হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী

“যাকে কনস্ট্যানটিনোপল নগরীর প্রাচীরের অদূরে দাফন করা হয়।”
বনূ নাজ্জার গোত্রের এই মহান সাহাবীর আসল নাম খালিদ বিন জায়েদ বিন কুলাইব ৷
তাঁর উপনাম ছিল আবু আইয়ূব, আর তাঁকে আনসারদের দিকে নিসবত করে আনসারী বলে ডাকা হতো । আমাদের মুসলমানদের মধ্যে কে এমন আছে যে ব্যক্তি আবু আইয়ূব আল আনসারীকে চিনে না? আল্লাহ তাআলা পশ্চিম-পূর্ব উভয় দিগন্তে তাঁর মর্যাদাকে বুলন্দ করেছেন। রাসূল হিজরত করে মদিনায় আগমন করলে সেখানে অবস্থান করার জন্যে আল্লাহ তাআলা সকল মুসলমানদের মাঝে তাঁর ঘরকে নির্বাচন করে সৃষ্টির মধ্যে তাঁর মর্যাদা সুউচ্চ করেছেন। আর হযরত আইয়ূব আল আনসারীর গর্ব করার জন্য এটিই যথেষ্ট..........! রাসূল মদিনা এসে তাঁর ঘরে আগমনের সময় যে ঘটনাটি ঘটেছে তা এতই স্মরণীয় ঘটনা যে, যত বেশি তা বর্ণনা করা হয় তত এর মজা ও মিষ্টতা বাড়তেই থাকে । আর সেই ঘটনাটি.........
রাসূল মদিনা আগমন করলে তাঁর সাথে মদিনার সম্মানিত লোকেরা সাক্ষাৎ করতে লাগল যেমনিভাবে কোনো প্রতিনিধি আগমন করলে এলাকার নেতারা সাক্ষাৎ করেন।

তাঁদের প্রতিটি চক্ষু তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল যেমনিভাবে ভালোবাসায় পাগল তার ভালোবাসার লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকে । তাঁরা রাসূল -এর জন্য তাঁদের অন্তর খুলে দিলেন যাতে করে তিনি সেখানে অবস্থান গ্রহণ করেন । তাঁরা তাঁদের ঘরের প্রধান দরজা খুলে দিলেন যাতেকরে তিনি তাঁদের ঘরে সসম্মানে মেহমানদারি গ্রহণ করেন।
কিন্তু রাসূল মদিনা থেকে অল্প দূরে কোবা নগরীতে চার দিন অবস্থান করলেন এবং সেখানে প্রথম মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করলেন । তারপর তিনি উটে আরোহণ করে কোবা নগরী থেকে বের হয়ে মদিনার উদ্দেশে রওয়ানা করেন। তখন মদিনার সম্মানিত নেতারা পথে অপেক্ষা করতে ছিলেন, প্রত্যেকের প্রত্যাশা রাসূল -কে নিজ ঘরের মেহমান বানিয়ে শ্রেষ্ঠ মানবের মেজবান হওয়ার মর্যাদা অর্জন করবেন । এক নেতার পর এক নেতা রাসূল এর উটটি থামাতে চেষ্টা করছিলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন- হে আল্লাহর রাসূল! সঙ্গী সাথি, সম্পদ ও নিরাপত্তার সাথে আপনি আমাদের ঘরে অবস্থান করুন। রাসূল বললেন: তোমরা উটকে ছেড়ে দাও, কেননা তা কোথায় গিয়ে অবস্থান করবে সে ব্যাপারে সে আদিষ্ট উটটি তার গন্তব্যের দিকে হাঁটতে লাগল । প্রত্যেকের চোখ তার পানে তাকিয়ে রইল আর অন্তরকে তার সাথে লেগে রাখল ।

যখনি উটটি কোনো দরজার নিকটে আসত তখন তার মালিক আশা পোষণ করতেন রাসূল আমার ঘরেই থাকবেন, কিন্তু যখনি তাঁর ঘর অতিক্রম করে চলে যেত তখন তিনি হতাশ হয়ে যেতেন। আর পরের ঘরের মালিকেরা আশায় থাকতেন। এ রকম অনেককে হতাশ করে উটটি সামনের দিকে চলতে লাগল। আর মানুষও সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে দেখার জন্যে উঁটির পেছনে পেছনে চলতে লাগল। অবশেষে উটটি হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারীর ঘরের সামনে একটি খালি মাঠে গিয়ে তার যাত্রাবিরতি করল এবং সেখানে বসে পড়ল । কিন্তু রাসূল তার পিঠ থেকে নামলেন না । এতে উটটি লাফিয়ে উঠে আবার চলা শুরু করল। আর রাসূলও তার লাগাম ঢিলে করে দিলেন। কিন্তু উটটি কয়েক কদম সামনে গিয়ে পুনরায় পূর্বের স্থানে ফিরে এসে বসে পড়ল ।

এতে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারীর অন্তর আনন্দে ভরে গেল। তিনি মতো বেশি খুশি হয়েছেন যে সমগ্র দুনিয়া পেলেও মতো খুশি হতেন না। তিনি রাসূল -কে স্বাগতম জানাতে লাগলেন। নিজ হাতে রাসূল -এর আসবাপত্র নামাতে লাগলেন। যেন তিনি তাঁর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেয়ে গেছেন । হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী এর ঘর ছিল দোতলাবিশিষ্ট। তিনি রাসূল সাপাহার-কে আপ্যায়ন করার জন্যে তাঁর ঘরের উত্তম আসবাবপত্র উপরের তলায় একত্রিত করেন। আর সেখান থেকে তাঁর ও তাঁর পরিবারের আসবাবপত্র নিচে নিয়ে আসেন । কিন্তু রাসূল নিচ তলা নিজের জন্য বেছে নিলেন। তিনি তাঁদেরকে উপরের তলায় থাকার জন্য নির্দেশ দিলেন। হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রাসূল -এর আদেশ বাস্তবায়নে তিনি উপরে অবস্থান করেন এবং রাসূল -কে তাঁর পছন্দের স্থানে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। রাত ঘনিয়ে আসলে রাসূল তাঁর বিছানায় গেলেন এবং হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী ও তাঁর স্ত্রী উপরের তলায় অবস্থান নিলেন। কিন্তু যখন তিনি দরজা বন্ধ করেন তিনি তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন: তোমার জন্য আফসোস্! আমরা কি করছি? রাসূল নিচে থাকবেন আর আমরা উপরে থাকব? আমরা কি রাসূল -এর উপরে হাঁটাচলা করব?

আমরা কি নবী ও অহীর মাঝে আড়াল হব? তাহলে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। বিষয়টি ভেবে তাঁরা লজ্জিত হয়ে গেলেন। তাঁরা এখন কি করবেন তা ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না। তাঁদের অন্তরে কিছুতেই প্রশান্তি লাগছিল না । আর তাই তাঁরা উপরের তলায় এক পাশে অবস্থান নিলেন কেননা মধ্য ভাগ বরাবর নিচে রাসূল অবস্থান করছেন। এতে তাঁরা একটু শান্ত হন । তাঁরা ভয় করতে লাগলেন যদি সামান্য নড়াচড়ার কারণে ওপর থেকে রাসূল আলাইহি এর গায়ে ধুলোবালি পড়তে পারে। এতে রাসূল -এর কষ্ট হবে। আর তাই তাঁরা সেই স্থান থেকে নড়লেন না; বরং কিনারা দিয়ে হেঁটে তাঁদের প্রয়োজনীয় কাজ সারলেন । রাতের অন্ধকার গিয়ে সকাল হলে তিনি রাসূল -কে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল আমি আর আইয়ূবের মা গত রাতে চোখের পাতা বন্ধ করতে পারিনি রাসূল বললেন: কেন হে আবু আইয়ূব (আইয়ূবের বাবা) ? তিনি বললেন: আমরা আপনার উপরে অবস্থান করার কারণে আমাদের ভয় হয়, যদি আমরা নড়াচড়া করি তাহলে আপনার গায়ে ধুলোবালি পড়বে এতে আপনার কষ্ট হবে।

রাসূল সালামাহ তাঁকে বললেন: হে আবু আইয়ূব! একে সহজভাবে নাও। আমার জন্যে নিচে অবস্থান করা সহজ কেননা আমার নিকটে বার বার মানুষ আসা যাওয়া করবে। হযরত আবু আইয়ূব বলেন: আমরা রাসূল -এর আদেশ পালনার্থে উপরে অবস্থান করি। আর সেই রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ছিল। হঠাৎ আমাদের পানির পাত্রটি ভেঙে দ্বিতলা পুরো পানিতে ভেসে গেল। আমি ও আইয়ূবের মা তাড়াতাড়ি পানির দিকে ছুটে আসি । আমাদের গায়ে দেওয়ার মতো একটিমাত্র চাদর ছিল। যে চাদরটি আমরা লেপ হিসেবে ব্যবহার করতাম। আমরা ওই চাদরটি দ্বারাই পানি মুছে নিই। এই ভয়ে যে, পানি যদি আবার রাসূল সাক্ষাতেই -এর বিছানায় গিয়ে পড়ে । সকাল বেলা আমি রাসূল নিকটে গিয়ে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কোরবান হউক, আমরা উপরে থাকব আর আপনি নিচে থাকবেন.......

তা আমি পছন্দ করি না । এরপর আমি রাসূল-কে পানি পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি শুনালাম। এতে রাসূল আধার আমার কথায় সাড়া দিয়ে দ্বিতলায় অবস্থান নিলেন। আর আমরা নিচে চলে আসি । রাসূল আবু আইয়ূব আল আনসারীর বাড়িতে সাত মাস অবস্থান করেন । আর এর মধ্যেই মসজিদ নির্মাণ কাজ শেষ হয়। রাসূল সালামান-এর উট মদিনায় এসে যেখানে প্রথম বসেছিল সেখানে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ নির্মাণ করার সময় রাসূল ও তাঁর বিবিদের জন্যে যে কয়েকটি কামরা তৈরি করা হয়েছিল, মসজিদ নির্মাণ কাজ শেষ হলে রাসূল তাঁর বিবিদেরকে নিয়ে সেই কামরাগুলোতে অবস্থান নিলেন। এতে রাসূল আবু আইয়ূব আল আনসারীর প্রতিবেশী হয়ে গেলেন। আর আবু আইয়ূব আল আনসারী রাসূলের অতি নিকটে থাকার সুযোগ পেলেন।

আবু আইয়ূব আল আনসারী রাসূল -কে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন । রাসূল ও তাঁকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। রাসূল তাঁর ঘরকে নিজের ঘরের মতো দেখতেন। আর তাঁর সকল সমস্যা নিজে সমাধান করে দিতেন । হযরত ইবনে আব্বাস আবু আইয়ূব আল আনসারী -এর সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেন......... হযরত আবু বকর ঠিক দুপুরে ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে এসে দেখলেন হযরত উমর ও সেখানে...... । হযরত উমর বললেন: হে আবু বকর! এই সময়ে আপনি কেন বের হলেন? হযরত আবু বকর বললেন: আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালায় বের হয়েছি। হযরত উমর বললেন: আল্লাহর শপথ! আমিও একই কারণে বের হয়েছি । তাঁদের কথোপকথনের মাঝে রাসূলও সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।

রাসূল তাঁদেরকে জিজ্ঞেসা করলেন- এই অসময়ে তোমরা কেন বের হয়েছ? তাঁরা বললেন: আল্লাহর শপথ! আমরা পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করার কারণে বের হয়েছি। রাসূল বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! আমিও এই একই কারণে বের হয়েছি.........। সুতরাং তোমরা আমার সাথে চল । তাঁরা চলতে চলতে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী এর বাড়িতে আসলেন। তিনি প্রতি দিন রাসূল -এর জন্যে খাবার তৈরি করতেন। খাবারের নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরেও যদি রাসূল না আসতেন, তখন তিনি খাবারগুলো তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে খেতে দিতেন ।

রাসূল ও তাঁর দুই সাহাবী আবু বকর ও উমর বলে আবু আইয়ূব আল আনসারীর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে তাঁর স্ত্রী তাঁদেরকে দেখে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি বললেন: আল্লাহর নবীকে স্বাগতম আর যারা তাঁর সাথে আগমন করেছে তাদেরকেও স্বাগতম । রাসূল তাঁর স্ত্রীকে বললেন: আবু আইয়ূব কোথায়? হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী পাশে একটি খেজুর গাছে কাজ করতে ছিলেন। তিনি রাসূল -এর কথা শুনতে পেয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে এসে বললেন: আল্লাহর রাসূলকে স্বাগতম, আর যাঁরা তাঁর সাথে আগমন করেছেন তাদেরকেও স্বাগতম । তারপর তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনিতো স্বাভাবিকভাবে এই সময়ে আসেন না ।

রাসূল বললেন: ঠিক বলেছ । তারপর তিনি খেজুর গাছের দিকে ছুটে গিয়ে একটি খেজুরের কাঁদি কেটে নিয়ে আসলেন। তাতে পাকা, কাঁচা ও শুকনো তিন প্রকারের খেজুরই ছিল। রাসূল বললেন: তুমি খেজুরের পুরো কাঁদিটি কেটে আনবে তা আমার ইচ্ছে ছিল না । সেখান থেকে কয়েকটি খেজুর নিয়ে আসলে কি হতো না? তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি পছন্দ করি, আপনি কাঁচা, পাকা ও শুকনো সব রকমের খেজুর খাবেন। আর অবশ্যই আমি আপনার জন্যে পশু জবাই করব। হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী একটি বকরি ধরে জবাই করে দিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন: তুমি ময়দা ভিজাও এবং আমাদের জন্যে রুটি বানাও।

কেননা তুমি রুটি ভালো বানাতে পার। তিনি বকরির অর্ধেক নিয়ে রান্না করেন আরেক অর্ধেককে কাবাব করেন। যখন রান্না প্রস্তুত হলো তিনি তা রাসূল - এর সামনে পেশ করলেন। রাসূল বকরির একটি অংশ নিয়ে রুটিতে রেখে বললেন: হে আবু আইয়ূব আল আনসারী! তুমি এটি ফাতেমাকে দিয়ে আস কেননা সে অনেক দিন যাবত এর মতো খাবার খেতে পায়নি । যখন রাসূল খানা খেয়ে পরিতৃপ্ত হলেন, তিনি বললেন: রুটি, গোশত, শুকনা, পাকা ও কাঁচা খেজুর!!! একথা বলার পর তাঁর দু চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে ।এরপর তিনি বললেন: আমার প্রাণ যার হাতে তার শপথ! এই সেই নেয়ামত যার সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে। যখন তোমরা তা খেতে হাত বাড়াবে তখন তোমরা বিসমিল্লাহ্ বলে খাওয়া শুরু কর। আর যখন খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বল-
الحمد لله الذي هو أشبعَنَا وَأَنْعَمُ عَلَيْنَا فَأَفْضَلُ
অর্থ- সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে পরিতৃপ্ত করেছেন এবং উৎকৃষ্ট ও উত্তম নেয়ামত দান করেছেন।

এরপর রাসূল । সেখান থেকে উঠে আবু আইয়ূব আল আনসারী কে বললেন: তুমি আমাদের বাড়িতে আগামী কাল যাবে। রাসূল -এর স্বভাব ছিল কেউ তাঁকে আপ্যায়ন করলে, তিনি তাকে এর থেকেও উত্তমভাবে আপ্যায়ন করতেন। কিন্তু আবু আইয়ূব আল আনসারী রাসূল এর কথাটি শুনতে পাননি । তাই উমর তাঁকে বললেন: হে আবু আইয়ূব! রাসূল তোমাকে তাঁর বাড়িতে যেতে বলেছেন। তিনি বললেন: আমি রাসূল -এর কথা শুনব ও তাঁর আনুগত্য করব । পরের দিন আবু আইয়ূব রাসূল এর নিকটে গেলে তিনি তাঁকে ওলিদা নামক একটি দাসী উপহার দিলেন। যে দাসীটি রাসূল -এর খেদমত করত । রাসূল তাঁকে বললেন: এর সাথে ভালো আচরণ করবে কেননা এই দাসী যত দিন আমাদের নিকটে ছিল সর্বদা তাকে আমরা ভালো কাজ করতে দেখেছি।

হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী নিয়ে বাড়িতে পৌঁছলেন। দাসীকে দেখে বললেন: হে আবু আইয়ূব! এই দাসী কার? তিনি বললেন: রাসূল আমাদেরকে তা উপহার দিয়েছেন । তাঁর স্ত্রী বললেন: তিনি কতই না শ্রদ্ধাভাজন! তাঁকে সম্মান কর। আর এই দাসী কতই না উত্তম উপহার। সুতরাং এর প্রতি সদ্ব্যবহার কর। তিনি বললেন: রাসূল আমাদেরকে তাঁর প্রতি সদয় হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন । তাঁর স্ত্রী বললেন: আমরা কি করলে আল্লাহর রাসূলের আদেশ পুরোপুরি পালন করা হবে? তিনি বললেন: আল্লাহ শপথ! আমি একে আজাদ করে দেওয়া থেকে অধিক উত্তম আর কিছুই দেখি না । তাঁর স্ত্রী বললেন: তুমি সঠিক কথা বলেছ, আর তুমি তা কর তাহলে তুমি যথাযথভাবে রাসূল -এর কথা বাস্তবায়ন করেছ। ...... তারপর তিনি তাকে আজাদ করে দিলেন । এই হচ্ছে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী -এর স্বাভাবিক জীবনচিত্র। আর আমরা যদি তাঁর রণাঙ্গনের জীবনচিত্র তুলে ধরি তাহলে তা আপনাকে আরো বেশি আশ্চর্যান্বিত করবে।

তিনি তাঁর সারা জীবন জিহাদে জিহাদে কাটিয়েছেন। এমনকি তাঁর ব্যাপারে বলা হয় রাসূল -এর যুগ থেকে শুরু করে হযরত মুয়াবিয়া -এর যুগ পর্যন্ত এমন কোনো যুদ্ধ নেই যাতে তিনি অংশগ্রহণ করেননি। তবে হ্যাঁ, দুই টি যুদ্ধ একত্রে সংঘটিত হলে ভিন্ন কথা । তাঁর শেষ যুদ্ধ ইস্তাম্বুল বিজয়ের যুদ্ধ। যে যুদ্ধে হযরত মুয়াবিয়া ইয়াজিদের নেতৃত্বে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় করতে এক দল মুজাহিদ বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী তখন বৃদ্ধকাল অতিবাহিত করছিলেন। তাঁর বয়স আশি ছুঁই ছুঁই। এতো বৃদ্ধ বয়স হওয়া সত্ত্বেও তিনি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁকে এই বার্ধক্যতা ইয়াজিদের নেতৃত্বে সমুদ্র যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি । কিন্তু তিনি কিছু দূর যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে গেলেন। তিনি এতো বেশি অসুস্থ হয়ে গেলেন যে, তিনি আর জিহাদ করতে সক্ষম না। তাঁর অসুস্থতার কথা শুনে ইয়াজিদ তাকে দেখতে আসেন। ইয়াজিদ বললেন: হে আবু আইয়ূব আপনার কোনো কিছু লাগবে?

তিনি বললেন: মুসলিম মুজাহিদদেরকে আমার সালাম জানাবে এবং তাদেরকে বলবে আবু আইয়ূব এই বলে ওসিয়ত করেছে যে, তোমরা শত্রুদের ভূমির শেষ সীমানা পর্যন্ত যাবে। আর তাকে তোমাদের সাথে বহন করে নিয়ে যাবে এবং তাকে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের নিকটে দাফন করবে। এরপর তিনি তাঁর পবিত্র শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মুসলমানগণ রাসূল -এর এই সাহাবীর কথা পালন করলেন। তাঁরা শত্রুদের ওপর একের পর এক হামলা করে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের নিকটে গিয়ে পৌঁছে। হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী -এর কথামতো তারা তাঁকে তাদের সাথে করে নিয়ে যান। অতঃপর সেখানে কবর খুঁড়ে তাঁকে দাফন করেন ।

আল্লাহ তাআলা হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারীর ওপর রহম করুক। তিনি তাঁর জীবন জিহাদ করে করে অতিবাহিত করেছেন এমনকি শেষ পর্যন্ত জিহাদের যাওয়ার পথে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স আশির কাছাকাছি ছিল ।

তথ্য সূত্র ১. আল ইসাবা - ১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ ।
২. খুলাসাতু তাহীবি তাহযীবিল কামাল - ১০০-১০১ পৃ.।
৩. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী ২য় খন্ড - ৩২৭-৩২৮ পৃ.।
৪. ইবনু খায়্যাত – ৮৯, ১৪০, ১৯০, ৩০৩ পৃ.
৫. দায়িরাতুল মাআ’রিফিল ইসলামিয়্যা - ১ম খণ্ড, ৩০৯-৩১০ পৃ.
৬. আল জাউ বায়না রিজালিস্ সহীহাইন - ১ম খণ্ড, ১১৮-১১৯ পৃ.।
৭. মিন আবতলিনা আল্লাজিনা সনাউত্ তারীখ লি আবীল ফাতুহী তাওনিসী - ১০৫-১১০ পৃ.।
৮. আল ইসতিআ’ব - ১ম খণ্ড, ৪০৩ পৃ.
৯. আত্‌ ত্ববাকাতুল কুবরা - ৩য় খণ্ড, ৪৮৪-৪৮৫ পৃ.।
১০. সিফাতুস্ সফওয়া - ১ম খণ্ড, ১৮৬-১৮৭ পৃ.
১১. আল জারহু ওয়াত্ তা’দীল - ২য় খণ্ড, ১৩১ পৃ.
১২. আল ইবরু - ১ম খণ্ড, ৫৬ পৃ. ।
১৩. উসদুল গবাহ্ - ৫ম খণ্ড, ১৪১-১৪৪ পৃ.।
১৪. তাহযীবুত্‌ তাহযীব - ৩য় খণ্ড, ৯০-৯১ পৃ.
১৫. তাক্বরীবুত্ তাহযীব -১ম খণ্ড, ২১৩ পৃ. ।
১৬. শিষরাতুত্ যাহাব - ১ম খণ্ড, ৫৭ পৃ ।
১৭. তাজরীদু আসমায়িস্ সাহাবা - ১ম খণ্ড, ১৬১ পৃ.
১৮. সিলসিলাতু আ.লামিল মুসলিমীন - ৪র্থ নং ।
১৯. আল আ'লাম - ২য় খণ্ড, ৩৩৬ পৃ.।