03/01/23

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

হযরত তোফায়েল বিন আমর আল আদ্দাউসী (রা.) এর জীবনী 

 “হে আল্লাহ! তাকে একটি নিদর্শন দান কর যা তাকে তার নিয়তকৃত ভালো কাজ সম্পাদন করতে সাহায্য করবে।” [তাঁর জন্য রাসূল এর বিশেষ দোয়া]


হযরত তোফাইল বিন আমর আদ্দাউসী জাহিলোী যুগে দাউস গোত্রের সর্দার ছিলেন এবং আরবদের বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গদের একজন ছিলেন। তাছাড়াও আরবদের উল্লেখযোগ্য বীরদের তালিকায় তিনিও ছিলেন। তাঁর চুলা থেকে কখনো পাত্র নামানো হতো না এবং তাঁর ঘরের সামনের দরজা কখনো বন্ধ করা হতো না । তিনি ক্ষুধার্তকে খেতে দিতেন, বিপদগ্রস্তকে নিরাপত্তা দিতেন আর আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে আশ্রয় দিতেন। তিনি একজন ভাষাবিদ, প্রখর মেধার অধিকারী ও প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি এমন একজন কবি ছিলেন যাঁর কবিতা মানুষের অনুভূতিকে জাগ্রত করত, তাঁর বক্তৃতা মানুষের ওপর জাদুর মতো কাজ করত ।

হযরত তোফাইল তাঁর গোত্রের লোকদেরকে তিহামায় রেখে মক্কার দিকে পথ দিলেন। তখন রাসূল ও কোরাইশ কাফেরদের মাঝে দ্বন্দ্ব চলছিল। উভয় পক্ষের লোকেরা নিজেদের পক্ষে ব্যাপক প্রচার করছে এবং নিজের দলের দিকে মানুষদেরকে আহ্বান করছে। উভয় দল নিজের সহযোগী বাড়ানোর ও নিজের দলের প্রতি সাহায্য পাওয়ার কামনা করত। একদিকে রাসূল তাঁর প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করছেন তাঁর হাতিয়ার হচ্ছে ঈমান ও সত্যবাদিতা। অন্যদিকে মক্কার কাফেররা জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার ও মিথ্যাবাদিতা দ্বারা রাসূল সমাহার-এর এই দাওয়াতের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই লড়াইয়ের মাঝে হযরত তোফাইল কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই এসে পড়েছেন এবং কোনো রকম ইচ্ছা ব্যতীত এর মাঝে জড়িয়ে পড়েন । কিন্তু তিনি মক্কা নগরীতে এ রকম কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেননি এবং মুহাম্মদ ও কোরাইশদের ব্যাপারে তাঁর কোনো ধারণাও ছিল না। কিন্তুতারপরেও ঈমান ও কুফরীর লড়াইয়ে তাঁর জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটে গেল যা কখনো ভুলার মতো না। আর সেই ঘটনাটি আমরা এখন মনযোগ সহকারে শ্রবণ করব। কেননা তা অনেক আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা।

হযরত তোফাইল নিজেই সেই ঘটনা বর্ণনা করেন........
তিনি বলেন:
আমি মক্কা আগমন করার পর কোরাইশদের নেতারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করলো এবং তারা আমাকে অনেক উত্তমভাবে স্বাগতম জানাতে লাগল এবং অনেক বেশি সম্মান করতে লাগল । তারপর কোরাইশদের বড় বড় নেতারা আমার নিকটে জমা হলো এবং তারা বলল: হে তোফাইল! তুমি এইমাত্র আমাদের দেশে এসেছ, আর এ ব্যক্তি যে নিজেকে নবী মনে করে আমাদের কাজে ফাসাদ সৃষ্টি করছে, আমাদেরকে হেস্ত নেস্ত করছে, আমাদের দলকে খণ্ড-বিখণ্ড করছে। এ জন্যেই আমরা তোমার ও তোমার গোত্রের ব্যাপারে ভয় করছি, না জানি সে তোমার ও তোমার গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করে দেয় যেমনিভাবে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং তুমি লোকটির সাথে কোনো কথা বলবে না এবং তার কোনো কথা শুনবেও না। কেননা তার কথা জাদুর মতো, যা বাবা ও ছেলের সম্পর্ক, ভাই ও বোনের সম্পর্ক এবং স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে দেয় ।

হযরত তোফাইল বলেন:
আল্লাহর শপথ করে বলি, তারা আমাকে তাঁর ব্যাপারে যে আশ্চর্যজনক খবর শুনিয়েছে এবং তাঁর বিস্ময়কর কাজের কথা বলে আমার ও আমার গোত্রের ব্যাপারে যে কঠিন ভয় দেখিয়েছে তা আমার মন থেকে যাচ্ছিল না। এমনকি আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছি আমি তাঁর নিকটবর্তী হব না এবং তাঁর সাথে কোনো কথা বলব না, তাঁর কোনো কথা শুনবও না ।
যখন আমি সকালবেলা কা'বা শরীফ তাওয়াফ করতে এবং কা'বার ভেতরে থাকা মূর্তিদের থেকে পুণ্য লাভ করতে গেলাম, যে সকল মূর্তির নিকটে আমরা হজ্ব সম্পাদন করি এবং তাদেরকেই শুধু সম্মান প্রদর্শন করি তখন আমি আমার কানে তুলা গুঁজে দিলাম। যাতেকরে আমি মুহাম্মদ -এর কোনো কথা শুনতে না পাই, কিন্তু আমি কা'বা ঘরে প্রবেশ করে দেখলাম তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন । তবে সেই নামাজ আমাদের নামাজের মতো না। তিনি ইবাদত করছেন যে ইবাদত আমাদের ইবাদতের মতো না। তাঁর নামাজ ও ইবাদতের দৃশ্যটি আমার হৃদয়ে প্রভাববিস্তার করতে থাকে। আমি দেখলাম আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি ধীরে ধীরে তাঁর দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি এবং আসতে আসতে আমি তাঁর নিকটে চলে আসছি। যদিও আমি তাঁর কথা শুনার ভয়ে কানে তুলা দিয়েছি, কিন্তু আল্লাহ চাইলেন তিনি আমার কর্ণকুহুরে তাঁর বাণী পৌঁছাবেনই। আর তাই কানে তুলা থাকার পরেও আমি তাঁর মনোমুগ্ধকর কালাম শুনতে পেলাম ।
তারপর মনে মনে বলতে লাগলাম- হে তোফাইল! তোমার মা তোমাকে হারাতো, এই লোকটি একজন প্রজ্ঞাবান কবি। আর তোমার নিকটে খারাপ ভালো অস্পষ্ট নয়। তাহলে লোকটি যা বলে তা শুনতে তোমার বাধা কিসের.....? যদি লোকটি ভালো কথা বলে তাহলে তুমি তা গ্রহণ করবে আর যদি খারাপ কথা বলে তাহলে তা তুমি পরিত্যাগ করবে।

হযরত তোফাইল বলেন: তারপর আমি সেখানে অপেক্ষা করতে থাকলাম, কিছুক্ষণ পর রাসূল তাঁর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করে তাঁর পিছনে পিছনে চলতে লাগলাম। তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করলেন তখন আমিও তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম ।
আমি তাঁকে বললাম: হে মুহাম্মদ। আপনার জাতির লোকেরা আপনার ব্যাপারে এমন এমন কথা বলেছে। আল্লাহর শপথ! আপনার ভয়ে আমি আমার কান পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছি, যাতেকরে আমি আপনার কোনো কথা শুনতে না পাই, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা আমাকে শুনাবেনই আর আমি যা শুনেছি তা অনেক সুন্দর... । সুতরাং আপনি আপনার বিষয়টি আমার নিকটে স্পষ্ট করে তুলে ধরুন..........।

তিনি তাঁর বিষয়টি আমার নিকটে তুলে ধরলেন এবং তিনি আমাকে সূরা ইখলাস ও ফালাক পাঠ করে শুনালেন। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর কথা থেকে উত্তম কথা আর শুনতে পাইনি এবং তাঁর কাজ থেকে অধিক সঠিক কাজ আর কাউকে করতে দেখিনি। আর তখনি আমি তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিই এবং কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলামে প্রবেশ করি ।
হযরত তোফাইল বলেন: এরপর আমি রাসূল থেকে ইসলামের বিধানসমূহ জানার জন্যে কিছু দিন মক্কায় অবস্থান করি এবং সেই সময়ে আমার নিকটে কোরআনের যে সকল আয়াত সহজে মুখস্থ করা সম্ভব হয়েছে তা মুখস্থ করি। যখন আমি আমার দেশে ফেরার ইচ্ছা করি তখন আমি রাসূল-কে বললাম: “হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে আমার গোত্রের লোকেরা মান্য করে, আর আমি ফিরে গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করব। সুতরাং আপনি আল্লাহর নিকটে দোয়া করুন আল্লাহ যেন আমাকে এমন একটি নিদর্শন দান করেন যা তাদেরকে মুগ্ধ করে আমার আহ্বান করা পথে নিয়ে আসতে সাহায্য করবে।” রাসূল বললেন: হে আল্লাহ আপনি তাকে একটি নিদর্শন দান করুন। তারপর আমি আমার গোত্রকে যেখানে রেখে এসেছি সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। যখন আমি তাদের নিকটে এসে পৌঁছলাম তখন একটি নূর এসে আমার দুই চোখের মাঝে বাতির মতো জ্বলছিল।

আমি বললাম: হে আল্লাহ! তুমি এই নূর আমার চেহারা ব্যতীত অন্য স্থানে রাখ । কেননা আমি ভয় করলাম আমার জাতি যদি ধারণা করে তাদের ধর্ম ত্যাগ করার কারণে শাস্তিস্বরূপ এটি আমার চেহারায় এসে পতিত হয়েছে....... তারপর আল্লাহ তাআলা তা আমার মাথার মধ্য ভাগে নিয়ে এসেছেন। আর মানুষ এই নূরটি আমার মাথায় ঝুলন্ত বাতির মতো দেখছিল। আমি তখন পাহাড়ের চূড়া থেকে নামছিলাম। যখন আমি বাহন থেকে নামলাম আমার বাবা আমার দিকে এগিয়ে আসেন। তিনি অনেক বৃদ্ধ ছিলেন । আমি বললাম: হে আমার পিতা! আমার থেকে দূরে সরে যান কেননা আমি আপনার কেউ না আপনিও আমার কেউ না ।

আমার পিতা বললেন: কেন হে বৎস ? আমি বললাম: আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ পানাহার-এর আনুগত্য করেছি। আমার পিতা বললেন: হে আমার ছেলে তোমার ধর্মই আমার ধর্ম আমি বললাম: আপনি গিয়ে গোসল করুন এবং আপনার জামা-কাপড় পবিত্র করে আসুন তারপর আমি যা শিখেছি আপনাকে তা শিখাব । তারপর তিনি গোসল করতে গেলেন এবং জামা-কাপড় পবিত্র করে আসলেন । তখন আমি তার নিকটে ইসলাম ধর্ম পেশ করলাম। আর তিনি তা গ্রহণ করলেন। তারপর আমার স্ত্রী আমার নিকটে আসল। আমি তাকে বললাম: আমার থেকে দূরে সরে যাও কেননা আমি তোমার কেউ না তুমিও আমার কেউ না । আমার স্ত্রী বলল: আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য কোরবান হউক, কেন আমি দূরে সরে যাব? আমি বললাম: ইসলাম তোমার আর আমার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে । আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ সালাহর -এর আনুগত্য করেছি। আমার স্ত্রী বলল: তাহলে তোমার ধর্মই আমার ধর্ম । আমি বললাম: তাহলে যাও, জুশরায়ের পাশ ঘেঁষে পাহাড় হতে প্রবাহিত ঝর্নার পানি দ্বারা গোসল করে পবিত্র হয়ে আস । আমার স্ত্রী বলল: আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হউক। আপনি কি জুসরায় সেই তরুণীর (মূর্তি) ব্যাপারে কোনো ভয় করেন না? আমি বললাম: তোমার ও জুসরায়ের জন্যে ধ্বংস। তুমি যাও, মানুষ থেকে দূরে গিয়ে গোসল করে আস। আমি তোমার জিম্মাদার, ওই বোবা পাথরের মূর্তিটি তোমার কিছুই করতে পারবে না ।

তারপর সে গিয়ে গোসল করে আসল। তখন আমি তার নিকটে ইসলাম ধর্ম পেশ করলাম আর সে তা গ্রহণ করল। তারপর আমি দাউস গোত্রের লোকদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করলাম । আবু হুরায়রা ব্যতীত সকলেই আমার আহ্বানে সাড়া দিতে অনেক দেরি করে ৷ তবে আবু হুরায়রা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেন ।
হযরত তোফাইল বলেন: “তারপর আমি রাসূল -এর সাথে সাক্ষাৎ করতে মক্কায় গমন করি। আমার সঙ্গে আবু হুরায়রাও মক্কায় আসেন।” রাসূল আমাকে বললেন: তোমার গোত্রের কি অবস্থা?

আমি বললাম: তাদের অন্তরে কঠিন কুফরী রয়েছে, যা সত্যের পথে অন্তরাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে দাউস গোত্রের মাঝে গুনাহ ও অবাধ্যতা প্রাধান্য পেয়েছে । এটি শুনে রাসূল অযু করার জন্যে উঠে গেলেন। অযু করার পর তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। তারপর আসমানের দিকে দুই হাত উঁচু করেন । হযরত আবু হুরায়রা বলেন: আকাশের দিকে রাসূল সালালাহ-এর হাত তোলা দেখে আমি ভয় পেয়েছি না জানি রাসূল আমার জাতির বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করেন আর এতে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি বলতে লাগলাম- হায় আমার জাতি কিন্তু রাসূল বলতে লাগলেন : হে আল্লাহ! তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়েত দান কর............

হে আল্লাহ! তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়েত দান কর....
হে আল্লাহ! তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়েত দান কর............
তারপর রাসূল তোফাইলকে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি তোমার জাতির নিকটে ফিরে যাও, তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার কর এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে ডাকতে থাক । হযরত তোফাইল মা বলেন:

রাসূল -এর থেকে বিদায় নিয়ে আমি আমার এলাকায় ফিরে গেলাম । দাউসের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার পর আমি দাওয়াতের কাজে মগ্ন হই। আমি দীর্ঘ সময় ধরে টানা ইসলাম প্রচারের কাজ করি। এর মধ্যে একদিন রাসূল না নিজ মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন। আর এরই মাঝে পেরিয়ে গেল বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের মতো ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মৃতিময় ও স্মরণীয় যুদ্ধগুলো। তারপর একদিন আমি দাউস এলাকা থেকে আশিটি পরিবার নিয়ে রাসূল -এর নিকটে আসি। যারা প্রত্যেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং ইসলাম অনুসারে তাদের জীবন গড়েছে। এতে রাসূল অত্যন্ত খুশি হলেন এবং অন্য মুসলমানদের মতো আমাদের জন্যেও খায়বারের গনীমতের অংশ নির্ধারণ করলেন ।

আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদেরকে প্রত্যেক যুদ্ধে আপনার ডান পার্শ্বে রাখুন (অর্থাৎ, বিশেষ বাহিনী হিসেবে রাখুন)। আর আমাদের একটি নির্দিষ্ট প্রতীক নির্ধারণ করুন। তারপর থেকে মক্কা বিজয় হওয়া পর্যন্ত আমি রাসূল-এর সাথেই ছিলাম । আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে জুল কাফ্ফাইনে প্রেরণ করুন যাতেকরে আমি আমর বিন হামামার মূর্তিটি পুড়িয়ে ফেলতে পারি। রাসূল আমাকে এ কাজে অনুমতি প্রদান করলেন ।

যখন হযরত তোফাইল সেখানে পৌঁছলেন এবং তা পুড়িয়ে ফেলার ইচ্ছা করলেন। তখন পুরুষ, মহিলা ও শিশু নির্বিশেষে সেখানে এসে জড় হলো। তারা মনে মনে হযরত তোফাইল -এর ধ্বংস কামনা করতে লাগল। ওই মূর্তি ধ্বংস করতে গেলে হযরত তোফাইলের ওপর কঠিন গজব আছড়ে পড়বে এরূপ কিছু দেখার জন্য তারা অপেক্ষা করতে লাগল ।অন্যদিকে হযরত তোফাইল মূর্তিটির হাজার হাজার পূজকদের সামনেই মূর্তিটির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন। আগুন প্রজ্বলনকালে তিনি ছন্দে ছন্দে আবৃতি করতে লাগলেন ।

বঙ্গানুবাদ-
ياذا الكفين لست من عبادكا م
يلادنا أقدم من ميلاد كا
إني حشوت النار في فؤادكا
হে জুল কাফ্ফাইন
আমরা তোর পূজা করি না ৷
আমাদের জন্ম তোর জন্মের পূর্বে,
তাই এটা করা শোভাও পায় না ।
আমি তোর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছি
পারলে প্রতিশোধ নে না..... ।

আগুন মূর্তিটিকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছে। আর সাথে সাথে জ্বালিয়ে শেষ করে দিয়েছে দাউস গোত্রের শিরক ও সব অপকর্ম। মূর্তির এই করুণ দৃশ্য দেখে দাউসে বসবাসরত সমগ্র জাতি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেল । এই ঘটনার পর থেকে তোফাইল বা রাসূল সাহা-এর সাথে অবস্থান করতে থাকেন। তিনি ওই দিন পর্যন্ত রাসূল সালাম-এর সংস্পর্শে ছিলেন যেদিন রাসূল সালামাহ তাঁর প্রতিপালকের নিকটে চলে গেলেন।

যখন খেলাফতের দায়িত্ব হযরত আবু বকর শীল -এর হাতে আসে, তখন তিনি নিজের জান, মাল ও সন্তানদেরকে খলীফার নির্দেশে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার্থে রিদ্দার যুদ্ধের ডাক আসলে মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে যারা মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে বের হলেন তিনি তাদের অগ্রভাগে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর সাথে তাঁর ছেলে আমরও এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। ইয়ামামার দিকে যুদ্ধযাত্রার পথে এক রাতে তিনি এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখলেন। তিনি তাঁর সাথিদেরকে বললেন: আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি, তোমরা আমাকে এর ব্যাখ্যা করে দাও। তারা বলল: তুমি কি দেখেছ?

তিনি বললেন: আমি দেখেছি আমার মাথা মুণ্ডানো হয়েছে, আর একটি পাখি আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে। এরপর একজন মহিলা আমাকে তার পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলছে এবং আমার ছেলে আমর আমাকে তন্ন তন্ন করে তালাশ করতে লাগল, কিন্তু তার মাঝে আর আমার মাঝে একটি প্রতিবন্ধক করে দেওয়া হলো যা তাকে আমার নিকটে আসতে দিচ্ছে না।

তারা বলল: আল্লাহ আপনার ভালো করুক........ আমি বললাম: জেনে রাখ, আল্লাহর শপথ! আমি এর ব্যাখ্যা করে ফেলেছি । আমার মাথা মুণ্ডানো হয়েছে এর ব্যাখ্যা হচ্ছে আমার মাথা কেটে ফেলা হবে । আর যে পাখি আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে তা হচ্ছে আমার রূহ। আর যে মহিলা আমাকে তার পেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে তা হচ্ছে যমীন। যার পেটে আমাকে দাফন করা হবে । যার কারণে আমি একান্তভাবে আশাবাদী, অবশ্যই আমি শাহাদাত বরণ করব। আর আমার ছেলে আমর আমাকে অন্বেষণ করবে অর্থাৎ সে আমার ন্যায় শাহাদাত বরণ করতে প্রাণবাজি রেখে যুদ্ধ করবে যে শাহাদাত দ্বারা আল্লাহ তাকে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করবে। কিন্তু তা এই যুদ্ধে না; বরং অন্য আরেকটি যুদ্ধে সে লাভ করবে। ইয়ামামার যুদ্ধে জলীলুল কদর সাহাবী হযরত তোফাইল বিন আমর আদ্দাউসী শত্রুদের মারাত্মক আক্রমণের শিকার হলেন। তিনি শত্রুদের পক্ষ থেকে মতো মারাত্মক আঘাত প্রাপ্ত হলেন যে, যুদ্ধের ময়দানেই তিনি শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ।
আর তাঁর ছেলে আমর আসল শত্রুদেরকে তীব্র আক্রমণ করে। অবশেষে শত্রুদের আঘাতে আঘাতে তিনিও দুর্বল হয়ে পড়লেন। শত্রুরা তাঁর ডান হাত কেটে ফেলে। যুদ্ধ শেষে হযরত আমর তাঁর পিতা ও নিজ কর্তিত হাত ইয়ামামার মাটিতে দাফন করে মদিনায় ফিরে আসেন। হযরত উমর বিন খাত্তাব-এর খিলাফত কালে একদিন হযরত আমর বিন তোফাইল তাঁর নিকটে আগমন করেন। তখন উমর-এর জন্যে খাবার নিয়ে আসা হলো, মানুষেরা তাঁর নিকটে বসা ছিল, তিনি সবাইকে খানা খাওয়ার জন্যে আহ্বান করলেন, কিন্তু হযরত আমর ই খাওয়া থেকে বিরত থাকলেন ।

হযরত উমর তাঁকে বললেন: তোমার কি হলো? মনে হয় তোমার ডান হাত না থাকায়, লজ্জায় তুমি খাদ্য গ্রহণ করছ না । হযরত আমর বললেন: জ্বী, আমীরুল মুমিনীন।
হযরত উমর বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি এই খাদ্যের স্বাদ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করব না যতক্ষণ না তুমি তোমার কর্তিত হাত দ্বারা এই খাদ্য ঘেটে দিবে । আল্লাহর শপথ! আমাদের মধ্যে তুমি ব্যতীত কেউ এমন নেই যার কিছু অংশ জান্নাতে চলে গেছে (এই কথা দ্বারা তিনি কর্তিত হাতকে বুঝিয়েছেন) ।

পিতার শাহাদাতের পর হযরত আমর নিজে শাহাদাত বরণ করার স্বপ্নে বিভোর থাকতেন। যখন ইয়ারমুকের যুদ্ধ শুরু হলো তখন অন্যান্য মুজাহিদদের সাথে তিনিও জিহাদে অংশগ্রহণ করলেন। এই যুদ্ধে তিনি কঠিনভাবে শত্রুর বিপক্ষে অবস্থান নেন। অবশেষে তিনি শত্রুর মোকাবিলা করতে করতে সেই কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত লাভ করেন যা তাঁর জন্য তাঁর বাবা কামনা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা হযরত তোফাইল -এর ওপর রহম করুক। তিনি নিজেও শাহাদাত বরণ করেছেন, আর তাঁর পুত্র আমরও শাহাদাত বরণ করেছেন ।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবাহ্ - ২য় খণ্ড, ২৫৫ পৃ.।
২. আল ইসতিআ'ব - ২য় খণ্ড, ২৩০ পৃ।
৩. উদুল গবাহ্ - ৩য় খণ্ড, ৪৫-৫৫ পৃ.।
৪. সিফাতুস্ সয়াহ্ - ১ম খণ্ড, ২৪৫-২৪৬ পৃ.
৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা - ১ম খণ্ড, ২৪৮-২৫০ পৃ.।
৬. মুখতাসারু তারিখি দিমাস্ক - ৭ম খণ্ড, ৫৯-৬৪ পৃ.
৭. আল বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া - ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৩৭ পৃ.
৮. শুহাদাউল ইসলাম - ১৩৮-১৪৩ পৃ.।
৯. সিরাতু বাতল লি মুহাম্মদ যায়দান (দারুস সাউদিয়া) ১৩৮৬ হিঃ।

 হযরত সাঈদ বিন আমের আল জুমাহী (রা) এর জীবনী

“সাঈদ বিন আমের আল জুমাহী এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাত ক্রয় করে নিয়েছেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন”
[ঐতিহাসিকদের মন্তব্য]
হযরত সাঈদ বিন আমের আল জুমাহী তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যাঁরা কোরাইশ নেতাদের আহ্বানে ‘তানঈম' এলাকার দিকে বের হয়ে পড়েছে। যাতেকরে তারা খুবাইব বিন আদী -এর হত্যার দৃশ্য উপভোগ করতে পারে। যাঁকে তারা বিশ্বাসঘাতকতার পথ অবলম্বন করে বন্দি করেছিল ।
হযরত সাঈদ মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে তাঁর পূর্ণ যৌবন ও প্রস্ফুটিত তারুণ্য কাটিয়েছিলেন। এমনকি তিনি কোরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ান, সফওয়ান বিন উমাইয়া ও অন্যান্য নেতাদের সমকক্ষ হয়ে গেলেন, যারা নেতৃত্বের শীর্ষে অবস্থান করত ।
আর এ কারণেই হযরত সাঈদের কোরাইশী বন্দিকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসার দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়ে উঠল। তখন সকল মহিলা, শিশু ও যুবক ওই বন্দির মৃত্যুর দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় ছিল। যাতেকরে এই হত্যার দ্বারা তারা মুহাম্মদ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারে এবং বদর যুদ্ধে তাদের নিহত নেতাদের বদলা গ্রহণ করতে পারে।

যখন মানুষের এই বিশাল দল একত্রিত হয়ে বন্দি হযরত খুবাইবকে হত্যা করার জন্যে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে তখন হযরত সাঈদ বিন আমের আল জুমাহী সেখানে পা লম্বা করে ও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে হযরত খুবাইব -এর হত্যার স্থানে অবস্থান নিলেন। ঠিক সেই সময়ে হযরত খুবাইব মা-কে কাঠের শূলিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এমন সময় তিনি মহিলা ও শিশুদের প্রচণ্ড শোরগোলের মাঝে প্রশান্ত ও দীপ্ত কণ্ঠের একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন।
আর সেই আওয়াজটি ছিল হযরত খুবাইব -এর পবিত্র মুখ থেকে বেরকৃত
আওয়াজ ।

তিনি বললেন: “তোমাদের যদি ইচ্ছে হয় হত্যা করার আগে আমাকে দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ দিবে, তাহলে দাও।”
হযরত সাঈদ বিন আমের তাঁর দিকে লক্ষ্য করলেন, তিনি দেখলেন হযরত খুবাইব কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ সম্পূর্ণ করেন । আহা! কতই না সুন্দর ছিল ওই নামাজ আর কতই না পরিপূর্ণ ছিল।
এরপর হযরত সাঈদ তাঁকে দেখলেন তিনি মক্কার নেতাদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন- “আল্লাহর শপথ করে বলি, যদি তোমরা এই ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি তাহলে আমি আরো দীর্ঘ করে নামাজ আদায় করতাম।”
তারপর সাঈদ নিজ চোখে দেখলেন কিভাবে তার জাতি হযরত খুবাইবকে জীবিত অবস্থায় একের পর এক অঙ্গ কেটে কেটে বিচ্ছিন্ন করছিল। তারা তাঁর অঙ্গ- প্রত্যঙ্গগুলো একের পর এক কাটছিল আর বলছিল-
“তুমি কি এটি পছন্দ কর তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদকে হত্যা করা হবে আর তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে।”
হযরত খুবাইবের শরীর থেকে তখন রক্ত অনবরত ঝরছিল সেই কঠিন মুহূর্তে তিনি বললেন:
“আল্লাহর শপথ করে বলি, আমি নিরাপদে আমার পরিবার ও সন্তানদের কাছে ফিরে যাব আর মুহাম্মদ -কে একটি কাঁটা বিধতে হবে তাও আমি পছন্দ করি না.......

মানুষ তখন তাঁর দিকে ইঙ্গিত করে জোরে জোরে বলতে লাগল:
তাকে হত্যা কর.........
তাকে হত্যা কর..........

তারপর সাঈদ বিন আমের দেখলেন, শূলিবিদ্ধ খুবাইব চক্ষু আকাশের দিকে তুলে
বলতে লাগলেন:
“হে আল্লাহ! তুমি এদের সংখ্যা গুণে রাখ এবং এদেরকে হত্যা করে ধ্বংস করে দাও আর এদের কাউকে তুমি ছেড়ে দিও না ।”
এরপর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁকে মতো বেশি তরবারি ও বর্শা দ্বারা আঘাত করা হয় যা কেউ গণনা করতে সক্ষম হয়নি।

তারপর কোরাইশরা মক্কায় ফিরে আসে। এরপর জীবনযাত্রার বিভিন্ন ঘটনা ও দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা খুবাইবকে ভুলে গেল এবং ভুলে গেল তাঁকে হত্যা করার সেই বিস্ময়কর দৃশ্যকে, কিন্তু টগবগে যুবক হযরত সাঈদ বিন আমের তা ভুলতে পারেননি। কোনো এক মুহূর্তের জন্যেও খুবাইবের সেই ঘটনা তাঁর চোখ থেকে অদৃশ্য হয়নি।
তিনি ঘুমের মাঝে তা স্বপ্নে দেখতেন এমনকি জাগ্রত অবস্থায়ও ওই দৃশ্যগুলো তাঁর সামনে ভাসতো। হযরত খুবাইবের কাঠের শূলির সামনে নির্বিঘ্নে দুই রাকাত নামাজ আদায় করার সেই দৃশ্য বার বার তাঁর সামনে ভেসে উঠত। হযরত খুবাইবের কুরাইশদের বিরুদ্ধে যে বদদোয়া করেছেন সেই প্রতিধ্বনিগুলো তাঁর কানে বার বার বেজে উঠত। আর এই কারণে তিনি সর্বদা ভয়ে থাকতেন না জানি আকাশ থেকে কোনো বজ্র এসে তাঁর ওপর পতিত হয়। আবার না জানি আল্লাহর কোনো গজব এসে তাঁকে ধ্বংস করে দেয়। তথাপি হযরত খুবাইব, সাঈদ বিন আমেরকে এমন কিছু বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা তিনি আগে জানতেন না ।

তিনি তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন- সত্যিকারের জীবন হচ্ছে ধার্মিকতার জীবন ও মৃত্যু পর্যন্ত ওই ধার্মিকতার পথে জিহাদ করার জীবন । তিনি তাঁকে আরো শিক্ষা দিয়েছেন- সুদৃঢ় ঈমান আশ্চর্যজনক কাজ করে এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে। তিনি তাঁকে আরেকটি বিষয় বললেন: যে লোকটিকে সাহাবিগণ ভালোবাসেন তিনি আসমান থেকে প্রেরিত নবী ।

এই সকল বিষয় দ্বারা আল্লাহ তাআলা হযরত সাঈদ বিন আমের রাশিমালার-এর বক্ষকে ইসলামের জন্যে প্রশস্ত করে দিলেন। তিনি এক জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন- তিনি কুরাইশদের এই সকল পাপ থেকে আজ থেকে মুক্ত, সকল মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত এবং তিনি আজ থেকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশ করেছেন। এরপর হযরত সাঈদ বিন আমের মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় এসে তিনি রাসূল -এর সাহচর্যে থাকতে শুরু করেন। খায়বারসহ পরবর্তী সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সালামাই-এর সাথে অংশগ্রহণ করেছেন । যখন নবী করীম তাঁর প্রতিপালকের নিকটে চলে গেছেন তখন তিনি খলিফা হযরত আবু বকর ও হযরত উমর -এর খিলাফতের সময়ে নাঙ্গা তলোয়ারের মতো ইসলামের পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি ওই সকল মুমিনদের মতো ভিন্নভাবে জীবন কাটিয়েছিলেন যাঁরা দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাত ক্রয় করেছিলেন এবং মনের সকল চাহিদা ও শরীরের সকল কামনা-বাসনাকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহ ও আল্লাহর প্রতিদানকে পছন্দ করেছিলেন।
রাসূল -এর খলীফা আবু বকর উমা ও হযরত উমর তাঁর তাকওয়া ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে জানতেন এমনকি তাঁরা তাঁর উপদেশ শুনতেন এবং বিশেষ গুরুত্বের সাথে তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন । হযরত উমর -এর খেলাফতের শুরুতে তার নিকটে প্রবেশ করে বললেন:
“হে উমর! আমি তোমাকে মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। আর আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে তুমি মানুষকে ভয় করবে না। তুমি তোমার কথার সাথে কাজের অমিল করবে না, কেননা উত্তম কথা হচ্ছে- যে কথা বাস্তবায়ন করা হয় ।
“হে উমর! তুমি তোমার চেহারা, কাছের ও দূরের ওই সকল মুসলমানদের দিকে ফিরাও যাদের জন্যে আল্লাহ তোমাকে নিয়োজিত করেছেন। তুমি নিজের জন্যে ও নিজের পরিবারের জন্যে যা পছন্দ কর তা তাদের জন্যেও পছন্দ করবে আর যা অপছন্দ করবে তা তাদের জন্যেও অপছন্দ করবে। সত্যের পথে অবিচল থাকতে সকল প্রকার কষ্টকে স্বাচ্ছন্দ্যে বরণ করে নিবে। আর আল্লাহর হুকুম বাস্ত বায়নে কারো নিন্দার ভয় করবে না।”

হযরত উমর বললেন: হে সাঈদ! কে আছে এমন যে এর ওপর আমল করতে সক্ষম হবে? হযরত সাঈদ বললেন: তোমার মতো লোক এর ওপর আমল করতে সক্ষম হবে যাকে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ পানাহার-এর উম্মতের অভিভাবক বানিয়েছেন, কেননা তোমার ও আল্লাহর মাঝে আর কেউ নেই । তখন হযরত উমর হযরত সাঈদ-কে তার সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান করলেন।

তিনি বললেন: হে সাঈদ! আমি আপনাকে হেমস্বাসীদের আমীর হিসেবে নিয়োগ দিলাম ।
হযরত সাঈদ শুনিয়া বললেন: হে উমর! আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি আমাকে পরীক্ষায় ফেলবে না।
তার এই কথায় হযরত উমর খুব রাগান্বিত হয়ে বললেন : কি আশ্চর্য...........! তোমরা আমার ঘাড়ে খেলাফতের দায়িত্ব দিয়ে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছ! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে ছেড়ে দিব না। এরপর তিনি তাঁকে হেমস্ শহরের গভর্নর হিসেবে নিয়োজিত করলেন। হযরত উমর বললেন: আমি কি আপনার জন্য বেতন-ভাতা নির্ধারিত করে
দিব না?হযরত সাঈদ বিন আমের সাহাবীদের জীবন চিত্র বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন! বেতন ভাতা দিয়ে আমি কি করব? কেননা বায়তুলমালের বেতন-ভাতা আমার প্রয়োজনের থেকেও বেশি। তারপর তিনি হেমসে চলে গেলেন ।

কিছুদিন পার না হতেই আমীরুল মুমিনীনের বিশ্বস্ত হেমসের কিছু লোক তাঁর নিকটে আগমন করে । হযরত উমর তাদেরকে বললেন: তোমরা তোমাদের গরিব লোকদের নামের তালিকা দাও যাতেকরে আমি তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে দিতে পারি । তারা তাঁর হাতে গরিব লোকদের একটি তালিকা দিল, সেখানে অনেক ব্যক্তির নাম ছিল তার মধ্যে হযরত সাঈদ বিন আমেরের নামও ছিল ।

হযরত উমর বললেন: সাঈদ বিন আমের কে? তারা বলল: আমাদের গভর্নর । হযরত উমর বা আশ্চর্য হয়ে বললেন: তোমাদের গভর্নর গরিব! তারা বলল: হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এমন অনেক দিন অতিবাহিত হয় তাঁর চুলায় আগুন জ্বলে না। এ কথা শুনার পর হযরত উমর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তিনি এতো বেশি কাঁদলেন যে, তাঁর দাড়ি মোবারক চোখের পানিতে ভিজে গেল। তিনি তাঁর নিকটে এক হাজার দিনার পাঠানোর ইচ্ছা করেন। ওই দিনারগুলো একটি থলেতে দিয়ে বললেন: তোমরা তাঁকে আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবে আর বলবে: আপনার প্রয়োজন মিটানোর জন্যে এগুলো আমীরুল মুমিনীন আপনাকে দিয়েছেন । হযরত ওমরের পাঠানো প্রতিনিধি দল দিনারের থলে নিয়ে তাঁর নিকটে আগমন করল। হযরত সাঈদ এর দিনারের থলেটি দেখার সাথে সাথে ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন বলে তা দূরে নিক্ষেপ করলেন। মনে হয় যেন তাঁর ওপর বিশাল কোনো মসিবত নেমে এসেছে অথবা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তাঁর স্ত্রী আতঙ্কিত হয়ে বললেন: হে সাঈদ! আপনার কি হয়েছে?....... নাকি আমীরুল মুমিনীন ইন্তেকাল করেছেন?
তিনি বললেন: ; বরং এর থেকেও ভয়ানক ।

তাঁর স্ত্রী বললেন: মুসলমানরা কি কোথাও আক্রান্ত হয়েছে? তিনি বললেন: ; বরং এর থেকেও ভয়ানক ।
তাঁর স্ত্রী বললেন: এর থেকে ভয়ানক কি ঘটেছে?

তিনি বললেন: আমার আখেরাত নষ্ট করার জন্যে দুনিয়া আমার নিকটে চলে এসেছে। ফিতনা আমার ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাঁর স্ত্রী বললেন: আপনি তা থেকে মুক্ত হোন ।
অথচ তাঁর স্ত্রী তখনো দিনার সম্পর্কে কিছুই জানেননি । তিনি বললেন: তুমি কি আমাকে এতে সাহায্য করবে? তাঁর স্ত্রী বললেন: হ্যাঁ । এরপর তিনি থলেটি নিয়ে গরিব মুসলমানদের মাঝে সবগুলো দিনার বিলিয়ে দিলেন। নিজের জন্যে একটি দিনারও রাখলেন না ।

এরপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হেমসের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতে হযরত উমর একদিন সিরিয়া যাওয়ার পথে হেমস্ শহরে যাত্রাবিরতি করেন। এই শহরকে ‘কুহাইফা’' বা ছোট কুফা নামেও ডাকা হতো । এটি কুফা শব্দের তাসগীর এবং হেমসের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল । কেননা এই শহরের অধিবাসীরা তাদের গভর্নর ও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপারে অধিক অভিযোগ করত যেমনিভাবে কুফাবাসীরা করত ।
হযরত উমর বা শহরে পা রাখার পর শহরের অধিবাসীরা তাঁকে সালাম ও স্বাগতম জানাতে ছুটে আসল ৷

তিনি তাদেরকে বললেন: তোমাদের গভর্নর কেমন ? তারা হযরত সাঈদের ব্যাপারে তাঁর নিকটে চারটি অভিযোগ করে। এইগুলো একটি অন্যটির চেয়েও মারাত্মক ছিল। হযরত উমর বলেন : এরপর আমি সাঈদকে ও শহরের অধিবাসীদেরকে একত্রিত করলাম। আর আল্লাহর নিকটে দোয়া করলাম আল্লাহ যেন সাঈদের ব্যাপারে আমার সু- ধারণাকে নষ্ট না করে দেয়। কেননা তাঁর ব্যাপারে আমি অনেক ভালো ধারণা করতাম। যখন তাদের গভর্নর ও তারা আমার নিকটে একত্রিত হলো তখন আমি তাদেরকে বললামঃ তোমাদের গভর্নরের ব্যাপারে তোমাদের কি কি অভিযোগ ? তারা বলল: সূর্য পূর্বাকাশ ছেড়ে উপরে না উঠা পর্যন্ত তিনি আমাদের নিকটে আসেন না। অর্থাৎ প্রত্যহ দেরি করে দরবারে উপস্থিত হন।
আমি বললাম: হে সাঈদ! এই অভিযোগের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি?

হযরত সাঈদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি এ কথা বলতে অপছন্দ করি, কিন্তু আমি এখন বলতে বাধ্য, তা হচ্ছে আমার কোনো খাদেম নেই আর এই কারণেই আমি সকালে আমার পরিবারের জন্যে গম পিসে ময়দা বানিয়ে দিই। তারপর তা সিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এরপর তা দ্বারা আমার পরিবারের জন্য রুটি বানাই। রুটি বানানো শেষ করে আমি অযু করি এবং মানুষের নিকটে বের হয়ে আসি। হযরত উমর বললেন: তারপর আমি তাদেরকে বললাম: তার ব্যাপারে তোমাদের আর কি অভিযোগ আছে? তারা বলল: তিনি রাতে কারো ডাকে সাড়া দেন না । আমি বললাম: হে সাঈদ! এই অভিযোগের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? হযরত সাঈদ বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি এই বিষয়টি প্রকাশ করা অপছন্দ করছি......... আর তা হচ্ছে আমি দিনে জনকল্যাণকর কাজের জন্যে নির্ধারণ করেছি আর রাত আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার জন্যে নির্ধারণ করেছি।

আমি বললাম: তার ব্যাপারে তোমাদের আর কি অভিযোগ আছে? তারা বলল: তিনি মাসে এক দিন আমাদের নিকটে আসেন না । আমি বললাম: হে সাঈদ! এই অভিযোগের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? হযরত সাঈদ বললেন: আমার কোনো খাদেম নেই আর আমার পরিহিত এ জামা ব্যতীত আর কোনো জামাও নেই। এই কারণে আমি মাসে একবার জামাটি ধৌত করি। এরপর জামাটি শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। দিনের শেষে জামাটি শুকানোর পর আমি তাদের নিকটে আসি। আমি বললাম: তার ব্যাপারে তোমাদের আর কি অভিযোগ আছে? তারা বলল: অনেক সময় তিনি সভায় থেকেও অন্যমনস্ক হয়ে যান ।
আমি বললাম: হে সাঈদ! তুমি এমন কর কেন? হযরত সাঈদ মনিরা বললেন: আমি খুবাইব বিন আদীকে হত্যা করার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি মুশরিক ছিলাম। আমি কোরাইশদেরকে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে টুকরো টুকরো করতে দেখেছি। তখন তারা তাকে বলল: তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদকে হত্যা করা হবে আর তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে, তুমি কি তা পছন্দ কর।

হযরত খুবাইব তখন বললেন: আল্লাহর শপথ করে বলি, আমি নিরাপদে আমার পরিবার ও সন্তানদের কাছে ফিরে যাব আর মুহাম্মদ -কে একটি কাঁটার আঘাত সইতে হবে তাও আমি পছন্দ করি না । আল্লাহর শপথ! যখনি আমার এই ঘটনা মনে পড়ে আমি কেন তাঁকে সাহায্য করলাম না তখনি আমার মনে হয় আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না, আর এই চিন্তা আমাকে অন্যমনস্ক করে ফেলে। হযরত সাঈদ বিন আমের রস থেকে অভিযোগের এই জবাবগুলো শুনে হযরত উমর কাজ বললেন: সকল প্রশংসা ওই আল্লাহ তাআলার যিনি সাঈদের ব্যাপারে আমার ধারণাকে সঠিক করেছেন। তারপর হযরত উমর গুল তাঁর জন্যে এক হাজার দিনার পাঠালেন যাতেকরে তিনি তাঁর প্রয়োজন মিটাতে পারেন । যখন তাঁর স্ত্রী তা দেখলেন তিনি বললেন: সকল প্রশংসা ওই আল্লাহর জন্যে যিনি এই দিনারগুলো দ্বারা আমাদেরকে আপনার পরিশ্রম করা উপার্জন খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্যে এর দ্বারা খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করুন এবং একজন খাদেম নিয়োজিত করুন। হযরত সাঈদ তাঁর স্ত্রীকে বললেন: তোমার জন্যে এমন কিছু নেই যা এর থেকে উত্তম হবে?!!! তিনি বললেন: তা কি? হযরত সাঈদ বিমা বললেন: যিনি এই সম্পদ আমাদেরকে দান করেছেন আমরা তাঁর কাছে তা ফেরত দিব, কেননা তাঁর নিকটে যা আছে এর জন্যে আমরা আরো বেশি মুখাপেক্ষী ।

তিনি বললেন: তা কি?
হযরত সাঈদ মুনি বললেন: আমরা উত্তম প্রতিদানের জন্যে আল্লাহর নিকটে তা গচ্ছিত রাখব ।
তিনি বললেন: হ্যাঁ, তাই করুন এবং আপনি উত্তম প্রতিদান প্রাপ্ত হউন।
তিনি বসার থেকে উঠার আগেই তা কয়েক ভাগে ভাগ করে তাঁর পরিবারের একজনকে বললেন: তুমি এগুলো নিয়ে অমুক বিধবাকে দিয়ে আস এবং এগুলো নিয়ে অমুক ব্যক্তির ইয়াতিম সন্তানদেরকে দিয়ে আস এবং এগুলো নিয়ে অমুক মিসকিনকে দিয়ে আস এবং এগুলো নিয়ে অমুক গরিবকে দিয়ে আস।

আল্লাহ হযরত সাঈদ বিন আমের আল জুহানীর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি ছিলেন ওই লোকদের কাতারে যাঁরা দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাত ক্রয় করেছে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে জীবনের সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন ।

তথ্য সূত্র
১.তাহযীবুত্‌ তাহযীব - ৪র্থ খণ্ড, ৫১ পৃ. ।
২. ইবনু আসাকির - ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৪৫-১৪৭ পৃ.
৩. সিফাতুস্ সফওয়া - ১ম খন্ড, ২৭৩ পৃ.
৪. হুলিয়াতুল আওলীয়া - ১ম খন্ড, ২৪৪ পৃ.
৫. তারীখুল ইসলাম - ২য় খণ্ড, ৩৫ পৃ.।
৬. আল ইসাবাহ্ - ৩য় খণ্ড, ৩২৬ পৃ.।
৭. নসবু কোরাইশ – ৩৯৯ পৃ. ৷

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.