেন। এরপর তিনি মুখ খুললেন । তিনি বললেন: আমি আমার দেবতা মানাতের সাথে পরামর্শ না করে কিছুই করব না । তাঁর ছেলে বললেন বাবা! এটি কি বলবে? এটিতো কাঠের মূর্তি, সেতো বধির কিছু শুনেও না আর কিছু বলতেও পারে না । তিনি ধমকের সুরে বললেন: আমি তোমাকে বললাম: আমি তাকে ছাড়া কিছুই করব না ।
ছেলে ও স্ত্রীর সাথে কথোপকথন শেষ করে হযরত আমর মূর্তির কাছে গেলেন। ওই দিকে তার স্ত্রী ও তাঁর ছেলে বুদ্ধি করে মূর্তির পেছনে একজন বৃদ্ধা মহিলাকে বসিয়ে রেখেছে, যাতেকরে তিনি যখন মূর্তিকে কোনো কিছু জিজ্ঞেসা করবেন তখন ওই মহিলা তাঁর কথার জবাব দিবে, এতে করে তিনি ধারণা করবেন যে তাঁর মূর্তিই তার কথায় সাড়া দিয়েছে। হযরত আমর জির মূর্তির সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। তিনি তার অনেক প্রশংসা করলেন এবং তার কাছে খুব বেশি অনুরাগী হয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন। তিনি বলতে লাগলেন- “হে মানাত! এতে কোনো সন্দেহ নেই মক্কা থেকে আমাদের নিকটে আগমনকারী এই ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি অবশ্যই জ্ঞাত। যে শুধু তোমার ক্ষতি চায়......... এবং তোমার ইবাদত করতে আমাদেরকে নিষেধ করে........।

অথচ আমি তার কথামতো তার হাতে বায়াত হতে অপছন্দ করি। আর এই কারণে আমি তোমার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি; সুতরাং তুমি আমাকে পরামর্শ দাও। কিন্তু তার মতো আবেগভরা প্রার্থনাতেও মূর্তির মুখ থেকে কোনো উত্তর বের হলো না । তিনি আবার মূর্তিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন- তুমি মনে হয় আমার ওপর রাগ করেছ.......। আমি এরপর থেকে তোমার কষ্ট হবে এমন কোনো কাজই করব না। কিন্তু এতে কোনো সমস্যা নেই, আমি কিছু দিন তোমার থেকে দূরে সরে থাকব তাহলে তোমার রাগ কমে যাবে । হযরত আমর -এর ছেলেরা দেখল তাঁদের বাবার সাথে মূর্তির নিবিড় সম্পর্ক। মূর্তির সাথে তাঁর সম্পর্ক এমনভাবে বাড়তে লাগল মনে হয় তিনি যেন মূর্তির একটি অংশ হয়ে গেছেন। কিন্তু মতো কিছুর পরেও যখন তিনি মূর্তির থেকে কোনো কথার জবাব পাননি তখন ধীরে ধীরে মূর্তির ওপর থেকে তাঁর বিশ্বাস উঠে যেতে লাগল। আর এটাই তাঁর ঈমানের পথকে সুগম করে দিল ।

হযরত আমর -এর ছেলেরা একরাতে তাঁদের বন্ধু মুয়াজ বিন জাবাল- এর সাথে মূর্তির ঘরে প্রবেশ করেন। তাঁরা সেটি নিয়ে বনী সালামার ময়লা আবর্জনার স্তূপে রেখে আসলেন। এই কাজটি তাঁরা এতই গোপনে করেছে যে, কেউ টের পায়নি। এরপর তাঁরা সেখান থেকে নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসেন। সকাল বেলা যখন হযরত আমর জি তাঁর মূর্তিকে অভিবাদন জানাতে গেলেন। কিন্তু তিনি মূর্তিকে না দেখে হতাশ হয়ে গেলেন। তিনি বললেন: তোমাদের ধ্বংস হোক! কে আমাদের প্রভুর সাথে এই রাতে শত্রুতা করেছে?, কিন্তু কেউ তাঁর কথার কোনো উত্তর দিল না। তারপর তিনি ঘরের ভেতরে-বাইরে সব জায়গায় মূর্তিটি খুঁজতে লাগলেন । খুঁজতে খুঁজতে তাকে মাথাভাঙ্গা অবস্থায় ময়লার গর্তে পেলেন। তিনি তাকে গর্ত থেকে তুলে ভালোভাবে গোসল করিয়ে সুগন্ধি মেখে পূর্বের স্থানে রাখলেন । তিনি মূর্তিটিকে বললেন: জেনে রাখ, আল্লাহর শপথ! আমি যদি জানতাম কে তোমার সাথে এমন করেছে তাকে অবশ্যই আমি অপদস্থ করতাম ।

দ্বিতীয় রাতেও সেই সকল যুবকেরা একই কাজ করলেন। গত দিন সকালের মতো আজও হযরত আমর ঘুম থেকে উঠে তাঁর মূর্তিটি খুঁজতে লাগলেন । খুঁজতে খুঁজতে তাকে ময়লা মাখা অবস্থায় ময়লার গর্তে পেলেন । তিনি তাকে গর্ত থেকে তুলে ভালো করে গোসল করিয়ে সুগন্ধি মেখে পূর্বের স্থানে রাখলেন । যুবকেরা প্রতি রাতেই কোনো না কোনো স্থানে মূর্তিটিকে ফেলে রাখতেন। প্রতি রাতে এই ঘটনা বার বার হওয়ার কারণে হযরত আমর খুব বিরক্ত হয়ে গেলেন। শেষে তিনি বুদ্ধি করে ঘুমানোর আগে একটি তরবারি মূর্তিটির গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে বললেন: হে মানাত, আল্লাহর শপথ! আমি জানি না কে তোমার সাথে এমন করে। আমি তোমাকে এই তরবারিটি দিয়ে গেলাম; সুতরাং তুমি যদি সঠিক হয়ে থাক তাহলে তুমি এর দ্বারা তোমার শত্রুকে প্রতিহত করবে। এরপর তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেলেন ৷

যখন যুবকেরা নিশ্চিত হলো যে, হযরত আমর ঘুমিয়ে গেছেন তাঁরা মূর্তিটির কক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁরা তার তরবারিটি নিয়ে নিলেন। এরপর তাঁরা সেটিকে বাইরে এনে একটি মৃত কুকুরের সাথে বেঁধে বনূ সালামার ময়লা আবর্জনার কূপে ফেলে দিলেন আ সেই তরবারিটা তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন। হযরত আমর ঘুম থেকে উঠে তাঁর মূর্তিটি পেলেন না। তিনি তাকে খুঁজতে বের হয়ে গেলেন। খুঁজতে খুঁজতে সেটিকে ময়লা আবর্জনার কূপে একটা মৃত কুকুরের সাথে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখলেন। অথচ মূর্তিটির গলায় তরবারিটা ঝুলছিল । তিনি এই অবস্থায় দেখে মূর্তিটিকে আর কূপ থেকে উঠালেন না । তিনি সেটিকে রেখে চলে এলেন এবং কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন-
অর্থ-
وَاللَّهِ لَو كُنتَ الهَا لَم تَكُن أَنتَ وَكلْبٌ وسَطَ بِمُر في قري
আল্লাহর শপথ যদি তুমি প্রভু হতে
মধ্যকূপে কুকুর আর তুমি থাকতে না এক সাথে ।
এরপর হযরত আমর ইসলাম গ্রহণ করতে আর দেরি করলেন না ।

হযরত আমর ইসলাম কবুল করে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেন। তিনি ঈমান আনার পর তার পূর্বের অবুঝ শিশুর মতো করা শিরকগুলোর জন্যে লজ্জিত হতেন। আর মনে মনে হাসতেন এই ভেবে যে, ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে তিনি বধির, বোবা একটি মূর্তির পূজা করেছেন। তাই ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি নিজের জান-মাল আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে শুরু করলেন এবং সর্বদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর আদেশ পালনে নিয়োজিত থাকতেন ।
এর কিছুদিন পর উহুদের যুদ্ধের ডাক আসে। তিনি দেখলেন তাঁর তিন ছেলেই আল্লাহর শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি তাঁদেরকে দেখলেন তাঁরা আল্লাহর পথে নিজের জান-মাল কোরবানি করে শাহাদাত অর্জনের অপেক্ষা করছিল। আর এই দৃশ্য দেখে তাঁর মনেও শাহাদাত অর্জনের ইচ্ছা জাগে । যদিও তিনি এখন খুবই বৃদ্ধ। তাঁর সকল পুত্র তাঁকে নিষেধ করতে লাগলেন।' তাঁরা তাঁকে বললেন: আল্লাহ আপনাকে ওযর দিয়েছেন। তাহলে কেন আপনি নিজ আত্মাকে সেই কাজে কষ্ট দিবেন যা থেকে আল্লাহ আপনাকে মুক্ত রেখেছেন। তাদের এই কথা শুনার পরে তিনি খুব রাগান্বিত হলেন। তিনি রাসূল - কে গিয়ে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার এই ছেলেরা আমাকে ঘরে বন্দি করে রাখতে চায়। তারা বলে আমি না কি অক্ষম। অথচ আমি এর দ্বারা জান্নাতে যাওয়ার আসা করছি।

রাসূল তাঁদেরকে বললেন: তোমরা তাকে যেতে দাও, হতে পারে আল্লাহ তাঁকে শাহাদাত দান করবেন। রাসূল -এর নির্দেশ অনুসারে তাঁরা তাকে যেতে দিল ৷ যুদ্ধের সময় ঘনিয়ে আসলে তিনি তাঁর স্ত্রীদের থেকে চির বিদায় নিলেন। এরপর তিনি কা'বার দিকে মুখ করে আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন: হে আল্লাহ! আমাকে তুমি শাহাদাত দান কর, আমাকে ব্যর্থ করে আমার পরিবারে ফিরিয়ে দিও না ৷ এরপর তিনি জিহাদের দিকে রওয়ানা দিলেন। তাঁর সাথে তাঁর তিন ছেলে ও তাঁর গোত্রের অনেক লোক রওয়ানা দিল ।

যখন যুদ্ধের ময়দান উত্তপ্ত হয়ে গেল মানুষেরা রাসূল কে ছেড়ে দূরে চলে যেতে লাগল। তখন হযরত আমর প্রথম সারিতেই ছিলেন। তাঁর এক পা খোঁড়া ছিল আর তাই তিনি তাঁর সুস্থ পায়ের ওপর ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন- আমি জান্নাতের প্রত্যাশী.... আমি জান্নাতের প্রত্যাশী... আর তাঁর পেছনে তাঁর ছেলে খাল্লাদ ছুটে যাচ্ছিলেন।
তিনি ও তাঁর ছেলে খাল্লাদ শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত রাসূল -কে ঘেরাও দিয়ে রেখেছেন। তাঁরা তরবারির আঘাত প্রতিহত করতে করতে এক সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তিনি ও তাঁর ছেলে খাল্লাদ একই সময়ে শাহাদাত বরণ করেন।

যুদ্ধ শেষে রাসূল উহুদের শহীদদেরকে দেখতে লাগলেন। তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বলতে লাগলেন- তোমরা তাদেরকে রক্ত মাখা অবস্থায় কবর দাও কেননা আমি তাদের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দিব। তারপর রাসূল বললেন: যে মুসলমান আল্লাহর রাস্তায় আঘাতপ্রাপ্ত হবে সে কাল কিয়ামতের দিন রক্তঝরা অবস্থায় উঠবে, এর রং হবে জাফরানের রঙের মতো আর এর ঘ্রাণ হবে মিসকে আম্বরের মতো । রাসূল সালামাহ আরো বললেন: আমর বিন আল জামুকে আব্দুল্লাহ বিন আমরের সাথে দাফন কর কেননা তারা দুনিয়াতে খুব ভালো বন্ধু ছিল । আল্লাহ তাআলা যেন আমর বিন জামুর ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর কবরকে নূরে নূরে ভরে দেন।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবা - ২য় খণ্ড, ৫২৯ পৃ.। ২. সিফাতুস্ সফওয়া - ১ম খণ্ড, ২৬৫ পৃ.

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.