হযরত ইকরামা বিন আবু জাহল (রাঃ) এর জীবনী

“অচিরেই ইকরামা ঈমান এনে তোমাদের নিকটে হিজরত করে আসবে; সুতরাং তোমরা তার পিতাকে গালি দিবে না কেননা মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে তা সে শুনতে পায় না; বরং তা জীবিত ব্যক্তিদের কষ্ট দেয়।" [তাঁর সম্পর্কে রাসূল -এর ভবিষ্যৎ বাণী]

“আরোহী মুহাজিরকে স্বাগতম” [ইকরামাকে রাসূল -এর স্বাগত বাণী]

তাঁর ত্রিশ বছর বয়সে নবী করীম কে সত্য ও হেদায়েত নিয়ে আরবে প্রকাশিত হয়েছিলেন । তিনি ছিলেন কোরাইশদের মধ্যে অনেক সম্মানিত নেতা। বংশ ও অর্থের দিক দিয়ে তিনি মক্কা নগরীর সেরাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি অনেক আগে ইসলাম গ্রহণ করতেন যদি তাঁর পিতা না থাকতো। কিন্তু পিতার বাধার কারণে ইসলাম গ্রহণ করতে তাঁর অনেক দেরি হয়ে গেল । আপনি কি জানেন তাঁর সেই জঘন্য পিতা কে ছিল? সে হচ্ছে মক্কা নগরীর জালিম ও মুশরিকদের নেতা এবং মুসলমানদের ক্ষতিসাধনকারীদের প্রধান। যার কারণে মুসলমানরা অনেক কষ্টে পতিত হয় । সে তার সর্বাত্মক চেষ্টা দিয়ে মুসলমানদেরকে কষ্ট দিত।

সে ছিল হযরত ইকরামা -এর পিতা, ইসলামের ইতিহাসে যে ব্যক্তি আবু জাহেল তথা মূর্খের বাপ নামে পরিচিত। সে বুদ্ধির দিক দিয়ে সেরা থাকার কারণে তাকে আরবের লোকেরা আবুল হাকাম তথা বুদ্ধির বাবা বলে ডাকত, কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর বিরুদ্ধাচরণ করার মতো জঘন্য কাজ করার কারণে ইসলামের ইতিহাসে সে আবু জাহেল নামে পরিচিতি লাভ করে । এই জঘন্য লোকটিই ছিল হযরত ইকরামা -এর পিতা আবু জাহেল। যে তৎকালীন মক্কা নগরীর বিশিষ্ট নেতা ছিল ও সাহসী অশ্বারোহী ছিল। হযরত ইকরামা প্রথম জীবনে তাঁর পিতাকে ইসলাম ও রাসূল -এর তীব্র বিরোধিতা করতে দেখলেন। এ কারণে তিনিও ইসলামের তীব্র বিরোধিতা করা শুরু করেন। তিনি রাসূল ও তাঁর সাহাবীদেরকে অনেক বেশি কষ্ট দিতে লাগলেন এবং ইসলামকে খুব গালাগালি করতেন। এতে তাঁর পিতা আবু জাহেলের অন্তর খুব শান্তি পেত এবং সে খুব খুশি হতো । বদরের যুদ্ধ পরিচালনা করার সময় তাঁর পিতা আবু জাহেল লাত ও উজ্জা নামক মূর্তির কসম করে বলল: সে মুহাম্মদকে আক্রমণ না করে ফিরবে না। রাসূল সালাহাই-এর সাথে যুদ্ধ করতে সে বদর প্রান্তরে অবস্থান নিল। সে সেখানে তিন দিন অবস্থান করল। এ তিন দিনে সে উট ও ভেড়া জবাই করে খেল এবং মদ পান করল ।

বদর যুদ্ধের পরিচালনায় তার ছেলে হযরত ইকরামা ছিলেন তখন তার ডান হাত । যার ওপর সে ভর করত এবং নির্ভর করে থাকতো । কিন্তু লাত ও উজ্জা নামক মূর্তি আবু জাহেলের ডাকে সাড়া দেয়নি। কিভাবে দিবে? মূর্তিরাতো কোনো কথা শুনতেই পায় না। তারা তাকে কোনো সাহায্য করল না। কিভাবে সাহায্য করবে? তাদের তো কোনো শক্তিই নেই । আর এ কারণেই বদরের যুদ্ধে আবু জাহেল পরাজিত হয়। হযরত ইকরামা মিনার নিজ চোখে তাঁর পিতাকে মুসলমানদের হাতে নিহত হতে দেখলেন। আরো দেখলেন বদরের যুদ্ধে কাফেরদের করুণ পরিণতি। যা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। হযরত ইকরামা বদরের প্রান্তে কোরাইশ নেতার লাশ রেখে মক্কায় ফিরে আসেন । তিনি তাদেরকে মক্কায় নিয়ে দাফন করতেও সক্ষম হননি ।

মুসলমানগণ কাফেরদের নেতার লাশ কলীবে নিক্ষেপ করেন। আর সেখানে তাদেরকে বালু দিয়ে চাপা দিয়ে দিলেন । ওই দিন থেকে হযরত ইকরামা ইসলামের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নিলেন। তিনি তাঁর পিতার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে পাগল হয়ে গেলেন। তিনি ও যাদের আত্মীয়স্বজন বদরের যুদ্ধে মারা গেছে তারা সকলে মক্কাবাসীর অন্তরে যুদ্ধের আগুনকে প্রজ্বলিত করতে লাগলেন। তিনি মক্কার অধিবাসীদেরকে রাসূল  - এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে একত্রিত করতে লাগলেন। তিনি তাদের প্রত্যেকের অন্তরে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিলেন এবং মুহাম্মদ  এর বিরুদ্ধে সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুললেন। আর এ সূত্র ধরে উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে উহুদের ময়দানের দিকে রওয়ানা দিলেন। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রীও বের হলেন যাতে যোদ্ধাদের পেছনে নারীদের মাঝে অবস্থান করে যোদ্ধাদেরকে উৎসাহিত করতে পারেন। আর যখন যোদ্ধারা ময়দান থেকে পিছু হঠতে চাইবে তখন দুফ বাজিয়ে তাদেরকে ময়দানে অটল রাখতে পারেন । কোরাইশদের ডানে ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদ। আর বামে ছিল ইকরামা বিন আবু জাহেল। তাঁদের উভয়ের নেতৃত্বে উহুদের ময়দানে মুসলমানরা তীব্র আক্রমণের শিকার হলেন। তাঁরা উভয়ে কোরাইশদেরকে বিজয় এনে দিলেন। যুদ্ধ শেষে তাঁদের নেতা আবু সুফিয়ান বললেন: এই যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের প্রতিশোধ ।

খন্দকের যুদ্ধের সময় মুশরিকরা মদিনাকে অনেক দিন যাবত ঘেরাও করে রাখে । অবরোধ অনেক দিন অতিক্রম হওয়ার পরেও যখন বিজয় আসল না তখন হযরত ইকরামা রাজি তার বিরক্ত হয়ে গেলেন। এতে তিনি ভালোভাবে খন্দকটি দেখলেন এবং সেখানে পার হওয়ার সামান্য জায়গা পেলেন। তিনি সেখান দিয়ে তাঁর ঘোড়া ছুটালেন। তাঁর সাথে আরো কিছু দুঃসাহসী লোক ঘোড়া ছুটিয়ে খন্দক পার হয়ে সামনে গেল, কিন্তু আমর বিন আব্দুল উদ্দ আমেরী সামনে এগিয়ে গেলে হযরত আলী -এর হাতে নিহত হয়। আর তখন হযরত ইকরামা মৃত্যু ভয়ে পালিয়ে যেতে লাগলেন। ওই দিকে রসদপত্র সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে আর অবরোধ করে রাখাও সম্ভব ছিল না। অবশেষে পালানো ছাড়া আর কোনো গতি ছিল না । হঠাৎ এক ঝড় এসে মুশরিকদের সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিল । আর তাই তারা ফিরে যেতে বাধ্য হলো। আর এভাবেই কোরাইশদের কোনো সফলতা ছাড়া খন্দকের যুদ্ধ শেষ হলো ।

মক্কা বিজয়ের দিন কোরাইশরা দেখল মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবীদেরকে কোনোভাবেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়। আর এ কারণে তারা মুসলমানদের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করল না। তাছাড়া রাসূল ঘোষণা করলেন- যারা যুদ্ধ করবে না তারা নিরাপদ। আর এ কারণে তারা প্রতিরোধ করার চিন্তা বাদ দিয়ে দিল। কিন্তু ইকরামা বীম ও তাঁর সাথে কতিপয় লোক মুসলমানদের বিরুদ্ধে লোকদেরকে উত্তজিত করতে লাগল। তারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য একটি বাহিনী গঠন করল। হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ সেই বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত করেন। তাদের কিছুকে নিহত হলো আর বাকিরা পালিয়ে গেল । হযরত ইকরামা সৌভাগ্যবশত পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন।

ওই দিকে হযরত ইকরামা -এর স্ত্রী উম্মে হাকীম ও হিন্দা রাসূল নিকটে এসে ইসলামের ওপর বায়াত হন। তাঁদের সাথে আরো দশজন মহিলা বায়াত গ্রহণ করেন। তাঁরা যখন রাসূল -এর নিকটে প্রবেশ করেন তখন তাঁর নিকটে তাঁর দুইজন স্ত্রী ও তাঁর কন্যা ফাতেমা ছিলেন এবং আব্দুল মুত্তালেবের পুত্রবধূরা ছিলেন। হিন্দা কথা বলতে শুরু করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার যিনি তাঁর পছন্দনীয় দ্বীনকে বিজয় দান করেছেন। আপনার নিকটে আমার দাবী আপনি আমার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করবেন। কেননা আমি এখন ঈমানদার ও বিশ্বাসী একজন নারী।

তিনি তার চেহারা খুলে বললেন: আমি উতবার মেয়ে হিন্দা । রাসূল তাকে বললেন: তোমাকে স্বাগতম ।

তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকটে জমিনের ওপর আপনার ঘরের মতো অপ্রিয় বস্তু আর কিছুই ছিল না আর এখন আপনার ঘরই আমার নিকটে জমিনের ওপর সবচেয়ে প্রিয় ঘর। রাসূল বললেন: বিষয়টি এর থেকেও বেশি। তারপর ইকরামা শুনিয়ায়ার -এর স্ত্রী উম্মে হাকিম সামনে এগিয়ে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর বললেন: হে আল্লাহর রাসূল ইকরামা আপনার ভয়ে ইয়ামানে পালিয়ে গেছে, আপনি তাঁকে নিরাপত্তা দিন। আল্লাহ আপনাকে নিরাপত্তা দিবেন। রাসুল বললেন: সে মুক্ত । তার স্ত্রী রাসূল এর কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার পর ইকরামা - খোঁজার জন্যে বের হয়ে গেলেন। তার সাথে রুমী এক গোলাম ছিল। তাঁরা দ্রুত পথ চলতে লাগলেন। পথে গোলামটি তাঁকে খারাপ প্ররোচনা দিতে লাগল । নিজেকে বাঁচানোর কৌশল হিসেবে ইকরামার স্ত্রী তাকে আশা দিতে লাগলেন। যখন তাঁরা একটি জনপদে পৌঁছলেন তখন ইকরামার স্ত্রী গোলামটির বিরুদ্ধে তাদের কাছে সাহায্য চাইলেন। তারা তাঁকে সাহায্য করে এবং গোলামটিকে বেঁধে ফেলে । তিনি তাদের নিকটে গোলামটিকে বন্দি রেখে আসেন। তারপর তিনি একা একা ইকরামাকে খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে তিনি তাঁকে তিহামা নামক এলাকায় সাগরের পাড়ে খুঁজে পেলেন। হযরত ইকরামা তখন সমুদ্রের এক নাবিকের সাথে কথা বলছিলেন । নাবিক তাঁকে বলল: তুমি নিজেকে মুক্ত কর তাহলে আমি তোমাকে নিয়ে যাব । ইকরামা বললেন: কিভাবে আমি নিজেকে মুক্ত করব?

নাবিক বলল: তুমি বল: আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আসাদ আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: আমিতো সেখান থেকেই পালিয়ে এসেছি। তারা দুইজনের কথা বলা অবস্থায় ইকরামা -এর স্ত্রী এসে হাজির হলেন । তিনি এসে বললেন: আমি সবচেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহর কাছ থেকে এসেছি। আমি তাঁর কাছে তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়েছিলাম। তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। ইকরামা শিখা বললেন: তুমি কি নিজে কথা বলেছ? তিনি বললেন: হ্যাঁ আমি নিজে কথা বলেছি। তারপর ইকরামা  তার স্ত্রীর সাথে ফিরে আসার জন্যে রওয়ানা দেয়। তাঁর স্ত্রী পথে ঘটে যাওয়া ওই গোলামের কথা তাঁকে বললেন। ইকরামা ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে ওই গোলামকে হত্যা করেন।

পথে কোনো এক মজিলে আসার পর ইকরামা তার স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী তা করতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন: আমি মুসলমান আর তুমি এখনও মুশরিক; সুতরাং কোনভাবে তা করা যাবে না । তখন ইকরামা খুব অবাক হয়ে বললেন: যে জিনিস (ধর্ম) তোমার আর আমার মাঝে দূরুত্ব সৃষ্টি করেছে তা অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যখন ইকরামা মক্কার নিকটবর্তী হয়েছেন রাসূল তাঁর সাহাবীদেরকে বললেন: অচিরেই ইকরামা ঈমান এনে তোমাদের নিকটে হিজরত করে আসবে; সুতরাং তোমরা তার পিতাকে গালি দিবে না কেননা মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে তা সে শুনতে পায় না; বরং তা জীবিত ব্যক্তিদের কষ্ট দেয়। এর কিছুক্ষণ পরই ইকরামা ও তাঁর স্ত্রী মক্কায় এসে পৌঁছেন। রাসূল সালাবার তাঁকে দেখে খুশিতে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি এতো তাড়াতাড়ি গেলেন যে গায়ের চাদরটিও নিলেন না।

হযরত ইকরামা রাসূল সালামান-এর সামনে গিয়ে বসেন, তিনি বললেন: হে মুহাম্মদ! উম্মে হাকিম আমাকে বলেছে- আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। রাসূল বললেন: সে সত্য বলেছে, তুমি নিরাপদ ।ইকরামা সাদিয়ারায় বললেন: আপনি আমাকে কিসের দিকে আহ্বান করতে চান ? রাসূল বললেন: আমি তোমাকে এই দিকে আহ্বান করব যে, তুমি সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। এরপর রাসূল সালাবার ইসলামের পাঁচ রুকনের কথা বললেন। ইকরামা বললেন: আল্লাহর শপথ! আপনি সত্যের দিকেই আহ্বান করছেন। তারপর তিনি বলতে লাগলেন- আল্লাহর শপথ! আপনি এই দাওয়াত প্রচার করার পূর্বেও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী ছিলেন এবং সবচেয়ে ভালো লোক ছিলেন ।

এরপর তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করে বলতে লাগলেন- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল । তিনি আরো বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে এমন একটি উত্তম বাক্য শিখিয়ে দিন যা আমি বলব। রাসূল বললেন: তুমি বল- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তিনি বললেন: আর কি বলব । রাসূল বললেন: তুমি বল: আমি আল্লাহকে ও উপস্থিত লোকদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি একজন মুসলিম, মুজাহিদ ও মুহাজির ।

এরপর রাসূল পুনরায় বললেন: আজ তুমি যা চাইবে আমি তোমাকে তা দিব । তিনি বললেন: আমি আপনার নিকটে চাচ্ছি, আমি আপনার যত বিরুদ্ধাচরণ করেছি, আপনার বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্র করেছি এবং আপনার সামনে বা পেছনে আপনার বিরুদ্ধে যত কথা বলেছি সবগুলোর জন্য আপনি আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূল বললেন: হে আল্লাহ তুমি তাকে মাফ করে দাও। সে আমার যত বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তোমার নূরকে নিভানোর জন্য যত সফর করেছ এবং আমার সামনে বা পেছনে আমার বিরুদ্ধে যত কিছু করেছে সব কিছুর জন্য তাকে মাফ করে দাও । এতে তাঁর চেহারায় আনন্দ ফুটে উঠে, তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি যা কিছু আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যয় করেছি তার দ্বিগুণ আল্লাহর দ্বীনের জন্যে ব্যয় করব এবং আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ করেছি তার দ্বিগুন আল্লাহ দ্বীনের পক্ষে যুদ্ধ করব। সেদিন থেকে দাওয়াতের কাফেলায় ও রণক্ষেত্রে এক সাহসী অশ্বারোহী বীর যোগ দিলেন। যিনি দিনে নামাজে আর রাত জেগে কোরআন তেলওয়াতে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি কোরআনকে তাঁর চেহারার উপরে রেখে বলতেন: এটি আমার প্রতিপালকের বাণী.. এটি আমার প্রতিপালকের বাণী... এই বলে বলে আল্লাহর ভয়ে খুব বেশি কাঁদতেন ।

হযরত ইকরামা রিমা মুশরিক থাকা অবস্থায় যত অন্যায় করেছেন ইসলাম গ্রহণ করে তার থেকেও বেশি ভালো কাজ করেছেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর এমন কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি যাতে তিনি অংশগ্রহণ করেননি এবং এমন কোনো দ্বীনী কাজ নেই যাতে তিনি অংশীদার হননি। ইসলামের কাজে তিনি দলের অগ্রভাগে অবস্থান নিতেন । ইয়ারমুকের দিন হযরত ইকরামা তীব্রভাবে কাফেরদেরকে আক্রমণ করেন। যখন যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্র হতে লাগল তিনি তাঁর তরবারির খাপ ভেঙে ফেললেন এবং বীরবিক্রমের মতো শত্রুদের ভেতরে ঢুকে গেলেন । খালেদ বিন ওয়ালিদ তাঁকে বললেন: তুমি এটি করবে না কেননা তুমি শহীদ হলে যুদ্ধ মুসলমানদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে । তিনি বললেন: আমাকে আমার কাজ করতে দাও। কেননা তোমরা আমার অনেক আগে ইসলাম গ্রহণ করেছ । আর আমি এবং আমার পিতা রাসূল সালালাহ-এর তীব্র বিরোধিতা করেছি। সুতরাং আমাকে ছেড়ে দাও আমি আমার আগের কর্মের কাফ্ফারা আদায় করে নিই। আমি রাসূল সাপাহার-এর বিরুদ্ধে কত যুদ্ধ করেছি। আর আজ তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমি কি পালিয়ে যাব? তা কখনো হতে পারে না ।

তারপর তিনি মুসলমানদেরকে ডাক দিয়ে বললেন: কে কে আমার হাতে মৃত্যুর জন্য বাইয়াত হবে? চার শত মুসলমানদের মধ্য থেকে তাঁর হাতে শুধু তাঁর চাচা হারিস বিন হিসাম ও জিরার বিন আযওয়ার বাইয়াত গ্রহণ করেন। তাঁরা তিনজন মিলে শত্রুদের ওপর তীব্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যা হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ যদি কল্পনাও করতে পারেননি । যুদ্ধ শেষে ইয়ারমুকের ময়দানে এই তিন মর্দে মুজাহিদ আঘাতে আঘাতে দুর্বল হয়ে মাটিতে পড়ে রইলেন। তাঁরা হচ্ছেন হারিস বিন হিসাম, আইয়াস বিন আবু  এবং ইকরামা বিন আবু জাহেল । তাদের মধ্যে হযরত হারিস পানি বলে আওয়াজ দিলেন। যখন তার নিকটে পানি নিয়ে আসা হয় তখন হযরত ইকরামা পানি বলে আওয়াজ দিলেন। এতে তিনি বললেন: তোমরা তাকে আগে পানি দাও । যখন তারা ইকরামা -এর নিকটে পানি নিয়ে আসলেন তখন হযরত আইয়াস পানি বলে আওয়াজ দিলেন । তার আওয়াজ শুনে হযরত ইকরামা বললেন: তোমরা আগে তাকে পানি দাও। কিন্তু তাঁর কাছে যেতে না যেতে তাঁর পবিত্র রূহ্ উড়ে গেল। তাঁরা ইকরামা ও হারিস বাহিরার বাসিতামার -এর নিকটে পানি নিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু এসে তাঁদের আর পায়নি; বরং তাঁরা তাদের রবের নিকটে চলে গেছেন । আল্লাহ যেন তাঁদেরকে হাউযে কাউসারের পানি পান করিয়ে তাঁদের অন্তর শীতল করেন, যে পানি পান করলে আর কখনো পিপাসা লাগবে না এবং তাদেরকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন ।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবাহ্ – ২য় খণ্ড, ৪৯৬ পৃ. ।
২. তাহযীবুল আসমা - ১ম খণ্ড, ৩৩৮ পৃ.।
৩. খুলাসাতুত্ তাহযীব - ২২৮ পৃ.
৪. যাইলুল মুযীল - ৪৫ পৃ.
৫. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী - ১ম খণ্ড, ৩৮০ পৃ.
৬. রগবাতুল আমাল - ৭ম খণ্ড, ২২৪ পৃ. 
৭. আল মুসতাদৃক - ৩য় খণ্ড, ২৪১ পৃ.