03/08/23

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

 হযরত জায়েদ আল খায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু এর জীবনী

“তাঁর ইসলাম গ্রহণ ও মৃত্যু মাঝে সময় মতো কম ছিল যে, তিনি কোনো ছোট পাপেও জড়িত হননি” সকল মানুষ খনির মতো, যারা জাহিলী যামানায় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইসলামেও তারা শ্রেষ্ঠ । 
[হযরত মুহাম্মদ]

এখন আমরা একজন মহান সাহাবীর জীবনের দুইটি অংশ আলোচনা করব। যার প্রথমটি ছিল জাহিলী জীবন আর দ্বিতীয়টি ছিল ইসলামী জীবন। এই মহান সাহাবীর নাম জায়েদুল খায়েল যাকে লোকেরা জায়েদুল খায়ের নামে ডাকতো । ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূল তাঁকে এই নামে ডেকেছেন । তার প্রথম জীবনী আরবী সাহিত্যে বর্ণিত আছে। হযরত শায়বানী, বনূ আমেরের এক শায়েখ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: তখন খুব অনাবৃষ্টি ও খরা রৌদ্র চলছিল যার কারণে সকল ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পশুদের স্তন শুকিয়ে গেছে। আমাদের মধ্য থেকে এক লোক তার পরিবার নিয়ে হিরা নামক এলাকায় চলে গেল । সে তাদেরকে সেখানে রেখে গেল আর বলে গেল আমি ফিরে আসা পর্যন্ত তোমরা এখানে অবস্থান করবে । তারপর সে কসম করে বলে, আমি হয় তোমাদের জন্য কিছু উপার্জন করে ফিরে আসব না হয় মৃত লাশ হয়ে ফিরব। এরপর সে কিছু পাথেয় নিয়ে তার যাত্রা শুরু করল। সে সারা দিন হাঁটতে থাকে । এমন সময় সে একটি তাঁবু দেখতে পেল। তাঁবুটির পাশে একটি ঘোড়ার শাবক বাঁধা ছিল। তাঁবুটির দরজা ছিল বন্ধ। সে তা দেখে মনে মনে বলতে লাগল- এটি হচ্ছে প্রথম গনীমত ।

সে তাঁবুটি লক্ষ্য করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগল । কিন্তু যখন সে তাঁবুতে প্রবেশ করবে এমন সময় সে শুনতে পেল কে যেন তাকে বলছে: তুমি ওটিকে ছেড়ে দিয়ে নিজের জান বাঁচাও। একথা শুনে শাবকটি না ধরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল । এরপর লোকটি সাত দিন একটানা হাঁটার পর সে এমন এক জায়গায় উপস্থিত হয় যেখানে উটের খামার ছিল। আর এর পাশেই একটি বিশাল তাঁবু ছিল। তখন লোকটি মনে মনে বলল: এখানে অবশ্যই উট পাওয়া যাবে এবং কোনো মানুষের বসতি অবশ্যই এখানে আছে । সে তাঁবুটির দিকে তাকাল তখন ছিল পড়ন্ত বিকাল। সে সেখানে একজন বৃদ্ধ শায়েখকে দেখতে পেল। সে আস্তে আস্তে তার পেছনে গিয়ে বসে যাতেকরে বৃদ্ধ লোকটি কোনোভাবে টের না পায়। সে সেখানে লুকিয়ে থাকল । এর কিছুক্ষণ পরেই সূর্য ডুবে গেল। তখন সেখানে এক অশ্বারোহী আগমন করেন। লোকটি এত লম্বা ও মোটা ছিল যে, সে কখনো এমন লোক আর দেখেনি। ওই লোকটির সাথে দুইজন গোলাম হাঁটছিল। তাঁর সাথে অন্তত এক শত উট ছিল । ওই ব্যক্তি একটি মোটা-তাজা উটের দিকে ইশারা করে তার এক গোলাম কে বললেন: এই উট থেকে দুধ দোহন কর এবং তা শায়েখকে পান করাও ।

গোলামটি দুধ দোহন করে একটি পাত্র পরিপূর্ণ করল। গোলামটি দুধের পাত্র শায়েখের সামনে রেখে চলে গেল। শায়েখ সেখান থেকে এক চুমুক বা দুই চুমুক পান করে রেখে দিল । শায়েখ যখন দুধ রেখে দিল তখন ওই লোকটি যে এসে লুকিয়ে ছিল সে পাত্রটি নিয়ে পুরো দুধটি পান করে শেষ করে ফেলল। তারপর পাত্রটিকে যথাস্থানে রেখে দিল। গোলামটি ফিরে এসে পাত্রটি খালি দেখে তার মালিককে গিয়ে বলল: হে মালিক! তিনি তো পাত্রের সবটুকু দুধ পান করেছেন । মালিক লোকটিকে আরেকটি উটের দিকে ইশারা করে বললেন: এই উট থেকে দুধ দোহন কর। গোলামটি দুধ দোহন করে শায়েখের সামনে রেখে চলে গেল। শায়েখ সেখান থেকে এক চুমুক বা দুই চুমুক পান করে রেখে দিল । আবারও ওই লুকিয়ে থাকা ব্যক্তি পাত্র থেকে অর্ধেক দুধ পান করে পাত্রটি যথাস্থানে রেখে দেয়। কেননা পুরোটা শেষ করলে হয়তো সন্দেহ করবে তাই অর্ধেক পান করে বাকিটুকু রেখে দিল । তারপর মালিক লোকটি তাঁর গোলামদেরকে একটি বকরি জবাই করার আদেশ দিলেন। তারা বকরি জবাই করে কাবাব করে তা থেকে শায়েখকে দিলেন এবং নিজেরাও খেলেন ৷ খাওয়া-দাওয়া শেষে তারা তিনজনই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন।

লুকিয়ে থাকা লোকটি বলল: তারপর আমি উটের পালের দিকে গেলাম এবং সেখান থেকে একটি উট নিয়ে আমি খুব দ্রুত সামনের দিকে ছুটতে লাগলাম । আমি সারা রাত ধরে চলতে থাকি। যখন সকাল হলো আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাকে কেউ অনুসরণ করছে কিনা। দেখলাম, না কেউ আমার পিছু নেয়নি। তারপরও আমি আমার উট চালিয়ে যেতে লাগলাম। যখন সূর্য অনেক উপরে উঠে যায় আমি আমার যাত্রাবিরতি করি । হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখতে পাই আমার পেছনে কে যেন বাজ পাখির মতো তেড়ে আসছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম একটি ঘোড়ায় চড়ে এক আরোহী আসছেন, কিন্তু তখনো আমি তাকে চিনতে পারিনি। যখন তিনি আরো নিকটে আসলেন আমি তাকে চিনতে পারলাম; তিনি আর অন্য কেউ নই তিনি স্বয়ং আমার নিয়ে আসা সেই উটের মালিক । আমি সাথে সাথে উটটি বেঁধে ধনুক থেকে একটি তীর বের করে নিই। তীর দেখে লোকটি থেমে গেলেন। তিনি বললেন: তুমি উটটি দিয়ে দাও। আমি বললাম: কখনো না, কেননা আমি আমার স্ত্রীদেরকে ক্ষুধার্ত অবস্থা রেখে এসেছি এবং তাদেরকে বলে এসেছি, আমি হয় তোমাদের জন্য কিছু নিয়ে আসব অথবা আমি মৃত হয়ে ফিরব।
তিনি বললেন: অবশ্যই তুমি মারা যাবে। তাড়াতাড়ি উট দিয়ে দাও হতভাগা । আমি বললাম: আমি কখনো উট ফিরিয়ে দিব না।

তিনি বললেন: তোমার ধ্বংস হউক, তুমি প্রতারিত প্রবঞ্চিত । তারপর তিনি আবার বললেন: তুমি আমাকে উট বেঁধে রাখার রশিটি দেখাও । আমি তাঁকে রশিটি দেখালাম। লোকটি রশিটি লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করলেন। তীরটি রশিটির মাঝে এমনভাবে গেঁথে গেল মনে হয় কেউ তা রশিতে নিজ হাতে রেখেছে। আমি তা দেখে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। তিনি আমার নিকটে আসলেন এবং আমার তরবারি এবং তীরগুলো নিয়ে নিলেন । তিনি আমাকে বললেন: তুমি আমার পেছনে চড়ে বস । আমি তার পেছনে চড়ে বসলাম । তিনি আমাকে বললেন: তোমার কি ভাবছ আমি তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করব? আমি বললাম: আমার ধারণা আপনি আমাকে কঠিন শাস্তি দিবেন। তিনি বললেন: কেন? আমি বললাম: কেননা আমি আপনার সাথে যে অপরাধ করেছি, আপনাকে যে কষ্ট দিয়েছি। অবশেষে আল্লাহ আমার উপরে আপনাকে বিজয় দান করেছেন। তিনি বললেন: তোমার ধারণা আমি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করব, তোমাকে শাস্তি দিব অথচ ওই রাতে তুমি মুহালহেলের পাশে বসে খেয়েছ এবং পান করেছ। (মুহালহাল হচ্ছে লোকটির বাবা)।  আমি মুহালহেলের নামা শুনে বললাম: আপনি কি জায়েদুল খায়েল? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম: তাহলে আপনি বন্দির সাথে উত্তম ব্যবহার করুন ।
তিনি বললেন: তোমার কোনো চিন্তা নেই ।

তিনি আমাকে তাঁর থাকার স্থানে নিয়ে গেলেন । তিনি আমাকে বললেন: আল্লাহর শপথ! যদি এই উট আমার হতো অবশ্যই আমি তা তোমাকে দিয়ে দিতাম, কিন্তু এই উটটি আমার বোনের। তুমি আমার নিকটে থাক। অচিরেই আমি যুদ্ধ করব সেখান থেকে যা পাই তা তোমাকে দিয়ে দিব । বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি মাত্র তিন দিন পর তিনি বনূ নুয়াইমের ওপর আক্রমণ করেন এবং সেখানে একশত উটের কাছাকাছি গনীমত পেলেন। তিনি সবগুলো উট আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি যাতে ঠিক ঠাক মতো পৌঁছতে পারি সে জন্যে তিনি আমার সাথে কিছু লোকও দিলেন। অবশেষে আমি হিরাতে এসে পৌছি।
প্রিয় পাঠক! এতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যে ঘটনাটি পড়লেন এই ঘটনায় একশত উট দানকারী সেই মহান ব্যক্তিই ছিলেন হযরত জায়েদুল খায়েল যিনি জায়েদুল খায়ের নামে পরিচিত। এই হচ্ছে তাঁর জাহিলী যামানার ইতিহাস। জাহিলী যামানাও তাঁর ব্যবহার এত সুন্দর ছিল। এত বড় দানবীর ছিলেন তিনি । এবার ইসলামে প্রবেশ করার পর তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া সেই ইতিহাস আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরব। যখন জায়েদ মসলা -এর কানে রাসূল -এর নতুন দ্বীন প্রচারের কথা পৌঁছলো, তিনি তাঁর বাহন প্রস্তুত করে তাঁর গোত্রের সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে ডেকে ইয়াসরেব (মদিনা) গিয়ে মুহাম্মদ -এর সাথে সাক্ষাৎ করার কথা বললেন। তাঁর সাথে অনেক ব্যক্তি যেতে প্রস্তুত হলেন। তাঁরা বিশাল একটি বাহিনী হয়ে গেলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন যুররুবনু সাদুস, মালিক বিন জুবাইর, আমের বিন জুওয়ান আরো অন্যান্যরা। মদিনায় পৌঁছার পর তারা মসজিদের সামনে বাহন রেখে মসজিদের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন ।

মসজিদে পা রাখার সাথে তাঁদের চোখ রাসূল -এর দিকে গেল। রাসূল তখন মিম্বারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাঁরা রাসূল - এর ভাষণ শুনার জন্য বসে গেলেন। তাদেরকে একটি বিষয় খুব অবাক করেছে যে, রাসূল এর কথাগুলো সাহাবীরা একেবারে চুপ-চাপ থেকে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে শুনছেন। তাঁরা আরো দেখল রাসূল -এর কথাগুলো সবার হৃদয়কে কিভাবে কেড়ে নিচ্ছে। রাসূল তাদেরকে দেখতে পেয়ে মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন:  তোমরা উজ্জা ও আরো অন্যান্য যে সকল মূর্তির পূজা কর তাদের থেকে আমি তোমাদের জন্য উত্তম । তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যে কালো উটের পূজা কর তা থেকে আমি তোমাদের জন্য উত্তম । রাসূল -এর এ কথাগুলো জায়েদ -এর দলের মাঝে দুই রকম প্রভাব সৃষ্টি করে। তাঁদের কতিপয় লোক ইসলাম গ্রহণের প্রতি আগ্রহী হলো আর কতিপয় লোক কথাগুলো অপছন্দ করে চলে গেল । তাদের মধ্যে দুইটি ভাগ হয়ে যায় তাদের কিছু লোক জান্নাতে যাওয়ার পথ ধরল এবং কিছু লোক জাহান্নামে যাওয়ার পথ ধরল ।

তাদের মধ্যে রুবনু সাদুস বলল: আমি দেখছি লোকটি সারা আরবের মালিকত্ব নিয়ে নিবে। আল্লাহর শপথ! আমি এই ব্যক্তিকে কখনো আমার মালিক হতে দিব না। তারপর সে সিরিয়ায় চলে গেল এবং মাথার চুল ফেলে দিয়ে খ্রিস্টান হয়ে বৈরাগ্য জীবন শুরু করে দিল। কিন্তু ওইদিকে জায়েদ ও তার কিছু সাথির অবস্থা ছিল অন্য রকম । যখন রাসূল -এর ভাষণ শেষ হয় তিনি মুসলমানদের মাঝে গিয়ে বসেন। তিনি অনেক সুন্দর চেহারার লোক ছিলেন এবং অনেক লম্বা ছিলেন। তিনি এতই লম্বা ছিলেন যে, ঘোড়ায় চড়লে তার পা মাটিতে এসে লাগত । তাঁর শরীরের গঠনও অনেক সুন্দর ছিল । তিনি সুন্দর করে বসে বললেন: হে মুহাম্মদ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই আর আপনি আল্লাহর রাসূল । রাসূল তাঁর দিকে এগিয়ে এসে বললেন: তুমি কে? তিনি বললেন: আমি জায়েদুল খায়েল ।
রাসূল  তাঁকে বললেন: না; বরং আজ থেকে তোমার নাম জায়েদুল খায়ের। তারপর বললেন: সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার যিনি তোমাকে নিয়ে এসেছেন এবং তোমার হৃদয়কে ইসলামের জন্যে নরম করে দিয়েছেন। তখন থেকে তিনি জায়েদুল খায়েলের পরিবর্তে জায়েদুল খায়ের নামে পরিচিতি লাভ করেন। তারপর রাসূল তাঁকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। রাসূল -এর সাথে উমর (রঃ)-সহ আরো কিছু সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন। বাড়িতে যাওয়ার পর হেলান দিয়ে বসার জন্য রাসূল তাঁর দিকে বালিশ এগিয়ে দিলেন, কিন্তু তিনি রাসূল -এর সামনে হেলান দিয়ে বসাটা বেয়াদবী মনে করলেন; তাই তিনি বালিশটি ফেরত দিলেন। রাসূল সালাবা তাঁকে তিন বার বালিশটি এগিয়ে দিলেন । তিনি প্রতি বারই রাসূল -কে সেটি ফিরিয়ে দিলেন। মজলিসে সবাই বসার পর রাসূল সালাবার জায়েদ -কে উদ্দেশ্য করে বললেন : আমার নিকটে যত লোকের প্রশংসা করা হয়েছে তাদেরকে যখন আমি দেখেছি তখন প্রশংসিত গুণগুলো পুরোটা কারো মাঝে পায়নি। তবে তোমার যা প্রশংসা শুনেছি তা সবটাই তোমার মাঝে দেখতে পাচ্ছি।

তারপর রাসূল সালাহার বললেন: তুমি এরূপ কিভাবে হয়েছ? তিনি বললেন: আমি সবসময় ভালো কাজ করা পছন্দ করতাম এবং যারা ভালো কাজ করত তাদেরকে পছন্দ করতাম। যখন আমি কোনো ভালো কাজ করতাম তখন সেটির সওয়াব পাওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাস করতাম এবং যদি না করতে পারতাম তাহলে খুব আফসোস করতাম । রাসূল বললেন: এটি হচ্ছে আল্লাহর দান, যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। তিনি বললেন: সকল প্রশংসা সে আল্লাহ তাআলার যিনি আমাকে তাঁর ও তাঁর রাসূলের পছন্দ মতো সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি নবী করীম -এর দিকে ফিরে বললেন: আপনি আমাকে তিন শত অশ্বারোহী যোদ্ধা দিন, আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে আমি রোমে আক্রমণ করব এবং তা থেকে বিজয় নিয়ে ফিরব। রাসূল  তাঁর কথা শুনে তাকবীর দিলেন এবং বললেন: হে জায়েদ! তোমার সকল কল্যাণ আল্লাহর জন্য ........... | তারপর জায়েদের সাথে আসা সকল লোক ইসলাম গ্রহণ করেন ।
যখন জায়েদ নজদে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করেন রাসূল তাঁকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান এবং বললেন: লোকটি অবশ্যই দুঃসাহসী । যদি সে মদিনার মহামারী থেকে রক্ষা পায় তাহলে সে অনেক বড় কিছু হতে পারবে! মদিনাতে তখন জ্বরের মহামারী শুরু হয়েছে। আর সেই মহামারীতে হযরত জায়েদ -ও আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বললেন: আমাকে কায়েসদের এলাকায় থেকে সরিয়ে নাও কেননা তাদের সাথে আমাদের শত্রুতা আছে আর তাই আমি চাই না আমার কারণে কোনো মুসলমান নিহত হউক ।

তিনি তাঁর এলাকা নজদের দিকে চলতে লাগলেন, কিন্তু জ্বর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তিনি মনে মনে তাঁর গোত্রের লোকদের সাথে দেখা করার আশা করেন যাতেকরে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারেন, কিন্তু তাঁর আশা আর পূর্ণ হয়নি। অবশেষে তিনি পথেই তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ ও মৃত্যু মাঝে সময় মতো কম ছিল যে, তিনি কোনো ছোট পাপেও জড়িত হননি ।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবাহ্ - ১ম খণ্ড, ৫৭২ পৃ. ।
২. আল ইসতিআ'ব – ১ম খণ্ড, ৫৬৩ পৃ. 
৩. আল আগানী - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
৪. তাযীবু ইবনি আসাকির - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
৫. সামতুল লালিই - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
৬. খ্যানাতুল আদাব লিল বাগদাদী - ২য় খণ্ড, ৪৪৮ পৃ.।
৭. যাইলুল মুযীল - ৩৩ পৃ.
৮. সিমারুল কুলুব - ৭৮ পৃ.।
৯. আশ্ শি'র ওয়াশ্ শুআরা - ৯৫ পৃ.
১০. হুলিয়াতুল আওলিয়া - ১ম খণ্ড, ৩৭৬ পৃ. 
১১. হুসনুস্ সাহাবা - ২৪৮ পৃ. ৷

 হযরত সালমান আল ফারেসী (রাঃ) এর জীবনী

“ঈমান যদি সুরাইয়াতেও থাকতো তাহলেও এদের মতো কিছু লোক তা অর্জন করত” [রাসূল সালমান -এর পিঠে হাত রেখে এই কথা বলেন]

এই জীবনীটি এমন এক ব্যক্তির জীবনী যিনি সারা জীবন সত্যকে পাওয়া জন্যে দিক দিগন্তে ছুটেছেন। যিনি সারা জীবন সত্যকে অনুসন্ধান করতে করতে অতিবাহিত করেছেন। সে মহান ব্যক্তি হচ্ছেন হযরত সালমান ফারেসী আমরা তাঁর নিজ মুখের বর্ণিত আত্মজীবনী আপনাদের সামনে তুলে ধরব। যেকোনো ব্যক্তির সম্পর্কে অন্যের বর্ণনার থেকে তাঁর নিজ বর্ণনাটি অধিক সত্য ও সঠিক বর্ণনা ৷ প্রিয় পাঠক! তাঁর আত্মজীবনী এতটাই অবাক করার মতো, যা সবার হৃদয়কে স্পর্শ করে। তিনি বলেন : আমার বাড়ি ইস্পাহানের অন্তর্গত জাইয়ান নামক গ্রামে অবস্থিত। আমার পিতা গ্রামের মাতব্বর ছিলেন। আমার পরিবার খুব ধনী ছিল এবং সমাজে আমদের অবস্থান খুব ভালো ছিল। জন্মের পর থেকে আমি আমার পিতার নিকট আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি ছিলাম। ধীরে ধীরে আমি সকলের নিকটে অধিক প্রিয় হতে লাগলাম।

আমার প্রতি সকলের দৃষ্টি আলাদা, কিন্তু এ কারণে আমার পিতা-মাতা আমার ব্যাপারে ভয় করতে লাগল । তাই তারা আমাকে ঘরের বাইরে যেতে দিত না যেমনিভাবে মেয়েদেরকে ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না । আমি তখন খুব বেশি অগ্নিপূজা করতাম। আমার এমন আগ্রহ দেখে তারা আমাকে অগ্নিজ্বালক হিসেবে নিয়োজিত করে। আমার দায়িত্ব ছিল দিনে বা রাতের সামান্য মুহূর্তের জন্যেও যেন এই আগুন নিভে না যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখা ।আমার বাবার বিশাল শস্য খামার ছিল। যা থেকে আমরা অনেক ফসল পেতাম। আমার বাবা তা দেখাশুনা করতেন এবং সংরক্ষণ করতেন। একদিন তাকে কোনো এক কাজে অন্য এক গ্রামে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তিনি আমাকে বললেন: হে আমার ছেলে! আমারতো এক জায়গায় যেতে হবে; সুতরাং তুমি বাগানে যাও এবং আমার কাজটি আজ তুমি করে দাও । আমি বাগানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলোমি। যাওয়ার পথে খ্রিস্টানদের একটি গির্জা দেখতে পেলাম। আমি তাদের নামাজ আদায় করার পদ্ধতি দেখতে পেয়েছি। আর তা আমার মনোযোগ কেড়ে নিল ।

আমি খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মের ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতাম না । কেননা আমাকে আমার বাবা-মা ছোটবেলা থেকে ঘরের বাইরে যেতে দেননি। আমি তাদের আওয়াজ শুনে তারা কি করে তা দেখার জন্য ভেতরে প্রবেশ করলাম । তাদের নামাজের পদ্ধতি দেখে আমি খুবই মুগ্ধ হলাম এবং তাদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম । আমি মনে মনে বললাম: আল্লাহর শপথ! আমার যা করি তা থেকে এটি অনেক উত্তম। আল্লাহর শপথ! আমি আমার বাবার খামারে না গিয়ে সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত তাদের সাথেই ছিলাম। তারপর আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম- এ ধর্মের মূল কোথায় অবস্থিত। তারা বলল: সিরিয়ায় । যখন রাত ঘনিয়ে আসে আমি বাড়িতে ফিরে আসি। বাড়ি ফিরার পর আমার বাবার সাথে দেখা হলে আমি কি কি করেছি সে সম্পর্কে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন।

আমি বললাম: বাবা! আমি যাওয়ার পথে কিছু মানুষকে দেখলাম তারা গির্জায় নামাজ আদায় করছে। তাদের সেই নামাজ আমাকে মুগ্ধ করেছে তাই আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম । আমার বাবা একথা শুনে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি বলতে লাগলেন হে আমার সন্তান! ওই ধর্ম উত্তম নয়........; বরং তোমার ও তোমার বাপ-দাদার ধৰ্মই উত্তম।আমি বললাম: কখনো না; বরং তাদের ধর্ম আমাদের ধর্ম থেকে উত্তম । আমার বাবা আমার কথা শুনে আমার ব্যাপারে ভয় করতে লাগলেন, না জানি আমি বাপ-দাদার ধর্ম থেকে দূরে সরে যাই। তাই তিনি আমাকে পায়ে শিকল দিয়ে বাড়িতে আটকে রাখলেন।
আমি সুযোগ পেয়ে খ্রিস্টানদের নিকটে এক লোককে প্রেরণ করে বললাম: যখন সিরিয়ার দিকে কোনো কাফেলা রওয়ানা করবে তখন আমাকে জানাবে । কিছুদিন না যেতে তারা আমাকে জানাল সিরিয়ার দিকে এক কাফেলা রওয়ানা হবে। আমি আমার পায়ের শিকল জোর করে খুলতে চেষ্টা করি এবং অবশেষে আমি খুলে ফেলতে সক্ষম হই। এরপর আমি খুব গোপনে ঘর থেকে বের হয়ে যাই এবং তাদের সাথে সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছি । বাহন থেকে নামার পর আমি তাদেরকে বললাম: এ ধর্মের সবচেয়ে বড় গুরু কে? তারা বলল: উসকুফ যিনি এই গির্জার প্রধান । আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আমি খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। তাই আমি চাই আপনার খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করব এবং আপনার থেকে এ ধর্মের নিয়ম-কানুন শিখব আর আপনার সাথে নামাজ আদায় করব ।

তিনি বললেন: আস, আমি তাঁর নিকটে গেলাম এবং তাঁর খেদমতে নিয়োজিত হলাম। কিন্তু কিছুদিন পর আমি দেখলাম লোকটি খুব মন্দ। সে মানুষকে আল্লাহর পথে দান করতে উৎসাহিত করত এবং দানের সওয়াব সম্পর্কে বর্ণনা করত, কিন্তু যখন মানুষ দান করত সে তা গরিবদের না দিয়ে নিজের জন্য জমা করে রাখত । এমনকি সে বড় বড় সাতটি কলস স্বর্ণ জমা করে ৷ আর এ কারণে আমি তাকে খুব ঘৃণা করতে লাগলাম। আমি তার মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করলাম। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করার জন্য একত্রিত হলো । আমি তাদেরকে বললাম: তোমাদের গুরু এই লোকটি খুব খারাপ লোক ছিল। সে তোমাদেরকে সকাহ্ দেওয়ার কথা বলত, কিন্তু তোমরা যখন তার কাছে তোমাদের সম্পদ দান করতে সে তা থেকে গরিব মিসকিনদেরকে সামান্য পরিমাণও দান করত না; বরং নিজের জন্য জমা করে রাখত । তারা বলল: তুমি তা কিভাবে জানলে? আমি বললাম: আমি তোমাদেরকে তার জমানো ধনভাণ্ডার দেখাব ।

তারা বলল: হ্যাঁ, তুমি আমাদেরকে তা দেখাও ৷ আমি তাদেরকে তা দেখালাম, তারা সেখান থেকে সাতটি স্বর্ণ-রুপার কলস বের করল। যখন তারা তা দেখল তারা বলল: আল্লাহর শপথ! আমরা তাকে দাফন করব না, এরপর তারা তাকে শূলিতে চড়ায় এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করে ৷ তারপর কিছুদিন না যেতেই তার স্থানে অন্য একজন লোক নিয়োগ করা হয়, আর আমি তাঁর খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করি। আমি তাঁর মতো দুনিয়াবিরাগী এবং আখেরাতমুখী লোক আর দেখিনি। তিনি দিন-রাত ইবাদতে কাটাতেন। আর এ কারণে আমি তাকে খুব ভালোবাসতে শুরু করি এবং দীর্ঘদিন আমি তাঁর খেদমত করে কাটাই। যখন তিনি মৃত্যুর মুখে পতিত হন আমি তাঁকে বললাম: আপনার পর আমি কার নিকটে যাব? তিনি বললেন: আমার জানা মতো কোনো ব্যক্তি এরূপ নেই তবে মুসেলে বসবাসকারী এক ব্যক্তি আছে, সে সত্যের ওপর আছে এবং সত্যকে বিকৃত করে না । যখন তিনি মারা গেলেন আমি মুসেলের সেই ব্যক্তির নিকটে যাই। আমি তাঁর নিকটে আমার সব ঘটনা খুলে বলি। আমি তাঁকে বললাম: উমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার নিকটে আসার জন্যে আদেশ দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন আপনি সত্যের উপরে আছেন। তিনি বললেন: তুমি আমার নিকটে থাক।

তারা বলল: হ্যাঁ আমরা তোমাকে নিয়ে যাব । তারা আমাকে নিয়ে আসল। যখন আমরা ওয়াদিল কুরাতে পৌঁছলাম তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আমাকে এক ইয়াহুদির নিকটে বিক্রি করে দেয়। আমি তার খেদমত করতে থাকি ।

এর কিছুদিন পরে সেই ইয়াহুদিকে তার চাচাতো ভাই দেখতে আসে এবং সে তার থেকে আমাকে ক্রয় করে ইসরিবে নিয়ে আসে। এই শহরে এসে আমি সেই সকল বৈশিষ্ট্যগুলো পেলাম যা যা আম্মুরিয়ার লোকটি আমাকে বলেছিলেন। আর তাই আমি তার সাথে মদিনায় অবস্থান করতে লাগলাম । নবী করীম সাপ্তাহ তখন মক্কার মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে ছিলেন, কিন্তু আমি দাস হওয়ার কারণে সেই খবর পাইনি । এর কিছুদিন পর রাসূল মদিনায় হিজরত করেন। আল্লাহর কসম! আমি খেজুরের গাছের মাথায় কাজ করছিলাম আর আমার মালিক নিচে বসা ছিলেন এমন সময় তার নিকটে তার চাচাতো ভাই এসে বলল: আল্লাহ তাআলা আউস ও খায়ায গোত্রকে হত্যা করত, তারা কোবা নগরীতে এক লোককে স্বাগতম জানানোর জন্যে একত্রিত হয়েছে। তারা ধারণা করে সে লোকটি নবী।

আমি যখন একথা শুনলাম সাথে সাথে আমার জ্বর হওয়ার মতো কম্পন শুরু হয়ে গেল। আমি মতো বেশি কাঁপতে লাগলাম যেন আমি পড়ে যাব। আমি তাড়াতাড়ি নেমে গেলাম এবং তাকে বললাম: আপনি কি বলেছেন? খবরটি আবার বলুন । একথা বলাতে আমার মালিক আমার উপরে খুব রাগান্বিত হয়ে আমাকে খুব জোরে ঘুষি মেরে বললেন: তোমার এর দরকার কি? তুমি তোমার কাজে যাও । যখন সন্ধ্যা হলো আমি আমার জমা করা কিছু খেজুর নিয়ে তার নিকটে রওয়ানা হলাম । আমি তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বললাম: আমি জানতে পেরেছি আপনি খুব সৎলোক । আর আপনার সাথে গরিব অনেক লোক আছে যারা খুব অভাবী। আর এগুলো হচ্ছে আমার কাছে থাকা কিছু সকার খেজুর। আমার ধারণা মতে আপনারাই এর বেশি হকদার। এ কথা বলে আমি তা তাকে দিলাম । তিনি তা নিয়ে তার সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা এগুলো খাও, কিন্তু তিনি তা থেকে কিছুই খেলেন না। আমি মনে মনে বললাম: এটি হচ্ছে প্রথম আলামত ।

তারপর আমি চলে যাই এবং আবার কিছু খেজুর জমা করি। যখন তিনি কোবা থেকে মদিনায় আসেন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আমি দেখেছি আপনি সদ্‌কাহ্ খান না তাই আমি আপনার জন্যে কিছু হাদিয়া এনেছি। তখন তিনি তা থেকে নিজে খেলেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে খেতে বললেন ।আমি তাঁর নিকটে থাকতে শুরু করলাম এবং তাঁকে ভালো লোক হিসেবেই পেলাম, কিন্তু কিছুদিন পর তিনিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আমি তাঁকে বললাম: হে উমুক! আমি আল্লাহকে পাওয়ার আশায় আপনার নিকটে এসেছি আর আপনি আমার ব্যাপারে সব জানেন, সুতরাং আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার নিকটে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন?
তিনি বললেন: হে বৎস! এমন কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে আমার জানা নেই যে আমার এই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, তবে নসীবীনে এক ব্যক্তি আছে তুমি তার কাছে যেতে পার। তাঁর দাফন-কাফন শেষ হওয়ার পর আমি তাঁর আদেশ মতো সে লোকের কাছে যাই এবং তাঁকে সব খুলে বলি ।

তিনি আমাকে বললেন: তুমি আমার কাছে থাক আমি তাঁর কাছে থাকতে শুরু করলাম এবং আমি তাঁকে ভালো লোক হিসেবে পেলাম। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমি তাঁর কাছে থাকি। তাঁর মৃত্যুশয্যায় আমি তাঁকে বললাম: আপনি তো আমার সম্পর্কে জানেন সুতরাং আপনার পরে আমাকে কার কাছে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন: হে বৎস! আমার জানা নেই এমন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যে আমার এই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, তবে আম্মুরিয়ায় এক ব্যক্তি আছে তুমি তার কাছে যেত পার । আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং আমার সব ঘটনা তাঁকে বললাম । তিনি আমাকে বললেন: তুমি আমার কাছে থাক । আমি তাঁর কাছে থাকতে শুরু করলাম এবং তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমি তাঁর কাছেই থাকি। যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে আসে আমি তাঁকে বললাম: আপনি আমার সম্পর্কে জানেন; সুতরাং আপনি আমাকে কার নিকটে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন: হে বৎস! আমার জানা নেই এমন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যে আমার এই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, কিন্তু একজন নবী আগমনের সময় অনেক নিকটবর্তী। যিনি আরবে আগমন করবেন। যিনি ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্মের ওপর প্রেরিত হবেন। তারপর তিনি দুই পাথরের মধ্যবর্তী খেজুরের বাগানের এলাকায় হিজরত করবেন। তাঁর কিছু আলামত থাকবে সেগুলো তুমি ভুলে যাবে না।

তিনি হাদিয়া খাবেন, কিন্তু সদ্‌কাহ্ খাবেন না। তাঁর দুই কাঁধের মধ্যখানে মোহরে নবুওয়াত থাকবে। তুমি যদি সেই দেশে যেতে পার তাহলে যাও । তাঁর মৃত্যুর পর আমি আম্মুরিয়াতে কিছুদিন অবস্থান করি। ঠিক সেই সময়ে সেখানে আরবের কোনো এক গোত্র থেকে কিছু লোক ব্যবসা করতে যায় । আমি তাদেরকে বললাম: তোমরা যদি আমাকে আরব দেশে নিয়ে যাও তাহলে আমি তোমাদেরকে আমার এই গরু এবং ছাগল দুইটি দিয়ে দিব। তারা বলল: হ্যাঁ আমরা তোমাকে নিয়ে যাব । তারা আমাকে নিয়ে আসল। যখন আমরা ওয়াদিল কুরাতে পৌঁছলাম তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আমাকে এক ইয়াহুদির নিকটে বিক্রি করে দেয়। আমি তার খেদমত করতে থাকি ।

এর কিছুদিন পরে সেই ইয়াহুদিকে তার চাচাতো ভাই দেখতে আসে এবং সে তার থেকে আমাকে ক্রয় করে ইসরিবে নিয়ে আসে। এই শহরে এসে আমি সেই সকল বৈশিষ্ট্যগুলো পেলাম যা যা আম্মুরিয়ার লোকটি আমাকে বলেছিলেন। আর তাই আমি তার সাথে মদিনায় অবস্থান করতে লাগলাম । নবী করীম সাপ্তাহ তখন মক্কার মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে ছিলেন, কিন্তু আমি দাস হওয়ার কারণে সেই খবর পাইনি । এর কিছুদিন পর রাসূল মদিনায় হিজরত করেন। আল্লাহর কসম! আমি খেজুরের গাছের মাথায় কাজ করছিলাম আর আমার মালিক নিচে বসা ছিলেন এমন সময় তার নিকটে তার চাচাতো ভাই এসে বলল: আল্লাহ তাআলা আউস ও খায়ায গোত্রকে হত্যা করত, তারা কোবা নগরীতে এক লোককে স্বাগতম জানানোর জন্যে একত্রিত হয়েছে। তারা ধারণা করে সে লোকটি নবী।

আমি যখন একথা শুনলাম সাথে সাথে আমার জ্বর হওয়ার মতো কম্পন শুরু হয়ে গেল। আমি মতো বেশি কাঁপতে লাগলাম যেন আমি পড়ে যাব। আমি তাড়াতাড়ি নেমে গেলাম এবং তাকে বললাম: আপনি কি বলেছেন? খবরটি আবার বলুন । একথা বলাতে আমার মালিক আমার উপরে খুব রাগান্বিত হয়ে আমাকে খুব জোরে ঘুষি মেরে বললেন: তোমার এর দরকার কি? তুমি তোমার কাজে যাও । যখন সন্ধ্যা হলো আমি আমার জমা করা কিছু খেজুর নিয়ে তার নিকটে রওয়ানা হলাম । আমি তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বললাম: আমি জানতে পেরেছি আপনি খুব সৎলোক । আর আপনার সাথে গরিব অনেক লোক আছে যারা খুব অভাবী। আর এগুলো হচ্ছে আমার কাছে থাকা কিছু সকার খেজুর। আমার ধারণা মতে আপনারাই এর বেশি হকদার। এ কথা বলে আমি তা তাকে দিলাম । তিনি তা নিয়ে তার সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা এগুলো খাও, কিন্তু তিনি তা থেকে কিছুই খেলেন না ।
আমি মনে মনে বললাম: এটি হচ্ছে প্রথম আলামত ।

তারপর আমি চলে যাই এবং আবার কিছু খেজুর জমা করি। যখন তিনি কোবা থেকে মদিনায় আসেন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আমি দেখেছি আপনি সদ্‌কাহ্ খান না তাই আমি আপনার জন্যে কিছু হাদিয়া এনেছি। তখন তিনি তা থেকে নিজে খেলেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে খেতে বললেন । আমি মনে মনে বললাম: এটি হচ্ছে দ্বিতীয় আলামত । তারপর একদিন আমি তাঁর নিকটে গেলাম। তিনি তখন বাকিউল গরকদে ছিলেন। আমি দেখতে পেলাম তিনি বসে আছেন, তখন তিনি চাদর পরা অবস্থায় ছিলেন। আমি তাকে সালাম দিলাম এবং তার পেছনে গেলাম যাতেকরে আম্মুরিয়ার লোকটির বর্ণিত খতমে নবুওয়াতটি আমি দেখতে পাই।
যখন রাসূল দেখলেন আমি তাঁর পিঠের দিকে তাকাচ্ছি তিনি আমার প্রয়োজন বুঝতে পেরে তাঁর পিঠ থেকে চাদর তুলে নেন। অতঃপর আমি তার পিঠের দিকে তাকালাম এবং খতমে নবুওয়াত দেখতে পেলাম। আমি তা দেখে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁকে চুমু দিলাম এবং কাঁদতে শুরু করলাম। রাসূল আমাকে বললেন: তোমার কি হয়েছে?

আমি তাঁকে আমার সব ঘটনা খুলে বললাম। এতে তিনি অনেক আশ্চর্য হলেন। তিনি চাইলেন আমি যেন এ ঘটনা তাঁর সাহাবীদেরকে শুনাই। আমি তা সাহাবীদেরকে শুনালাম এতে তাঁরাও অনেক অবাক হলো এবং খুব খুশি হলো । হযরত সালমান ফারেসীর ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষিত হউক এবং আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুক। যিনি সত্যের অন্বেষণে সারাটি জীবন ব্যয় করেছিলেন।

তথ্য সূত্র ১. আল ইসাবা - ২য় খণ্ড, ৬২ পৃ. ২. আল ইসতিআ'ব - ২য় খণ্ড, ৫৬ পৃ. ।
৩. আল জারহু ওয়াত্ তা'দীল – ২য় খণ্ড, ২৯৬-২৯৭ পৃ.
। ৪. আল জামউ বায়না রিজালিস্ সহীহাইন - ১ম খণ্ড, ১৯৩ পৃ. ।
৫. সিয়ারু আ'লামিল নুবালা – ১ম খণ্ড, ৩৬২-৪০৫ পৃ.।
৬. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী - ২য় খণ্ড, ১৫৮-১৬৩ পৃ. ।
৭. উসদুল গবাহ - ২য় খণ্ড, ৩২৮-৩৩২ পৃ.
৮. ত্ববাকাতুশ্ শা’রানী - ৩০-৩১ পৃ.
৯. সিফাতুস্ সয়া - ১ম খণ্ড, ২১০-২২৫ পৃ. 1
১০. শাযরাতুয্ যাহাব - ১ম খণ্ড, ৪৪ পৃ.
১১. তাক্বরীবুত্ তাহযীব - ১ম খণ্ড, ৩১৫ পৃ. ।
১২. তাহযীবুত্‌ তাহযীব - ৪র্থ খণ্ড, ১৩৭-১৩৯ পৃ.

ট্যাগ সমূহ: ইসলামিক গল্প, গায়ের লোক দাড়িয়ে যাওয়া ইসলামিক গল্প, বাংলা ইসলামিক গল্প, হযরত আবু বকর (রাঃ), খেলাফত, জান্নাতের সু সংবাদ পাওয়া সাহবী, মুসলিমদের ইতিহাস, বীর, শহীদ, পৃথিবীর যাদের মনে রাখবে, মহানবী, মুহাম্মদ, আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, বিশিষ্ট সাহবীদের জীবনী, Bir, Shohid, muhmmad, harat ali, harat omor, hazrat abu bokor, sahabider jiboni, islamer etihas, hazrat muhammad er sahabi, hazrat muhammad er shongi, sokol sahabider jiboni, হযরত, হযরত সালমান আল ফারেসী (রাঃ) এর জীবনী, Sahabi Salman Al Fareshi er Jiboni,

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.