03/02/23

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

 হযরত উমাইর বিন ওয়াহাব (রাঃ) এর জীবনী

“উমাইর ইসলাম গ্রহণ করে আমার নিকটে আমার কতক সন্তান থেকেও অধিক প্রিয় হয়ে গেল” [তাঁর ব্যাপারে হযরত উমর -এর মন্তব্য]

হযরত উমাইর সীমা বদরের যুদ্ধে কাফেরদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তিনি বদরের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে নিরাপদে মক্কায় ফিরে আসেন, কিন্তু অন্যদিকে তাঁর ছেলে ওহাব মুসলমানদের হাতে বন্দি হয়ে যায়।
আর তাই উমাইর ভয় করছিলেন যে, তাঁর অপরাধের কারণে মুসলমানরা তাঁর ছেলেকে ধরবে এবং তাকে কঠিন শাস্তি দিবে। কেননা তিনি রাসূল ও তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণকারী সাহাবীদেরকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছেন ।
এরই মধ্যে একদিন সকালবেলা উমাইর কা'বা ঘর তাওয়াফ করার জন্য ও মূর্তিদের থেকে বরকত হাসিল করার জন্য কা'বার প্রাঙ্গণে গেলেন। তখন তিনি সেখানে সফওয়ান বিন উমাইয়াকে পাথরের নিকটে বসা অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন: সুপ্রভাত, হে কোরাইশ সর্দার । সফওয়ান বলল: সুপ্রভাত, হে আবু ওয়াহাব। বস আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি। কেননা গল্প করলে সময় কেটে যায়। হযরত উমাইর তার নিকটে গিয়ে বসলেন। তাঁরা বদর যুদ্ধ ও এর চরম পরাজয় নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। বদরের যুদ্ধে রাসূল ও তাঁর সাহাবীদের হাতে বন্দি হওয়া কোরাইশদের সংখ্যা গণনা করতে লাগলেন ৷ তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন ওই সকল কোরাইশ নেতাদের জন্য যারা বদরের প্রান্তরে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে এবং তাদের লাশ কালীব নামক কূপে নিক্ষেপ করে মাটিচাপা দিয়ে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে।

কথা বলতে বলতে সফওয়ান বিন উমাইয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল: আল্লাহর শপথ। তাদের মৃত্যুর পরে, আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো সার্থকতা নেই ৷ হযরত উমাইর বললেন: আল্লাহর শপথ! তুমি সত্য বলেছ ...........│ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তিনি আবার বললেন: কা'বার প্রতিপালকের শপথ করে বলি, যদি আমার এ ঋণগুলো না থাকতো যেগুলো আমি পরিশোধ করতে পারছি না, আর আমার অবর্তমানে আমার পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ভয় না হতো তাহলে অবশ্য আমি মুহাম্মদের নিকটে ছুটে গিয়ে তাকে হত্যা করতাম এবং তার এ দ্বীন প্রচারকে স্তব্ধ করে দিয়ে মানুষকে তার ক্ষতি থেকে মুক্ত করতাম । এরপর নিচু স্বরে সুফওয়ানের কানে কানে বলতে লাগলেন- আমার ছেলে তো তাদের হাতে বন্দি আর এ কারণে আমি ইয়াসরিব গেলে তারা কোনো প্রকার সন্দেহ করতে পারবে না ।

সফওয়ান একে একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করল। এ সুবর্ণ সুযোগ সে হারাতে চাইলো না। সে উমাইরের দিকে তাকিয়ে বলল: হে উমাইর! তোমার সকল ঋণ তা যত বেশি হোক না কেন, সেগুলো আমার দায়িত্বে। আমি তা পরিশোধ করে দিব। আর আমি যতদিন জীবিত থাকি ততদিন তোমার পরিবারের ভরণ- পোষণের দায়িত্বও আমার । আমার সম্পদের পরিমাণ মতো বেশি যে, তা দ্বারা তারা সকলে অনেক আরাম- আয়েশে খেয়ে যেতে পারবে। তখন হযরত উমাইর বললেন: তাহলে তুমি এ বিষয়টি গোপন রাখবে। কাউকে তা অবগত করবে না। সফওয়ান বলল: তুমিও তা গোপন রাখবে ।
উমাইর অন্তরে মুহাম্মদ -এর জন্য প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে ছিল। তিনি তাঁর কথা অনুসারে উঠে পড়লেন এবং মদিনা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। তাঁর মদিনা ভ্রমণের ব্যাপারে কেউ সন্দেহ করবে এরূপ কোনো ভয় ছিল না। কেননা মক্কার কোরাইশ বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনরা তাদেরকে মুক্ত করার জন্য বার বার মক্কা-মদিনার পথে আসা যাওয়া করছিল। হযরত উমাইর -এর আদেশে তাঁর তরবারিকে শান দিয়ে তক্তকে ঝক্‌ঝকে করা হলো 'এবং তাতে বিষ মেখে খাপে পুরে নিল । তিনি তাঁর বাহন প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। বাহন প্রস্তুত করা হলে তিনি বাহনে চড়ে বসেন এবং মদিনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন । তিনি মদিনায় পৌঁছে রাসূল -এর উদ্দেশে মসজিদের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। অতঃপর মসজিদের নিকটে এসে তিনি উট বসিয়ে তা থেকে মদিনার মাটিতে পদার্পণ করেন।

হযরত উমর মসজিদে নববীর দরজার অদূরে অন্য সাহাবীদের সাথে বসা ছিলেন। তাঁরা বদর যুদ্ধের বন্দি ও নিহতদেরকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন এবং মুসলিম মুহাজির ও আনসারদের সাহাসিকতা ও বীরত্বের কথা বলছিলেন। আর তাঁদের প্রতি আল্লাহর তাআলার সাহায্য ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করছিলেন এবং তাদের দৃষ্টির সামনে আল্লাহর শত্রুদের যে কঠিন পরিণতি ও লাঞ্ছনা তারা দেখেছেন সেই সকল বিষয় তারা তুলে ধরলেন। হঠাৎ করে হযরত উমরের দৃষ্টি গিয়ে হযরত উমাইর -এর ওপর পড়ল। তখন তিনি তাঁর বাহন থেকে নামছিলেন। তিনি তাঁর তরবারি গলায় ঝুলিয়ে মসজিদের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন । হযরত উমর তাঁকে আসতে দেখে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামদেরকে বললেন: এ কুকুর আল্লাহর শত্রু উমাইর বিন ওয়াহাব..........। আল্লাহর শপথ! সে কোনো না কোনো খারাপ মতল নিয়েই এসেছে। সে মক্কায় মুশরিকদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিত এবং বদরের পূর্ব পর্যন্ত সে তাদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছে।

তারপর উমর যুক্তি তার মজলিসে উপস্থিত লোকদেরকে বললেন: তোমরা রাসূল সামাধান-এর নিকটে যাও এবং তাঁর চতুর্দিকে ঘিরে বস। আর ষড়যন্ত্রকারী এ খবীসের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখ । তারপর তিনি রাসূল -এর নিকটে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শত্রু উমাইর তরবারি ঝুলিয়ে এদিকে আসছে, আমার ধারণা সে খারাপ কোনো উদ্দেশ্যেই আসছে । রাসূল বললেন: তাকে আসতে দাও । হযরত উমর বলে উমাইরের দিকে এগিয়ে গেলেন, তিনি তাঁর জামা শক্ত করে ধরলেন এবং তাঁর গলায় ঝুলানো তরবারি নিয়ে নিলেন তারপর তাঁকে রাসূল -এর নিকটে নিয়ে এলেন । যখন রাসূল এ অবস্থা দেখে উমর -কে বললেন: হে উমর তাকে ছেড়ে দাও । রাসূল হযরত উমর -কে পুনরায় বললেন: তুমি পিছনে যাও। হযরত উমর পিছনে গেলেন ৷ রাসূল হযরত উমাইরকে লক্ষ্য করে বললেন: হে উমাইর! তুমি আরো কাছে আস । হযরত উমাইর কাছে এসে বললেন: শুভ সকাল ।

রাসূল বললেন: আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এর থেকেও উত্তম শুভেচ্ছা বিনিময় শিক্ষা দিয়ে সম্মানিত করেছেন। তিনি আমাদেরকে 'সালাম' দ্বারা সম্মানিত করেছেন। আর তা হচ্ছে জান্নাতবাসীদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পদ্ধতি I উমাইর বলল: আল্লাহর শপথ! আপনি আমাদের এ শুভেচ্ছা বিনিময়ের পদ্ধতিতে কিছুদিন আগেও ছিলেন। আর সালামের পদ্ধতি তো আপনি কিছু দিন আগ থেকে শুরু করেছেন । রাসূল তাঁকে বললেন: হে উমাইর! তুমি কেন এসেছ?

হযরত উমাইর বললেন: আপনার হাতে বন্দি হওয়া লোকদের মুক্তির জন্যে আমি আপনার নিকটে এসেছি, সুতরাং আপনি এ ব্যাপারে আমার প্রতি সদয় ব্যবহার করুন। রাসূল বললেন: তাহলে তোমার গলায় তরবারি ঝুলিয়ে আনার কারণ কি? তিনি বললেন: আল্লাহ তরবারিকে ধ্বংস করুক, সেটি কি বদরের প্রান্তে আমাদের কোনো উপকারে এসেছে?রাসূল আবার বললেন: তুমি আমার নিকটে সত্য কথা বল। তুমি কেন এসেছ? তিনি বললেন: আমি এ কারণেই এসেছি। রাসূল বললেন: ; বরং তুমি ও সফওয়ান পাথরের নিকটে বসে বদরের নিহত নেতাদের নিয়ে আলোচনা করেছিলে। তারপর তুমি বলেছ- যদি আমার ঋণ না থাকতো এবং আমার পরিবারের ক্ষুধার্ত থাকার ভয় না করতাম তাহলে মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যে আমি ছুটে যেতাম.......। তুমি আমাকে হত্যা করবে এ শর্তে সফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়। আর তোমার এ কথাগুলো আল্লাহ আমার কানে পৌঁছালেন ।

রাসূল -এর কথা শুনে উমাইর হতভম্ব হয়ে গেলেন। এরপর তিনি আর অপেক্ষা না করে বললেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল । তারপর তিনি বলতে লাগলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদেরকে আসমানী যে সকল সংবাদ শুনাতেন তা আমরা মিথ্যা বলতাম, কিন্তু আমি আর সফওয়ানের মধ্যে যে কথা হয়েছে তা আমি আর সে ব্যতীত আর কেউ জানে না। আর আমার বিশ্বাস, এ সংবাদ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ আপনাকে জানায়নি । সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার যিনি আমাকে হেদায়েত দেওয়ার জন্যে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে। তারপর তিনি সাক্ষ্য দিতে লাগলেন- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর এভাবেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল তাঁর সাহাবীদেরকে বললেন: তোমাদের ভাইকে দ্বীন ও কোরআন শিক্ষা দাও এবং তার বন্দিদেরকে মুক্ত করে দাও । উমাইর ইসলাম গ্রহণ করার কারণে মুসলমানরা খুবই খুশি হলো। এমনকি হযরত উমর বলতে লাগলেন- “যখন উমাইর রাসূল -এর নিকটে আগমন করেছে তখন তাঁর থেকে একটি শুকুর আমার নিকটে উত্তম ছিল। আর এখন সে ইসলাম গ্রহণ করে আমার নিকটে আমার কতক সন্তান থেকেও অধিক প্রিয় হয়ে গেল।”

হযরত উমাইর মদিনায় অবস্থান করে ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে পবিত্র করতে লাগলেন এবং কোরআনের আলোতে নিজের অন্তরকে আলোকিত করতে লাগলেন। তিনি মক্কা ও মক্কার অধিবাসীদের কথা ভুলে গিয়ে মদিনায় জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক ও মূল্যবান সময়গুলো কাটাতে লাগলেন । ওই দিকে সফওয়ান অনেক বড় আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সে মক্কাবাসীদেরকে বলতে লাগল তোমরা অচিরেই অনেক বড় সুসংবাদ শুনতে পাবে যা তোমাদের বদরের দুঃখ ভুলিয়ে দিবে । কিন্তু অনেক দিন অপেক্ষা করার পরও যখন উমাইর মক্কায় ফিরে আসেননি তখন তার দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তার মনে উমাইরের প্রতি ক্ষোভ জাগতে থাকে। সে বিভিন্ন দিক থেকে আগত লোকদেরকে বার বার উমাইর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল, কিন্তু কারো থেকে কোনো প্রকার সন্তোষজনক উত্তর পেল না ।

হঠাৎ একদিন এক লোক মদিনা থেকে মক্কা এসে বলল: উমাইর ইসলাম গ্রহণ করেছে।
এ সংবাদটি যেন তার মাথায় বজ্রের মতো আঘাত করে। তার কাছে সমগ্ৰ বিশ্ববাসী ইসলাম গ্রহণ করলেও মতো কষ্ট লাগতো না, উমাইর ইসলাম গ্রহণ করার কারণে যতটুকু কষ্ট লেগেছে । ওই দিকে উমাইর তার দ্বীন শিখার পর এবং কোরআন থেকে কিছু আয়াত মুখস্থ করার পর রাসূল সালাম-এর নিকটে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে আমার জীবনের অনেক সময় আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাজ করেছি এবং মুসলমানদেরকে অত্যাচার করেছি। আর এখন আমি তা পছন্দ করি আপনি আমাকে মক্কায় যাওয়ার অনুমতি দিবেন, সেখানে গিয়ে আমি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিব। যদি তারা ইসলামের দিকে আসে তাহলে ভালো আর যদি না আসে তাহলে আমি তাদেরকে শাস্তি দিব যেমনিভাবে ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে মুসলমানদেরকে শাস্তি দিয়েছি। রাসূল তাঁকে মক্কা যাওয়ার অনুমতি দিলেন। হযরত উমাইর মক্কা গিয়ে সফওয়ানের ঘরে গেলেন। তিনি তাঁকে বললেন: হে সফওয়ান! তুমি কোরাইশ নেতাদের মধ্যে একজন এবং জ্ঞানীদের মধ্যেও তুমি অন্যতম। তোমার মতো কি তুমি যে পাথরের মূর্তি পূজা করছ এবং তাদের জন্য পশু জবাই করে উৎসর্গ করছ তাকি কোনো ধর্মের কাজে পড়ে?.....
আর দেখ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ।

এভাবে হযরত উমাইর দিম মক্কায় ইসলাম প্রচার করতে লাগলেন। তাঁর আহ্বানের সাড়া দিয়ে আল্লাহর অনেক বান্দা ইসলাম গ্রহণ করেন । আল্লাহ হযরত উমাইর মা-কে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তাঁর কবরকে নূরে উজ্জ্বল করুন ।

তথ্য সূত্র
১. হায়াতুস্ সাহাবা – ৪র্থ খণ্ড (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
২. সীরাতে ইবনে হিশাম - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
৩. আল ইসাবা - ৩য় খণ্ড, ৩৬ পৃ.
৪. তাবাকাতু ইবনে সা'দ - ৪র্থ খণ্ড, ১৪৬ পৃ.

 

হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন হুজাফা আসাহমী 

“প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার কপালে চুমু খাওয়া, আর আমি নিজেই সর্বপ্রথম তা শুরু করছি।” [তাঁর সম্মানে হযরত উমর বিন খাত্তাব]-এর বাণী আমাদের এই জীবন-কাহিনীর বীর হলেন রাসূল -এর সম্মানিত সাহাবী যাঁকে আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা আসাহমী বলে ডাকা হতো ৷ কোনো প্রকার কথা বলা ব্যতীত ইতিহাস তাঁকে পাশ কেটে চলে যেত যেমনিভাবে তাঁর গোত্রের অন্য সাধারণ আরবদেরকে পাশ কেটে চলে গেছে। কিন্তু ইসলাম হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাকে তৎকালীন বিশ্বের শক্তিশালী দুই সম্রাটের সাথে দেখা করার সুযোগ করে দিল। তারা হচ্ছে পারস্য সম্রাট কিরা এবং রোমান সম্রাট কায়সার । আর এই দুই সম্রাটের সাথে সাক্ষাতে আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার সাহসিকতা সবাইকে অবাক করে দিল। যা ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে । যা হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাকে ইসলামের প্রথম যুগ থেকে এখন পর্যন্ত সকল মুসলমানদের অন্তরে স্থান করে দিয়েছে । পারস্যের সম্রাট কিম্রার সাথে ঘটিত ঘটনা যা ষষ্ঠ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিল...... যখন নবী করীম তাঁর সাহাবীদের থেকে এক দল লোককে অনারব সম্রাট কিসরার নিকটে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি পত্র দিয়ে প্রেরণ করার সংকল্প করলেন । এটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ও কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তা রাসূল অনুমান করতে পেরেছেন। কেননা তারা একটি দূরবর্তী দেশে যাবে আর ওই দেশের সাথে মুসলমানদের কোনো প্রকার শান্তি চুক্তিও নেই..........। তাছাড়া পত্রবাহকরা ওই দেশের ভাষাও জানে না। আর ওই রাজ্যের সংস্কৃতিও তাদের পরিচিত না । সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, পত্রবাহকরা তাদেরকে তাদের নিজস্ব ধর্ম, কর্ম, সম্মান ও নেতৃত্ব ত্যাগ করে এমন এক জাতির ধর্ম গ্রহণ করতে বলবে, যে জাতি কিছু দিন আগেও তাদের অনুসারী ছিল। আর এই সকল কারণে সফরটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, যে এই সফরে যাবে তাকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে যেতে হবে। কেননা এই সফর থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আর যে ফিরে আসতে পারবে সে যেন নব-জন্মগ্রহণকারী শিশুর মতো আরেকটি জীবন পাবে । এ মহান কাজের কঠিন পরিস্থিতির কথা ভেবে সাহাবায়ে কেরাম যাতে মনোবল না হারান এবং মানসিকভাবে এ মহান কাজের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য সাহাবীদেরকে উৎসাহিত করতে রাসূল তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ দিলেন ।

এ ভাষণে তিনি প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর কালেমা শাহাদাত পাঠ করলেন। এরপর বললেন: “আমি ইচ্ছা করেছি তোমাদের থেকে কিছু লোককে অনারবদের রাজ্যে প্রেরণ করব। সুতরাং বনী ইসরাইল যেভাবে তাদের নবীদের বিরোধিতা করেছে তোমরা তাদের মতো আমার বিরোধিতা করবে না।” রাসূল -এর সাহাবিগণ বললেন: আপনি যা করতে চাইবেন আমরা তা বাস্ত বায়ন করব। সুতরাং আপনি যেখানে চান আমাদেরকে প্রেরণ করুন। আরব ও অনারবদের রাজ্যে পত্র প্রেরণ করার জন্য রাসূল সাহাবীদের মধ্য থেকে ছয়জনকে বেছে নিলেন। তাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাও ছিলেন। তাঁকে পারস্য সম্রাট কিার নিকটে চিঠি প্রেরণ করার দায়িত্ব দেওয়া হলো ।
আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা তাঁর বাহন ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্তুত করে তাঁর স্ত্রী ও সন্তান থেকে বিদায় নিলেন। তিনি রাসূল সানাহার-এর মহান আদেশ পালন করতে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। এই বিপদসঙ্কুল পথ কখনো তাঁকে পাহাড়ের উঁচুতে উঠিয়েছে আবার কখনো নিম্নভূমিতে নামিয়েছে। আর তিনি একা একাই এই মরণরাস্তা অতিক্রম করছিলেন, সাথে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউই ছিল না। অবশেষে তিনি পারস্য রাজ্যে গিয়ে পৌঁছলেন । পারস্য রাজভবনের সামনে গিয়ে তিনি সম্রাট কিার নিকটে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন এবং সম্রাটের অনুচরকে পত্রের ব্যাপারে অবহিত করলেন ।
আরব থেকে দূত আগমন করার কথা জেনে সম্রাট তার ভবনকে সাজানোর নির্দেশ দিল। সম্রাটের নির্দেশ অনুযায়ী রাজভবনকে সুন্দর করে সাজানো হলো । সম্রাট তার বিশিষ্ট নেতাদেরকে সভায় উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান করল। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা সভায় উপস্থিত হলো। এরপর সম্রাট হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাকে রাজকক্ষে প্রবেশ করার অনুমতি দিল।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা যদি তাহার সাধারণ জুব্বা ও পাগড়ি পরিধান করা বেদুঈনদের বেশে পারস্য সম্রাটের দরবারে প্রবেশ করলেন। কিন্তু তাঁর সাহসিকতা ছিল আকাশচুম্বি, মনোবল ছিল পাহাড়ের মতো অটল। আর তখন তাঁর চেহারা মোবারক ঈমানের নূরে উদ্ভাসিত হচ্ছিল। যখন সম্রাট তাঁকে পত্রটি হস্তান্তর করার জন্য সামনের দিকে আসতে দেখলো, তখন সে তার নিয়োজিত ব্যক্তিদের একজনকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার হাত থেকে পত্রটি নেওয়ার জন্যে ইশারা করল । কিন্তু তিনি বললেন: না, কেননা রাসূল আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন পত্রটি যেন সরাসরি আপনার হাতে হস্তান্তর করি। আর আমি রাসূল -এর নির্দেশ অমান্য করতে পারি না ।

তখন সম্রাট বলল: তাকে আমার কাছে আসতে দাও। হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা তার নিকটে গিয়ে তার হাতে পত্রটি হস্তান্তর করলেন । সম্রাট কিসরা তখন হিরার অধিবাসী এক আরবী লেখককে ডেকে পাঠাল । তাকে আদেশ দিল কিতাবটি তার সামনে খুলে পাঠ করে শুনাতে এবং এর অর্থ বুঝিয়ে দিতে। সম্রাটের আদেশ অনুসারে লেখক পত্রটি পাঠ করা শুরু করল- “পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার নামে শুরু করছি।
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে পারস্যের সম্রাটের প্রতি। যারা হেদায়েতের ওপর তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক...আছে ।” এতটুকু শুনার পর তার বক্ষে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল, তার চেহারা লাল হয়ে গেল, তার ঘাড়ের শিরা-উপশিরা ফুলে উঠল। কেননা রাসূল তার নাম দিয়ে পত্রটি শুরু না করে নিজের নাম দিয়ে শুরু করেছেন। সে লেখকের হাত থেকে পত্রটি ছিনিয়ে নিল এবং তাতে কি আছে তা জানা ব্যতীতই পত্রটি ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। আর চিৎকার করে বলতে লাগল- সে আমার গোলাম হয়ে আমার নিকটে এটি লিখল .....?! তারপর সে হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা -কে সভা থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিল। তার নির্দেশমতো তাঁকে বের করে দেওয়া হলো ।

হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন হুজাফা সম্রাটের সভা থেকে বের হয়ে গেলেন। তিনি তখনো জানেন না আল্লাহ তাঁর ভাগ্যে কি লিখে রেখেছেন। তাঁকে কি হত্যা করা হবে না কি ছেড়ে দেওয়া হবে । কিন্তু তিনি মনে মনে বললেন: আল্লাহর শপথ! রাসূল -এর দেওয়া দায়িত্ব পালন করার পর এর পরিণতির ব্যাপারে আমি কোনো কিছুই পরওয়া করি না। এরপর তিনি বাহনে চড়ে মদিনার পথে রওয়ানা দিলেন ।

যখন সম্রাটের রাগ কমে তখন সে আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাকে তার দরবারে ডাকলো, কিন্তু তাঁকে সেখানে খুঁজে পাওয়া গেল না। তারা তাঁকে আরবের রাস্তায় খুঁজতে লাগল, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পায়নি। কেননা তিনি এতক্ষণে পারস্যের সীমান্ত পার হয়ে গেছেন । হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা মদিনায় পৌঁছে রাসূল -কে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিলেন এবং পত্র ছিড়ে টুকরো টুকরো করার কথা জানালেন। এ কথা শুনে রাসূল শুধু এটুকু বললেন: আল্লাহ তাআলা তার রাজত্বকে টুকরো টুকরো করে ফেলুক । ওই দিক দিয়ে পারস্য সম্রাট ইয়ামানের গভর্নর বাজানের নিকটে ফরমান জারি করে পত্র পাঠালো- তুমি দুই জন শক্তিশালী লোককে প্রেরণ করে হিজাজে উদিত সেই লোকটিকে আমার নিকটে ধরে নিয়ে আস। বাজান তার পছন্দের দুই জন লোককে রাসূল -এর নিকটে পাঠালেন। তারা বাজানের যে পত্রটি নিয়ে রাসূল -এর নিকটে যাবে, তাতে লিখা ছিল- রাসূল যেন কালবিলম্ব না করে তাঁর প্রেরিত সৈন্যদের সাথে পারস্য সম্রাটের সাথে সাক্ষাৎ করতে তার দরবারে হাজির হয়।
বাজান তার দুই সৈন্যকে বলে দিলেন- তারা যেন রাসূল -এর অবস্থান ও কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখে এবং এই ব্যাপারে তাঁকে অবগত করে ৷ সৈন্য দুই জন তাদের যাত্রা শুরু করে। চলতে চলতে তারা তায়েফে এসে পৌঁছলো। তায়েফে তাদের সাথে কোরাইশের একটি ব্যবসায়ী কাফেলার দেখা হলো। তারা তাদেরকে মুহাম্মদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। কাফেলার লোকেরা বলল: সে ইয়াসরিবে আছে। এরপর ব্যবসায়ী কাফেলা আনন্দ-উল্লাস করতে করতে মক্কায় ফিরে গেল। মক্কায় গিয়ে তারা কোরাইশদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে বলল: তোমরা চক্ষু শীতল কর অর্থাৎ- সুসংবাদ গ্রহণ কর, মুহাম্মদের পেছনে পারস্য সম্রাট কিসরা লেগেছে। আর কিার শাস্তিই তোমাদের প্রতিশোধের জন্য যথেষ্ট অন্যদিকে ওই দুই জন সৈন্য রাসূল-এর উদ্দেশে মদিনার দিকে রওয়ানা করে। মদিনায় পৌঁছে তারা রাসূল -এর হাতে পত্রটি হস্তান্তর করল। তারা বলল: আমাদের সম্রাট বাজানকে পারস্য সম্রাট এ আদেশ দিয়েছে- তিনি যেন আপনার নিকটে সৈন্য প্রেরণ করে আপনাকে তার দরবারে হাজির করেন। আর তাই আমরা আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এসেছি; সুতরাং আপনি যদি বিনা বাক্যে আমাদের সাথে রওয়ানা করেন তাহলে আমরা পারস্য সম্রাটের নিকটে আপনার জন্য সুপারিশ করব। যা আপনার উপকারে আসবে এবং তার শাস্তি থেকে আপনাকে বাঁচাবে। আর যদি আপনি যেতে অস্বীকার করেন তাহলে আপনাকে ও আপনার জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারস্য সম্রাটের কতটুকু ক্ষমতা ও শক্তি আছে, সে সম্পর্কে তো অবশ্যই আপনার জানা আছে ।

রাসূল তাদের কথা শুনে মৃদু হেসে বললেন: আজ তোমরা সস্থানে ফিরে যাও । আগামী কাল এসো। পরের দিন সকালে তারা রাসূল আলাইহি-এর নিকটে এসে বলল: আপনি পারস্য সম্রাটের সাথে দেখা করার জন্যে আমাদের সাথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন? রাসূল সালাহাই তাদেরকে বললেন: আজকের পর আর তোমরা পারস্য সম্রাটের সাথে দেখা করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা তাকে হত্যা করেছেন। অমুক মাসের..... অমুক রাতে...... আল্লাহ তাআলা তার ছেলে শিরাওয়াই-এর হাতে তাকে পরাভূত করেছেন ।
তাদের দৃষ্টি রাসূল -এর দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলো। তাদের চেহারায় বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল । তারা বলল: আপনি জানেন আপনি কি বলছেন? আমরা এটি বাজানের নিকটে লিখব?

রাসূল বললেন: হ্যাঁ, এবং তোমরা তাকে বলবে :
“আমার ধর্ম অতি শীঘ্রই কিসরার রাজ্য যতটুকু পৌঁছেছে ততটুকু পৌঁছে যাবে। সুতরাং তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে তোমাকে আমি তোমার আয়ত্তে থাকা রাজ্যটি দান করব এবং তোমাকে তোমার গোত্রের বাদশাহ্ বানাব।” তারপর ওই দুই সৈন্য রাসূল -এর নিকট থেকে চলে গেল । তারা বাজানের নিকটে এসে পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করল। বাজান বললেন: মুহাম্মদ যা বলেছে তা যদি সত্য হয় তাহলে তিনি একজন নবী আর যদি মিথ্যা হয় তাহলে আমরা তাকে দেখে নিব। তাঁকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি এর মধ্যে একদিন শিরাওয়াই-এর পত্র তার নিকটে এসে পৌঁছলো। সেই পত্রে শিরাওয়াই বলল: আমি পারস্য সম্রাটকে হত্যা করেছি। আমার জাতির পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যেই আমি তাকে হত্যা করেছি। কেননা সে অনেক সম্মানিত ব্যক্তিদের হত্যা করেছে তাদের মহিলাদেরকে বন্দি করেছে এবং তাদের সম্পদ লুট করেছে। যখনই আমার পত্র তোমার নিকটে পৌঁছবে তখনই তোমার কাছে যারা আছে তাদের থেকে আমার আনুগত্যের স্বীকৃতি নিবে ।
এ পত্রটি পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাজান ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন এবং তার সাথে ইয়ামানে অবস্থানরত সকল পারস্যবাসীও ইসলাম গ্রহণ করলেন।

বর্ণিত কাহিনীটি ছিল হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার সাথে পারস্য সম্রাটের সাথে ঘটে যাওয়া কাহিনী । তাহলে রোমান সম্রাটের সাথে ঘটে যাওয়া সেই কাহিনীটি কী ? হ্যাঁ, এবার শুনুন রোমান সম্রাটের সাথে ঘটে যাওয়া সেই কাহিনী - হযরত উমর রাদিয়ালা -এর শাসন কালে রোমান সম্রাটের সাথে হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার সাথে ঘটে যাওয়া সেই কাহিনীটি অনেক চমৎকার। ঊনবিংশ হিজরীতে রোমের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে হযরত উমর সিয়ারার একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাও ছিলেন। ইতোমধ্যে মুসলিম সৈন্যদের ঈমানী শক্তি ও সাহসিকতার কথা রোমান সম্রাটের কানে গিয়ে পৌঁছে। আল্লাহর জন্যে যুদ্ধের ময়দানে নির্ভীকভাবে মুসলিম সৈন্যদের শহীদ হওয়ার কথাও সে জানতে পারে । আর তাই সে তার সৈন্যবাহিনীকে আদেশ করে- যখন তারা বিজয় লাভ করবে তখন তারা যেন মুহাম্মদ -এর সাহাবীদের থেকে কাউকে বন্দি করে জীবিত নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা তাদের হাতে বন্দি হয়ে গেলেন। তারা তাঁকে বন্দি করে তাদের সম্রাটের নিকটে নিয়ে গিয়ে বলল: এ লোকটি মুহাম্মদের অগ্রগামী সাহাবীদের একজন । আমাদের হাতে বন্দি হয়েছে। আমরা তাকে আপনার নিকটে নিয়ে এসেছি।
রোমের সম্রাট আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর বলল: আমি তোমার সমীপে একটি প্রস্তাব পেশ করছি। হযরত হুজাফা শামিম বললেন: কী প্রস্তাব? সম্রাট বলল: তুমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ কর। যদি তুমি তা কর আমি তোমাকে ছেড়ে দিব এবং তোমাকে যথেষ্ট সম্মানজনক পুরস্কার প্রদান করব। তখন হযরত হুজাফা ঘৃণা ও দৃঢ়তার সাথে বললেন: হায় আফসোস ! তুমি আমাকে যেদিকে ডাকছো তা করা থেকে হাজারবার মৃত্যুবরণ করা আমার নিকটে অধিক উত্তম । সম্রাট বলল: আমি তোমাকে বিচক্ষণ মনে করছি...... । সুতরাং তুমি যদি আমার কথায় সাড়া দাও তাহলে তোমাকে আমার কাজে অংশীদার করব এবং আমার রাজত্বের ভাগ দিব। এ কথা শুনে লোহার শিকলে বন্দি হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাইফা মৃদু হেসে বললেন: আল্লাহর শপথ! তুমি যদি আমাকে তোমার সমগ্র রাজত্ব দিয়ে দাও এবং আরবে তুমি যা কিছুর মালিক সব দিয়ে দাও তাহলেও আমি মুহাম্মদের ধর্ম থেকে একচুল পরিমাণও নড়ব না । সম্রাট বলল: তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব ।

তিনি বললেন: তোমার ইচ্ছে। তারপর সম্রাট তাঁকে শুলিতে চড়ানোর নির্দেশ দিল। সম্রাটের নির্দেশ অনুসারে তাঁকে শূলিতে চাড়ানো হলো। সম্রাট তীরন্দাজকে বলল: তোমরা তার হাতের আশপাশে তীর নিক্ষেপ কর। এরপর সম্রাট তাঁকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে আহ্বান করে, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন । সম্রাট আবার বলল: তোমরা তার পায়ের আশপাশে তীর নিক্ষেপ কর। অন্যদিকে সে তাঁকে তার নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে আহ্বান করে, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। সম্রাট নিরাশ হয়ে তাঁকে শূলি থেকে নামানো আদেশ দিল। সে তার লোকদেরকে বড় একটি পাত্র নিয়ে আসার নির্দেশ দিল। সেই পাত্রটি তেল ঢেলে ভর্তি করা হলো। এরপর তা আগুনের উপরে রেখে উত্তপ্ত করা হলো। তেলগুলো আগুনের তেজে টগবগ করতে লাগল। এরপর সম্রাট মুসলিম বন্দিদের থেকে দুই জন বন্দিকে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল। তাদের একজনকে গরম তেলে নিক্ষেপ করল। নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তার গোশতগুলো গলে হাড্ডি থেকে আলাদা হয়ে গেল এবং খালি হাড্ডিগুলো ভেসে উঠল। এরপর সম্রাট আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার আহ্বান করে। এবার তিনি আগের থেকেও জোর গলায় তা প্রত্যাখ্যান করেন ।

সম্রাট যখন হতাশ হয়ে গেল তখন তাঁকেও তাঁর সঙ্গীদের মতো গরম তেলে নিক্ষেপ করার আদেশ দিয়ে চলে গেল। সম্রাট চলে যাওয়ার পর হযরত হুজাফা কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর কান্না দেখে তারা সম্রাটকে গিয়ে বলল: সে তো কাঁদছে....... সম্রাট ধারণা করল তিনি ভয় পেয়েছেন। আর তাই সে তাদেরকে বলল: তাকে আমার নিকটে নিয়ে আস। তারা তাঁকে নিয়ে আসলে সম্রাট আবারও তাঁকে খ্রিস্টান হওয়ার প্রস্তাব দিল, কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান ।

সম্রাট বলল: তোমার ধ্বংস হতো! তাহলে তুমি কেন কেঁদেছ? তিনি বললেন: আমি এ ভেবে কেঁদে ছিলাম যে, আমাকে এখন তেলে নিক্ষেপ করা হলে তো আমি মাত্র একবার মারা যাব, কিন্তু আমার তো ইচ্ছা আমার শরীরে যত পশম আছে তত সম পরিমাণ যদি আমার আত্মা থাকতো তাহলে আমাকে ততবার এ পাত্রে নিক্ষেপ করা হতো। আর আমি ততবার আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতাম । সম্রাট বলল: তুমি কি আমার কপালে চুমু খাবে? তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিব ।

তিনি তাকে বললেন: সকল মুসলমান বন্দিকে ছেড়ে দিবে? সম্রাট বলল: হ্যাঁ, সকল মুসলমান বন্দিকে ছেড়ে দিব । তিনি বলেন: আমি মনে মনে বলতে লাগলাম- সে আল্লাহর শত্রু, আমি তার মাথায় চুমু খাব আর এতে সে আমাকে ও মুসলিম বন্দিদেরকে ছেড়ে দিবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই ৷ এ কথা ভেবে তিনি তার নিকবর্তী হলেন এবং তার কপালে চুমু খেলেন। তারপর রোমের সম্রাট তার নিকটে সকল মুসলিম বন্দিকে হস্তান্তর করার নির্দেশ দিল।
তিনি খলীফা উমর রাদিয়ার -এর নিকটে ফিরে এসে তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিলেন। ঘটনাটি শুনে হযরত উমর রাশিয়ায় অনেক বেশি খুশি হলেন। আর বললেন: “প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার কপালে চুমু খাওয়া, আর আমি নিজেই সর্বপ্রথম তা শুরু করছি। ”

তথ্য সূত্র: ১. আল ইসাবাহ্ - ২য় খণ্ড, ২৫৬ পৃ.।
২. আস্ সিরাতুন নববিয়্যাতে লি ইবনে হিশাম - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
৩. হায়াতুস্ সাহাবা লি মুহাম্মদ ইউসুফ কান্দাহলভী - (সূচিপত্র)।
৪. তাহযীবুত্‌ তাহযীব - ৫ম খণ্ড, ১৮৫ পৃ.
৫. ইমতাউল আসমা' - ১ম খণ্ড, ৩০৮, ৪৪৪ পৃ.।
৬. হুসনুস্ সাহাবা - ৩০৫ পৃ. ৷
৭. আল মুহাব্বার - ৭৭ পৃ. ৷
৮. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী - ২য় খণ্ড, ৮৮ পৃ.।

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.