03/03/23

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

 হযরত সুমামা বিন উসাল (রাঃ) এর জীবনী

“যিনি কোরাইশদেরকে অর্থনৈতিক অবরোধ করেছেন” রাসূল ষষ্ঠ হিজরীতে আল্লাহর দ্বীনকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেন। তাই তিনি আরব ও আজমের সম্রাটদের নিকটে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আটটি পত্র প্রেরণ করেন। যাদের নিকটে পত্র পাঠানো হয় তাদের মধ্যে হযরত সুমামা বিন উসাল অন্যতম ছিলেন। তিনি আরব বিশ্বের রাজা-বাদশাহদের একজন ছিলেন। তিনি হানীফা গোত্রের নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যে গোত্রটি আরবের উল্লেখযোগ্য গোত্রের একটি ছিল। তিনি ইয়ামামার রাজা ছিলেন। তাঁর রাজত্বে তাঁর অনেক জনপ্রিয়তা ছিল। এমনকি তাঁর জাতি কখনো তাঁর কথার অবাধ্য হতো না।

সুমামা প্রথমে রাসূল এর পত্র পেয়ে অবাধ্যতা প্রকাশ করেন। তাঁর মাঝে পাপের কারণে ঔদ্ধত্য বাড়তে থাকে। তিনি রাসূল এর সত্য ও কল্যাণের পথের আহ্বান শুনা থেকে নিজের কানকে বন্ধ করে রাখেন । এরপর তাঁর ওপর শয়তানী বুদ্ধি প্রবল হয়। রাসূল আলাধার-কে হত্যা করার জন্যে ও ইসলামের দাওয়াতকে কবর দেওয়ার জন্যে তাঁকে শয়তান প্ররোচিত করতে লাগল। তাই তিনি এর সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। এক দিন সেই সুযোগ চলে আসে। শেষ মুহূর্তে যদি তাঁর চাচা তাঁর সংকল্পিত কাজ থেকে তাঁকে বাঁধা না দিতেন তাহলে তিনি রাসূল -কে হত্যা করে ফেলতেন, কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছা তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর দ্বীন বিজয় হওয়া পর্যন্ত বাকি রাখবেন তাই হযরত সুমামা রাসূল -এর কোনো ক্ষতি করতে পারেননি। আর তাই দেখা যায় রাসূল -এর জীবনে কত ঝড় এসেছিল সব ঝড় থেকে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে হেফাজত করে ইসলামকে বিশ্বের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ।

কিন্তু সুমামা রাদিন হায় তখন রাসূল আলাই-এর কোনোপ্রকার ক্ষতি করতে না পেরে সাহাবীদের ওপর অত্যাচার করে সেই প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা করেন। তিনি এর জন্যে সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। আর তাঁর জন্যে সেই সুযোগ এসেও যায়। তিনি কিছুসংখ্যক সাহাবীকে বন্দি করে তাদের ওপর ভীষণ অত্যাচার করেন এবং তাদেরকে হিংস্রভাবে হত্যা করেন। তাঁর এমন হিংস্র আচরণে রাসূল তাঁর রক্ত মুসলমানদের জন্য বৈধ করে দিলেন এবং তাঁকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন।

এরপর কিছু দিন অতিবাহিত না হতেই হযরত সুমামা মক্কায় গিয়ে উমরা করার ইচ্ছা করেন। তাই তিনি ইয়ামামা ত্যাগ করে মক্কার পথে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি সেখানে গিয়ে কা'বা ঘর তাওয়াফ ও মূর্তিদের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার মান্নত করেন। হযরত সুমামা বিন উসাল মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনার নিকটবর্তী এক পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ওপর বিপদ চলে আসবে এমন কিছু তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। কারো দ্বারা মদিনায় আক্রমণ হবে অথবা কোনো দূর্ঘটনা ঘটবে এই ভয়ে, রাসূল -এর সাহাবীদের মধ্য থেকে একদল যোদ্ধা মদিনার সীমান্তে পাহারা দিচ্ছিলেন। তাঁর অজান্তে সেই সকল সাহাবিগণ তাঁকে ঘিরে ফেললেন এবং তাঁকে বন্দি করে মদিনায় নিয়ে আসলেন। তাঁরা তাঁকে মসজিদের এক খুঁটির সাথে বেঁধে রাখলেন। রাসূল এসে বন্দির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিবেন এবং তাঁর বিচার করবেন সাহাবিগণ এই অপেক্ষায় ছিলেন।

নবী করীম ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে আসার পথে সুমামাকে বন্দি অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা কি জান তোমরা কাকে ধরে এনেছ? তারা বললেন: না, হে আল্লাহর রাসূল । নবী করীম বললেন: সে হচ্ছে সুমামা বিন উসাল আল হানাফী । সুতরাং তোমরা তোমাদের বন্দির সাথে সুন্দর আচরণ কর । সেখান থেকে রাসূল তাঁর পরিবারের নিকটে ফিরে এসে বললেন : তোমাদের নিকটে যেসব খাদ্য আছে তা একত্রিত করে সুমামার নিকটে প্রেরণ কর।

তিনি রাখালকে সকাল-সন্ধ্যা উটের দুধ দোহন করে সুমামাকে দিতে নির্দেশ দিলেন । রাসূল
তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বেই এই সকল কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন। এরপর রাসূল সুমামাকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্যে তাঁর দিকে অভিমুখী হলেন। তিনি তাঁকে বললেন: হে সুমামা! তোমার ভাবনা কি ?

সুমামা বললেন: মুহাম্মদ! আমার ভাবনা ভালোই....... । যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তাহলে অপরাধী হিসেবে করতে পারেন। আর যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেন আমি আপনার কৃতজ্ঞ হব। আর যদি আপনি আমার বিনিময়ে মাল চান তাহলে আপনি যা চাইবেন তাই দিব । রাসূল প্রথম দিন তাঁকে এই অবস্থায় রেখে গেলেন। তিনি তাঁকে প্রতিদিন মানসম্মত খাদ্য ও পানীয় খেতে দিতেন এবং তাঁকে উটের দুধ পান করাতেন ৷ এরপর দ্বিতীয় দিন তিনি তাঁর নিকটে এসে আবার বললেন: হে সুমামা! তোমার ভাবনা কি? হযরত সুমামা বললেন: আমার ভাবনা ভালোই । যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তাহলে অপরাধী হিসেবে করতে পারেন। আর যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেন আমি আপনার কৃতজ্ঞ হব। আর যদি আপনি আমার বিনিময়ে মাল চান তাহলে আপনি যা চাইবেন তাই দিব ।

দ্বিতীয় দিনও তাঁকে এই অবস্থায় রেখে গেলেন ৷ তারপরের দিন এসে বললেন: হে সুমামা তোমার ভাবনা কি? সুমামা বললেন: আপনাকে পূর্বে যা বলছি তা ব্যতীত আমার অন্য কোনো ভাবনা নেই.............। যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তাহলে অপরাধী হিসেবে করতে পারেন। আর যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেন আমি আপনার কৃতজ্ঞ হব। আর যদি আপনি আমার বিনিময়ে মাল চান তাহলে আপনি যা চাইবেন তাই দিব । রাসূল সালাম তাঁর সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন: তোমরা সুমামাকে মুক্ত করে দাও। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সদাহার-এর কথামত তাঁকে ছেড়ে দিলেন । হযরত সুমামা মুক্তি পওয়ার পর মদিনার এক প্রান্তে বাকী নামক এক খেজুরের বাগানে তাঁর উটকে বাঁধলেন। সেখানে প্রচুর পানি ছিল। তিনি সেখানে গোসল করে পবিত্র হয়ে পুনরায় মসজিদে নববীতে ফিরে আসলেন।

মসজিদে নববীর নিকটে ফিরে এসে তিনি সকল মুসলমানের সামনে ঘোষণা দিলেন- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আলাহায় আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। এরপর তিনি রাসূল -কে উদ্দেশ্য করে বললেন: হে মুহাম্মদ! আল্লাহর শপথ! আপনার চেহারা ছিল আমার নিকটে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট চেহারা........ কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার নিকটে সবচেয়ে প্রিয় চেহারা । আল্লাহর শপথ! আপনার ধর্ম ছিল আমার নিকটে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধর্ম.. কিন্তু এখন আপনার ধর্মই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ধর্ম। আল্লাহর শপথ! আপনার শহর ছিল আমার নিকটে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শহর............. কিন্তু এখন আপনার শহরই আমার নিকটে সবচেয়ে প্রিয় শহর।

তারপর তিনি বললেন: আমি আপনার কিছু সাহাবীকে হত্যা করেছি। এর ক্ষতিপূরণে আমার ওপর কি করা আবশ্যক? রাসূল বললেন: সুমামা! তোমার পূর্বের কাজের জন্যে তোমার ওপর কোনো অভিযোগ নেই । কেননা ইসলাম পূর্ববর্তী সব গুনাহ মুছে দেয়। এরপর ইসলাম গ্রহণ করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যে সকল নেয়ামত লিখে রেখেছেন, রাসূল তাঁকে সেই সকল সুসংবাদও দিলেন। হযরত সুমামা আনন্দিত হয়ে বললেন: আমি অবশ্যই মুশরিকদেরকে হত্যা করব যেমনিভাবে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুসলমানদেরকে হত্যা করেছি। আর আমি আমাকে, আমার তরবারি ও সঙ্গীদেরকে আপনার ও আপনার দ্বীনের সাহায্যে নিয়োজিত করব।

তারপর তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাহাবিগণ আমাকে ধরে আনার পূর্বে আমি উমরা করার নিয়ত করেছি, আমি কি তা করব? রাসূল বললেন: তুমি তোমার উমরা আদায় কর ।রাসূল তাঁকে উমরার পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন। হযরত সুমামা অবশেষে মক্কার দিকে রওয়ানা দিলেন। মক্কার নিম্ন ভূমিতে পৌঁছে তিনি উচ্চ আওয়াজে তালবিয়া পাঠ করতে লাগলেন-
লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক
লাব্বায়েক লা শারীকা লাকা লাব্বায়েক
ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক্‌ লা শারীকা লাক্

পৃথিবীর বুকে তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি মক্কা নগরীতে তালবিয়া পাঠ করতে করতে প্রবেশ করেছেন । কোরাইশ লোকেরা তাঁর তালবিয়ার আওয়াজ শুনতে পেয়ে খুব ক্ষিপ্ত হলো। তারা তাদের খাপ থেকে তরবারি বের করে তালবিয়ার আওয়াজ অনুসরণ করে ছুটে আসে। কোরাইশদেরকে আসতে দেখে তিনি আরো জোরে তালবিয়া পাঠ করতে লাগলেন। মানের অহংকার ও গর্বভরা দৃষ্টিতে তিনি তাদের দিকে তাকালেন । তাদের মধ্যে এক যুবক তার দিকে তীর নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তারা তাকে বারণ করে বলে- তোমার ধ্বংস হোক, তুমি জানো এই ব্যক্তি কে?

এই ব্যক্তি হচ্ছে ইয়ামামার সম্রাট সুমামা বিন উসাল । আল্লাহর শপথ! তোমরা যদি তাঁর কোনো প্রকার ক্ষতি কর তাহলে সে আমাদেরকে খাদ্য যোগান বন্ধ করে দিয়ে অনাহারে মারবে। তারা তাদের তরবারি খাপে ঢুকিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে এল । তারা বলল: হে সুমামা! তোমার কি হয়েছে? তুমি কি তোমার ও তোমার বাপ-দাদাদের ধর্ম ত্যাগ করেছ? তিনি বললেন: আমি ধর্ম ত্যাগ করিনি; বরং আমি উত্তম ধর্মের অনুসরণ করেছি... ..... এবং মুহাম্মদের ওপর ঈমান এনেছি । এরপর তিনি বললেন: আমি এই ঘরের প্রতিপালকের শপথ করে বলছি: আমি দেশে ফিরে যাওয়ার পর তোমাদের নিকটে সেখান থেকে একটি শস্যও আসবে না যতক্ষণ না তোমরা প্রত্যেকে মুহাম্মদের দ্বীনের অনুসরণ কর।


হযরত সুমামা বিন উসাল কোরাইশদের চোখের সামনে রাসূল -এর শিখানো পদ্ধতিতে উমরা আদায় করেন। তিনি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্য পশু জবাই করেছেন। জাহিলী যামানার কোনো প্রকার রীতিনীতি তিনি অনুসরণ করেননি। কোনো মূর্তির নিকটে প্রার্থনা করেননি। মূর্তির সন্তুষ্টির জন্য পশু জবাই করেননি। এরপর তিনি মক্কা থেকে ইয়ামামায় ফিরে গেলেন। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি তাঁর গোত্রের লোকদেরকে মক্কায় কোনোপ্রকার খাদ্যশস্য প্রেরণ না করতে নির্দেশ করে দিলেন। তারা তাঁর আদেশমতো মক্কায় কোনোপ্রকার খাদ্য প্রেরণ করা বন্ধ করে দেয়।

ওই দিকে খাদ্যশস্য না পাওয়ার কারণে মক্কায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। হযরত সুমামা বিন উসালের খাদ্য অবরোধ তীব্র থেকে তীব্র হতে লাগল। তারা ক্ষুধার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে গেল। এমনকি তারা তাদের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে কিনা সেই শঙ্কায় পড়ে গেল। এভাবে চলতে থাকলে তারা ও তাদের সন্তান সবাই নিঃশেষ হয়ে যাবে এই ভয়ে তারা রাসূল -এর নিকটে চিঠি লিখে ।

চিঠির ভাষা ছিল এমন- আপনার সাথে আমাদের চুক্তি ছিল আপনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করবেন এবং এ ব্যাপারে উৎসাহিত করবেন । কিন্তু এখন আপনি আমাদের সাথে সেই সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। আপনি আমাদের বাপ-দাদাকে তরবারি দ্বারা হত্যা করেছেন আর এখন আমাদের সন্তানদেরকে অনাহারে রেখে মেরে ফেলছেন। সুমামা বিন উসাল আমাদেরকে খাদ্যশস্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে আমাদের মারত্মক ক্ষতি করছে। সুতরাং আপনি যদি ইচ্ছা করেন আমাদের যা প্রয়োজন তা পাঠানোর জন্য সুমামাকে নির্দেশ দিবেন তাহলে দিন । এই চিঠি পেয়ে রাসূল হযরত সুমামাকে খাদ্যশস্য পুনরায় প্রেরণ করার নির্দেশ দিলেন। রাসূল -এর চিঠি পেয়ে হযরত সুমামা পুনরায় তাদের জন্যে খাদ্যশস্য প্রেরণ করা শুরু করেন।

হযরত সুমামা বিন উসাল পরবর্তী জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়ে গেছেন এবং রাসূল -এর সাথে করা ওয়াদা রক্ষা করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। রাসূল -এর ইন্তেকালের পর আরবের লোকেরা একত্রে মুরতাদ হতে শুরু করে এবং তাঁর গোত্রে মুসায়লামাতুল কাজ্জাব নামক ব্যক্তি মিথ্যা নবী দাবি করে। সে তার প্রতি ঈমান আনতে মানুষকে আহ্বান করে, কিন্তু হযরত সুমামা নিজ ঈমানের প্রতি পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন । তিনি তাঁর গোত্রের লোকদেরকে বললেন: হে আমার গোত্রের লোকেরা! তোমরা এই জালিম মিথ্যাবাদী থেকে দূরে থাক ।

আল্লাহর শপথ! তোমাদের মধ্যে যারা এই মিথ্যাবাদীর আনুগত্য করবে সে হতভাগা হবে। আর যারা নিজ ঈমানের ওপর অটল থাকবে তাদের ওপর অনেক বড় পরীক্ষা আসবে। তারপর তিনি বললেন: হে আমার জাতি তোমরা শুন একই সময়ে দুই জন নবী আসেন না।
তাছাড়া মুহাম্মদ শেষ নবী, তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না এবং তাঁর কাজেও কোনো নবী শরিক হবে না। তারপর তিনি তাদেরকে কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে শুনাতে লাগলেন-
حم تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ غَافِرِ الذَّنبِ وَقَابِلِ التَّوبِ شَدِيدِ العِقَابِ ذِي الطُّولِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِلَيْهِ المَصِيرُ .
অর্থ- “হা মীম। এই কিতাব প্রজ্ঞাময় ও পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত । যিনি গুনাহ্ ক্ষমাকারী [সূরা গাফির-১-৩]|"

তারপর তিনি বললেন: এই হলো মহান রব আল্লাহর বাণী । আর কোথায় মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের প্রলাপ ...... يَا ضِفَدَعَ نَقِي مَا تَنقَيْنَ، لَا الشَّرَابُ تَمْنَعِيْنَ، وَلَا أَلَمَاء تَكْدِرِينَ
অর্থ- হে ব্যাঙ! তুই যতই ঘেঁজর ঘেঁঙ্গর করিস না কেন, এটি না লোকদেরকে পানি পান থেকে বিরত রাখবে, আর না পানিকে ঘোলাটে করবে। যারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছে তিনি তাদেরকে নিয়ে সরে গেছেন। তিনি মুরতাদদেরকে দমন করে আল্লাহর কালাম প্রতিষ্ঠা করার জন্যে আমরণ জিহাদ করে গেছেন।

আল্লাহ তাআলা হযরত উসামা বিন উসালকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুক এবং তাঁকে জান্নাত দান করে সম্মানিত করুক। যে জান্নাতের ওয়াদা তিনি আল্লাহভীরুদের জন্য করেছেন।

তথ্য সূত্র ১. আল ইসাবা – ১ম খণ্ড, ২০৩ পৃ. । ২. আল ইসতিআ'ব – ১ম খণ্ড, ২০৩ পৃ। ৩. আস্ সিরাতুন নববিয়্যা লি ইবনি হিশাম - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৪. আল আ'লাম লিজ্ জিরিকলী - ২য় খণ্ড, ৮৬ পৃ.
৫. উসদুল গবাহ – ১ম খণ্ড, ২৪৬ পৃ.।

 হযরত বারা বিন মালিক আল আনসারী রাদিয়ারার

“সাবধান! তোমরা বারাকে কখনো সেনাপতির দায়িত্ব দিবে না, কেননা ভয় হয় সে নির্দ্বিধায় তার সৈন্যদেরকে শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিবে।”
[হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু]

রাসূল -এর উল্লেখযোগ্য একজন সাহাবী হযরত বারা বিন মালিক স্বামিয়ানা যার চুলগুলো ছিল এলোমেলো উস্কুখুস্কু। তাঁর শরীর সর্বদা ধুলায় মলিন থাকতো। গোস্তবিহীন হাড্ডিসার শরীর যার প্রতিটি হাড্ডি ভেসে ছিল। দর্শকের দৃষ্টি তাঁর দিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়লেও সেই দৃষ্টি সাথে সাথে ফিরে আসত । এরপরও তিনি এমন একজন লোক ছিলেন যিনি মল্লযুদ্ধে শতজন মুশরিক বীরকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন। তিনি ছিলেন সশস্ত্র সাহসী বীরযোদ্ধা যিনি যুদ্ধে সর্বদা সম্মুখে অবস্থান করতেন। এ কারণে হযরত উমর তার শানে বলেছেন: “সাবধান! তোমরা বারাকে কখনো সেনাপতির দায়িত্ব দিবে না, কেননা ভয় হয় সে নির্দ্বিধায় তার সৈন্যদেরকে শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিবে।”

হযরত বারা বিন মালিক হচ্ছেন রাসূল এর খাদেম হযরত আনাস বিন মালিক ভূমিকার -এর আপন ভাই । যদি আমরা বারা বিন মালিক ভূমি - এর বীরত্ব নিয়ে আলোচনা করি তবে বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যাবে তবুও তাঁর বীরত্বের কথা শেষ হবে না। তাঁর বীরত্বের উদাহরণ স্বরূপ আমরা একটি ঘটনা তুলে ধরলাম। যে ঘটনাটি তাঁর অসাধারণ বীরত্বের দিকটি ফুটিয়ে তুলবে এবং তাঁর অন্যান্য বীরত্বময় ঘটনাকে অনুমান করতে সাহায্য করবে।
এই ঘটনাটি রাসূল -এর ইন্তেকালের কয়েক ঘণ্টা পর থেকে শুরু হয়। রাসূল -এর ইন্তেকালের পর মক্কা, মদিনা ও তায়েফের লোকেরা ব্যতীত অন্যান্য গোত্রের লোকেরা একযোগে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে আগের ধর্মে ফিরে যেতে লাগল। যেমনিভাবে তারা ইসলামের বিজয় দেখে একযোগে ইসলামে প্রবেশ করেছিল, রাসূল -এর ইন্তেকালের পর ঠিক তেমনিভাবে ইসলাম ত্যাগ করে একযোগে মুরতাদ হতে লাগল। তখন মক্কা, মদিনা, তায়েফ ও অন্যান্য কিছু গোত্রের লোকেরা যাদের অন্তরকে আল্লাহ ঈমানের ওপর মজবুত রেখেছে তারাই ইসলামে স্থায়ী ছিলেন।

ইসলামবিরোধী ধ্বংসাত্মক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন এই ফিতনা মোকাবিলা করতে হযরত আবু বকর পর্বতমালার ন্যায় কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের থেকে এগারো জন সেনাপতি প্রস্তুত করলেন। আর এই এগারো জনকে পথ প্রদর্শন করতে আরো এগারো জন ব্যক্তিকে নিয়োজিত করলেন । মানুষকে হেদায়েতের পথে নিয়ে আসার জন্যে এবং যারা ইসলাম থেকে বিমুখ হতে চায় তাদেরকে তরবারির আঘাতে সোজা করার জন্যে, তিনি প্রস্তুতকৃত সেনাপতিদেরকে জাযিরাতুল আরবের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন । তখন ইসলাম ত্যাগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংখ্যায় আধিক্যে ছিল বনু হানীফা নামক গোত্রটি। যারা ভণ্ড নবী মুসায়লাতুল কাজ্জাবের সহচর। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব তার গোত্র ও সহকারী গোত্র থেকে মোট চল্লিশ হাজার দুর্ধর্ষ সৈনিক নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ।

বনু হানীফ গোত্রের লোকদের মধ্যে গোত্রপ্রীতি অনেক বেশি কাজ করত। যার কারণে তাদের অধিকাংশ লোক ইসলাম ত্যাগ করে মুসায়লামার পক্ষে অবস্থান নেয়। আবার তাদের কেউ কেউ এ কথা বলতো যে মুহাম্মদ সত্য এবং মুসায়লামা মিথ্যা, কিন্তু এরপরও কোরাইশ গোত্রের সত্যকে সহযোগিতা করার থেকে নিজ গোত্রের মিথ্যাকে সহযোগিতা করা আমাদের নিকটে উত্তম । হযরত আবু বকর হযরত ইকরামা -এর নেতৃত্বে মুসায়লামাতুল কাজ্জাবকে আক্রমণ করার জন্যে এক দল মুজাহিদ বাহিনী প্রেরণ করলেন, কিন্তু তারা মুসায়লামাকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হলো । এরপর হযরত আবু বকর খালিদ বিন ওয়ালিদ -এর নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। সেই বাহিনীতে মুহাজির ও আনসার অনেক সাহাবী অংশগ্রহণ করেন। আর তাঁদের অগ্রভাগে অবস্থান করলেন হযরত বারা বিন মালিক আরো কিছু শক্তিশালী বীর মুজাহিদ।
ইয়ামামার ময়দানে উভয় দল যুদ্ধের মুখোমুখি হলো। তাদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। যুদ্ধের প্রথমদিকে মুসায়লামা ও তার বাহিনীর বিজয়ের পাল্লা ভারি হতে লাগল। যুদ্ধের অবস্থা মতো ভয়াবহ হয় যে, মুসলমানরা ময়দানে দাঁড়াতে পারছিল না। তাদের পায়ের তলের মাটি কাঁপতে শুরু করে। আর তাই তারা ধীরে ধীরে পিছনের দিকে যেতে লাগল। এমনকি শত্রু বাহিনীর সৈন্যরা খালেদ বিন ওয়ালিদ -এর তাঁবুটিও দখল করে নিল। যে তাঁবুটি মুসলমানদের সবচেয়ে বড় তাঁবু ছিল। তারা তাঁবুটি উঠিয়ে ফেলল এবং উহার পর্দাগুলো ছিঁড়ে ফেলল। তারা তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করে, কিন্তু তিনি পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেলেন। এই যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলে যে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে তা মুসলিম বাহিনী আঁচ করতে পারে। যদি মুসলমানরা আজ তাদেরকে পরাজিত করতে না পারে তাহলে ইসলাম আর কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। শরিকবিহীন সত্ত্বা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার মতো কেউ আর এই পৃথিবীতে বাকি থাকবে না । আর তাই হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ আবার সৈন্যদের মনোবল ফিরিয়ে এনে তাদেরকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। তিনি মুহাজির ও আনসার সাহাবীদেরকে দুইটি বাহিনীতে ভাগ করলেন। আর তৃতীয় বাহিনী হিসেবে বেদুঈনদেরকে নির্ধারণ করে সর্বোপরি মুসলিম সৈন্যদেরকে মুহাজির, আনসার ও বেদুঈন তিন ভাগে ভাগ করলেন।
তিনি প্রত্যেক সন্তানকে তাদের পিতার ঝাণ্ডার নিচে একত্রিত করলেন যাতে করে তারা যুদ্ধে তাদের অবস্থান উপলব্ধি করতে পারে ।

মুসলমান ও মুরতাদদের মাঝে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যে যুদ্ধের মতো যুদ্ধ মুসলমানরা কখনো দেখেনি। মুসায়লামার বাহিনী অটল পর্বতের মতো যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান নিল। অন্যদিকে মুসলমানরা এমন দুঃসাহসিকতা ও বীরত্ব দেখাতে লাগল, যদি তা লিপিবদ্ধ করা হতো তাহলে তা অতুলনীয় রণকাব্যে রূপ নিত । ইনি হলেন হযরত সাবিত বিন কায়েস যার হাতে আনসারদের ঝাণ্ডা তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি সুগন্ধি মেখে কাফনের কাপড় পরে নিজের জন্যে একটি কবর খুঁড়ে তাতে নেমে পড়লেন। তিনি সগোত্রীয় ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে স্থির অবিচল থেকে যুদ্ধ করতে করতে এক সময় শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন । ইনি হলেন হযরত জায়িদ বিন খাত্তাব । যিনি হযরত উমর এল-এর আপন ভাই। তিনি মুসলমানদেরকে ডেকে বললেন: হে মানুষেরা তোমরা তোমাদের অবস্থানে অনড় থাক, তোমাদের শত্রুদেরকে খতম করতে থাকো এবং সামনের দিকে পা বাড়াও.. । আল্লাহর শপথ! আমি এর পরে আর কোনো কথা বলব না যতক্ষণ না মুসায়লামাকে পরাজিত করব অথবা আমি শহীদ হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাব । তারপর তিনি শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করলেন। অবশেষে লড়াই করতে করতে তিনি শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

আর ইনি হযরত সালেম বলে । যিনি মুহাজিরদের ঝাণ্ডা হাতে নিলেন, কিন্তু অন্যান্যরা তাঁর দুর্বলতার কারণে অটল অবিচল না থাকার ভয় করতে লাগল । তারা তাঁকে বলল: আমরা আপনার দিক থেকে আক্রান্ত হওয়ার ভয় করছি। তিনি বললেন: যদি তোমরা আমার দিক থেকে আক্রান্ত হও তাহলে আমি কতই না নিকৃষ্ট কোরআন ধারণকারী । এরপর তিনি শত্রুদের মোকাবিলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অবশেষে তিনি তাদের আক্রমণের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

কিন্তু হযরত বারা বিন মালিক এর বীরত্বের দিকে তাকালে এই সকল মহান বীরদের বীরত্ব অনেক ক্ষুদ্র মনে হবে। তা হচ্ছে, যখন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ যুদ্ধের ময়দান অনেক উত্তপ্ত দেখলেন তিনি বারা বিন মালিক রমিয়ারে -কে ডাক দিয়ে বললেন: হে আনসারী যুবক তুমি এদের দিকে যাও । বারা বিন মালিক তাঁর জাতির দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তিনি তাদেরকে বলতে লাগলেন- হে আনসার বাহিনী! তোমরা মদিনায় ফিরে যাওয়ার চিন্তাও করবে না। আজকের পর তোমাদের জন্য মদিনা বলতে কিছুই নেই; বরং তোমাদের জন্য এক আল্লাহ রয়েছেন..........
এরপর জান্নাত....................

তারপর তিনি মুশরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর সাথে একযোগে আনসাররাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিনি শত্রুদের কাতার ভেঙে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন এবং তাঁর তরবারি দ্বারা শত্রুদের ঘাড়ে আঘাত করতে লাগলেন। আক্রমণ তীব্র হওয়ার কারণে মুশরিকরা পিছু হঠতে বাধ্য হলো। তারা তাদের বাগানে আশ্রয় নিল। যে বাগান ইতিহাসে মরণ বাগান নামে পরিচিত। কেননা সেখানে একত্রে অসংখ্য লোক মারা গিয়েছিল, যার তুলনা ইতিহাসে নেই ।এই বাগানটি চারদিকে উঁচু প্রাচীর দ্বারা ঘেরাও করা ছিল। তাই মুসায়লামা ও তার অনুগত সৈন্যরা এর ভেতরে ঢুকে ফটক বন্ধ করে দিল। বাগানের দেওয়ালটি সুউচ্চে তাই তারা এর ভেতরে দুর্গের মতো আশ্রয় নিল । তারা ভেতর থেকে মুসলমানদের দিকে বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করতে লাগল, কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় মুসলমানরা তাদের ওপর কোনোভাবেই আক্রমণ করতে পারছিল না । আর তখনি বারা বিন মালিক এগিয়ে গিয়ে বললেন: হে আমার গোত্রের লোকেরা তোমরা আমাকে চাকতিতে বসাও, তারপর তা বর্শার দ্বারা উপরে তুলে আমাকে বাগানের ভেতরে দরজার নিকটে ছেড়ে দাও। হয় আমি শহীদ হয়ে যাব, অন্যথায় তোমাদের জন্য দরজা খুলে দিব । চোখের পলকে বারা বিন মালিক চাকতিতে বসলেন। তিনি ছিলেন চিকন ও হালকা ওজনের মানুষ। তারপর ওই চাকতিটি দশটি বর্শা দ্বারা ওপরে তুলে তাঁকে বাগানের ভেতরে মুসায়লামার হাজার হাজার সৈন্যের মাঝে ফেলে দিল। তিনি তাদের সামনে বজ্ররের ন্যায় পতিত হলেন। তিনি দরজার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। অন্যদিকে মুসায়লামার সৈন্যরা তাঁকে দেখে তাঁর দিকে তেড়ে আসে । তিনি তাদের দশ জন সৈন্যের ঘাড়ে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তাদেরকে খতম করে দিলেন। অবশেষে তিনি দরজা খুলতে সক্ষম হলেন। এর মধ্যে তার শরীরে আশিটিরও বেশি তরবারি ও বর্শার আঘাত লাগে । দরজা খোলার সাথে সাথে মুসলমানরা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এরপর তারা মুরদাত ও ইসলামের শত্রুদের মাথায় তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এমনকি সেখানে মুসলমানরা মুসায়লামার বিশ হাজারের কাছাকাছি সৈন্যকে হত্যা করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়। অবশেষে তারা মুসায়লামার নিকটে পৌঁছে গেল এবং তাকে হত্যা করে ধরাশায়ী করল।

হযরত বারা বিন মালিক -কে চিকিৎসা করার জন্য নিয়ে আসা হলো। হযরত খালিদ মিনারে তাঁর নিকটে এক মাস অবস্থান করেন। দীর্ঘ এক মাস পর আল্লাহ তাআলা তাঁকে সুস্থতা দান করেন। তাঁর সাহসী ভূমিকায় আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে ইয়ামামার যুদ্ধে বিজয় দান করেছিলেন। হযরত বারা বিন মালিক সর্বদা শাহাদাত লাভের আশায় বিভোর থাকতেন। যে শাহাদাতের কামনা তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে করেছিলেন, কিন্তু সেদিন তার ভাগ্যে তা লিখা ছিল না। এ কারণে তিনি একের পর এক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে লাগলেন। তিনি আশা করতেন তিনি শহীদ হয়ে নবী করীম -এর সাথে মিলিত হবেন । পারস্যের তুসতর নামক এলাকা বিজয়ের দিন পারস্যবাসী একটি মজবুত দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলমানরা সেই দুর্গের চারদিক ঘেরাও করে। যখন কাফেরদের ওপর যুদ্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো তখন তারা ওপর থেকে লোহার শিকলে বাঁধা উত্তপ্ত লাল টকটকে আংটা ফেলতে শুরু করল। সেই সকল লোহার আংটা যার গায়ে বিধে যেত সে হয় মারা যেত না হয় পঙ্গু হয়ে যেত।

অবশেষে তারা আঘাতকৃত লোকটিকে মৃত বা পঙ্গু অবস্থায় তাদের নিকটে নিয়ে যেত এবং তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করত। এমন একটি লোহার টুকরা বারা বিন মালিক
ওপরে পতিত হলো। তিনি তা দেখে দেওয়ালের দিকে লাফ দিলেন এবং সে লোহার আংটাটি ধরে ফেললেন। এতে তাঁর হাত পুড়ে গিয়ে হাতের গোস্ত খসে পড়তে লাগল, কিন্তু তিনি সেই দিকে কোনো ভুরুক্ষেপ করলেন না; বরং তিনি তাঁর ভাইকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। আর তখন তাঁর হাতে কোনো গোশত বাকি ছিল না। গোশতগুলো খসে পড়ে হাড্ডিগুলো ভেসে উঠল । এই যুদ্ধে তিনি আল্লাহর নিকটে দোয়া করেছেন আল্লাহ যেন তাঁকে শাহাদাত দান করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তাকে শহীদী মৃত্যু দান করেন। আল্লাহ তাআলা হযরত বারা বিন মালিক -এর চেহারাকে জান্নাতে উজ্জ্বল করুক এবং রাসূল -এর সহবতে তাঁর চক্ষু শীতল করুক। তিনি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন।

তথ্য সূত্র ১. আল ইসাবা – ১ম খণ্ড, ১৪৩ পৃ.।- ২. আল ইসতিআ'ব – ১ম খণ্ড, ১৩৭ পৃ. । ৩. আত্‌ তাবাকাতুল কুবরা - ৩য় খণ্ড, ৪৪১ পৃ. ও ৭ম খণ্ড, ১৭, ১২১ পৃ। ৪. তারীখুত্ ত্বাবারী - ১০ম খণ্ড, (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৫. আল কামিল ফিত্ তারীখ - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৬. আস্ সিরাতুন নববিয়্যা লি ইবনি হিশাম - (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৭. হায়াতুস্ সাহাবা - ৪র্থ খণ্ড, (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)।
৮. কা'দাতু ফাতহি ফারিস লশিত খাত্তাব।

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.