03/09/23

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

 হযরত আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর জীবনী

“এমন কোনো ব্যক্তিকে ধূলি বহন করেনি এবং কোনো সবুজ পাতা ছায়া প্ৰদান করেনি যে আবু যর থেকে অধিক সত্যবাদী।" [তাঁর শানে রাসূল-এর বাণী]

ওয়াদ্দান উপত্যকা, যেখানে গিফার গোত্র বাস করত। আর মক্কা থেকে বহির্বিশ্বে যাওয়ার একমাত্র পথ ছিল এই ওয়াদ্দান উপত্যকা । মক্কা থেকে সিরিয়ার দিকে আসা-যাওয়ার পথে বিভিন্ন ব্যবসায়ী কাফেলা যা কিছু তাদের দিয়ে যেত তারা তা দিয়ে জীবনযাপন করত। অনেক সময় তারা কাফেলার পথ বন্ধ করে দিত যদি কাফেলার লোকেরা তাদেরকে ঠিক মতো যাতায়াতের কর না দিত । জুনদুব বিন জুনাদা সেই গিফার নামক গোত্রের সন্তান। কিন্তু সাহসীকতা, জ্ঞান- গরিমা ও দূরদৃষ্টির দিক দিয়ে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলেন। তাঁর গোত্রের লোকেরা আল্লাহর ইবাদত বাদ দিয়ে মূর্তিপূজা করত, তিনি তা খুব ঘৃণা করতেন। আরবদের ধর্মের বিভিন্ন কুসংস্কার দিকগুলো তাঁর কাছে খুব খারাপ লাগতো। তিনি এক নতুন দ্বীনের অপেক্ষায় ছিলেন যা হবে জ্ঞানসম্মত এবং বিবেকের দ্বারা স্বীকৃত। যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসবে, অত্যাচার ও অবিচার থেকে ন্যায়ের পথে নিয়ে আসবে । তাঁকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি, ইতিমধ্যেই তিনি নবী করীম-এর কথা শুনতে পান। তিনি তার ভাইকে বললেন: তুমি মক্কাতে যাও এবং সেখানে গিয়ে যে লোক নিজেকে নবী দাবি করে এবং আসমান থেকে তাঁর নিকটে অহী আসে বলে তাঁর সম্পর্কে জেনে আস। তুমি তাঁর কথা শুনবে আর তা এসে আমাকে বলবে।
তাঁর ভাই আনীস মক্কায় গিয়ে রাসূল-এর সাথে দেখা করল এবং তাঁর কথা শুনলো। তারপর সে তার এলাকায় ফিরে এসে তার ভাইয়ের সাথে দেখা করল।

আবু যর গিফারী তাঁর ভাই আনীসকে খুব আগ্রহের সাথে নবী করীম-এর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল।
আনীস বলল: আল্লাহর শপথ! আমি তাকে দেখেছি তিনি একজন উত্তম চরিত্রের মানুষ । তিনি এমন এমন কথা বলেন যা কবিতার মতো । তিনি বললেন: মানুষ তাঁর সম্পর্কে কি বলে? সে বলল: তারা বলে- তিনি হচ্ছেন একজন জাদুকর, গণক ও কবি ।আবু যর বললেন: আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর কাছে যাব এবং তাঁর কাজ দেখব । সে বলল: অবশ্যই, তবে তুমি মক্কার অধিবাসীদের থেকে সাবধানে থেকো । হযরত আবু যর তার বাহন প্রস্তুত করলেন, তিনি তাঁর সাথে ছোট পানির একটি পাত্র নিলেন। এরপর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। যাতেকরে তিনি রাসূল -এর সাথে দেখা করতে পারেন এবং রাসূল-এর সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারেন। আবু যার গিফারী কামাল অবশেষে মক্কা গিয়ে পৌঁছলেন। কিন্তু তিনি মনে মনে মক্কাবাসীদেরকে ভয় করতে লাগলেন। কেননা তিনি জানতে পেরেছেন কোরাইশরা মুসলমানদের ওপর ক্ষুব্ধ। মক্কায় কেউ যদি ইসলামের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করত তাকে তারা কঠিন শাস্তি দিত । আর এ কারণে তিনি কাউকে মুহাম্মদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভয় করেছেন। কেননা তিনি তো জানেন না, কে তাঁর অনুসারী আর কে তাঁর বিরোধী । যখন রাত ঘনিয়ে আসল তিনি মসজিদে শুয়ে ছিলেন, তাঁর পাশ দিয়ে হযরত আলী গমন করেন। আলী যদি তাঁকে দেখতে পেয়ে বুঝতে পারলেন তিনি অন্য দেশের লোক ।

আলী বললেন: এই যে ভাই, আপনি আমাদের ঘরে চলুন । তিনি তাঁর সাথে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। যখন সকাল হলো তিনি তাঁর পানি ও খাদ্য নিয়ে মসজিদে চলে গেলেন, কিন্তু তারা একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি । তারপর তিনি দ্বিতীয় দিনও এভাবে কাটালেন, কিন্তু রাসূল-কে তিনি চিনতে পারেননি। সন্ধ্যা হয়ে গেলে তিনি মসজিদেই থাকার প্রস্তুতি নেন। আগের দিনের মতো হযরত আলী মনিকার তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন: লোকটির কি তার থাকার জায়গা চিনার সময় হয়নি। একথা শুনে তিনি হযরত আলীর সাথে তাঁর বাড়িতে গেলেন এবং তাঁর ঘরে রাত কাটালেন। দ্বিতীয় দিনও তাঁরা একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না । তৃতীয় দিন আলী বলেছেন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কেন মক্কায় এসেছেন তা কি আমাকে বলবেন না?
তিনি বললেন: আপনি যদি আমাকে ওয়াদা দেন আমি যা খুঁজতে এসেছি তা দেখিয়ে দিবেন তাহলে বলব। হযরত আলী তাঁকে ওয়াদা দিলেন। তিনি বললেন: আমি মক্কা নগরীতে অনেক দূর থেকে এসেছি নতুন নবীর সাথে দেখা করার জন্যে এবং তাঁর কাছ থেকে কিছু কথা শুনার জন্যে । তাঁর এই কথা শুনে হযরত আলীর মন আনন্দে নেচে উঠে। হযরত আলী বললেন: নিশ্চয়ই তিনি সত্য নবী, নিশ্চয়ই ...... নিশ্চয়ই। সকালে আপনি আমার সাথে তাঁর কাছে যাবেন। 

যখন আমি ক্ষতিকর কিছু দেখব আমি দাঁড়িয়ে যাব এবং পেশাব করার অভিনয় করব আর যখন আমি হাঁটতে থাকব আপনি আমার অনুসরণ করে হাঁটবেন। হযরত আবু যর গিফারীর যেন রাতটি কাটছিল না। তাঁর কাছে অন্যান্য রাত থেকে এই রাতটি অনেক লম্বা মনে হচ্ছিল। তিনি সারা রাত অপেক্ষা করছিলেন কখন সকাল হবে আর রাসূল-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হবে এবং তাঁর নিকটে আসা অহী থেকে কিছু শুনবেন। রাতের অন্ধাকার দূর হয়ে যখন সকাল হলো হযরত আলী তাঁর মেহমানকে নিয়ে রাসূল-এর ঘরের দিকে রওয়ানা দিলেন। হযরত আবু যর তুমি তার অন্য কোনো দিকে দৃষ্টিপাত না করে তাঁকে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। অবশেষে তাঁরা নবী করীম এর নিকটে গিয়ে পৌঁছলেন । হযরত আবু যর শুনিয়া বললেন: আস্সালামু আলাইকুম । রাসূল বললেন: ওয়ালাইকুমুসালাম ওয়া রাহমুতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ। হযরত আবু যর ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যে রাসূল -কে সালামের দ্বারা অভিবাদন করেছিলেন। তারপর তা মুসলমান সমাজে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। রাসূল তাঁকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করলেন এবং তাঁকে কোরআন পাঠ করে শুনালেন। তিনি আর সামান্য দেরি না করে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে চতুর্থ নাম্বার কিংবা পঞ্চম নাম্বার ব্যক্তি । আমরা এর পরবর্তী ঘটনা আবু যর গিফারীর নিজ মুখে বর্ণিত হাদীস থেকে তুলে ধরলাম। তিনি বলেন: আমি এরপর রাসূল-এর সাথে মক্কায় অবস্থান করলাম এবং তিনি আমাকে ইসলামের বিভিন্ন মাসয়ালা-মাসায়েল শিক্ষা দিলেন। তাছাড়াও তিনি আমাকে কোরআনের কিছু আয়াতও শিখিয়ে দিলেন। আর বললেন: তুমি তোমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে মক্কার কাউকে বলবে না। কেননা আমি ভয় করছি তারা তোমাকে মেরে ফেলবে ।

আমি বললাম: আল্লাহর শপথ! আমি কোরাইশদের সামনে সত্যের পক্ষে চিৎকার দিয়ে না বলে মক্কা ছেড়ে যাব না । একথা শুনে রাসূল  চুপ হয়ে গেলেন । এরপর আমি মসজিদের কাছে আসি, তখন কোরাইশরা মসজিদের পাশে বসে গল্প করছিল। আমি তাদেরকে ডেকে উচ্চ আওয়াজে বললাম: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল । আমার কথা শেষ না হতেই তারা সবাই আমার দিকে তেড়ে আসল। তারা বলতে লাগল- তোমাদের দায়িত্ব এই ধর্মত্যাগীর বিচার করা। তারা আমাকে হত্যা করার জন্য মারতে শুরু করল । এমন সময় রাসূল -এর চাচা হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব আমাকে এসে ধরল। তিনি আমাকে রক্ষা করার জন্যে আমার ওপর ঝুঁকে পড়লেন আর তিনি তাদের দিকে ফিরে বললেন: তোমাদের ধ্বংস হতো। তোমরা গিফার গোত্রের লোককে হত্যা করতেছ? অথচ তোমাদের কাফেলা তাদের এলাকা দিয়ে গমন করে। সুতরাং তোমরা তা থেকে বিরত থাক । তারপর আমি সেখান থেকে রাসূল -এর নিকটে যাই । তিনি আমাকে দেখে বললেন: তোমার ইসলাম সম্পর্কে বলার ব্যাপারে আমি তোমাকে নিষেধ করিনি? আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমার মনের আকাঙ্ক্ষা ছিল তা আমি পুরো করেছি। তিনি বললেন: তোমার ওপর দায়িত্ব তুমি যা শুনেছ, যা দেখেছ তোমার জাতিকে তা বলা এবং তুমি তাদেরকে সত্যের পথে ডাকা। সম্ভবত আল্লাহ তাআলা তোমার দ্বারা তোমার জাতিকে উপকৃত করবেন এবং তোমাকে এর প্রতিদান দান করবেন। যখন তুমি সংবাদ পাবে আমি প্রকাশ্যে কাজ করতেছি তখন তুমি আমার কাছে আসবে।

হযরত আবু যর গিফারী বললেন: এরপর আমি আমার এলাকায় চলে আসি। আমার ভাই আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বলল: আপনি কি করেছেন? আমি বললাম: আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং তাঁকে সত্যায়িত করেছি। কিছুক্ষণ না যেতে আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে প্রশস্ত করে দেন । সে বলল: আমার কি হলো আমি তোমার দ্বীন থেকে কেন বিমুখ হব? আমিও ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং বিশ্বাস করলাম ।
এরপর আমার মা আমার নিকটে আসে, আমি তাঁকেও ইসলামের দাওয়াত দিই । তিনিও বললেন: আমার কি হলো তোমার দ্বীন থেকে কেন বিমুখ হব? আমিও ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং বিশ্বাস করলাম । সেদিন থেকে আমাদের ঈমানী পরিবার ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকে । আমরা কখনো এতে ক্লান্ত ও বিরক্ত হতাম না। অবশেষে গিফার গোত্রের অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করল। আর তখন থেকে আমরা সেখানে নামাজ কায়েম করা শুরু করলাম । আর একদল লোক বলল: রাসূল যখন মদিনায় আগমন করবে আমরা তখন ইসলাম গ্রহণ করব। অবশেষে রাসূল যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন তারা ইসলাম গ্রহণ করল । রাসূল বললেন: আল্লাহ তাআলা গিফারীদেরকে ক্ষমা করেছেন, তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। হযরত আবু যর গিফারী বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ হওয়া পর্যন্ত তাঁর নিজ এলাকায় ছিলেন। খন্দকের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি মদিনায় হিজরত করেন এবং নিজেকে রাসূল -এর খিদমতে নিয়োজিত করেন। তিনি রাসূল -এর খিদমত করার অনুমতি চান। রাসূল অনুমতি দিয়ে তাঁকে ধন্য করেন। রাসূল  তাঁকে অন্যান্যদের ওপর প্রাধান্য দিতেন এবং যখনি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হতো তিনি মুচকি হাসি দিয়ে তাঁর সাথে মুসাফাহ্ করতেন।

রাসূল -এর ইন্তেকালের পর তিনি আর মদিনায় থাকতে পারেননি। কেননা রাসূল -কে ব্যতীত তাঁর কাছে মদিনা খালি খালি লাগত। তিনি এই শোকে মদিনা ত্যাগ করে সিরিয়ার এক গ্রাম্য অঞ্চলে চলে যান। তিনি সেখানে হযরত আবু বকর ও উমর -এর খেলাফত পর্যন্ত অবস্থান করেন। হযরত উসমান এর শাসনামলে তিনি দেখতে পান মানুষ দুনিয়াবী হয়ে গেছে এবং অতিরিক্ত অপচয় করছে। তিনি এ ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করতেন এবং সম্পদ সঞ্চিত করতে নিষেধ করতেন। এ কারণে হযরত উসমান তাঁকে মদিনায় ডেকে নেন। খলীফার কথামতো তিনি মদিনায় আগমন করেন। তিনি সেখানেও মানুষকে দুনিয়া বিরাগী হওয়ার প্রতি আহ্বান করা শুরু করেন, কিন্তু তা মানুষের নিকটে কঠিন মনে হয়। আর তাই মানুষ তাঁর ব্যাপারে খলীফার কাছে নালিশ করে। অবশেষে খলীফা তাঁকে রবাজা নামক স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। রবাজা হচ্ছে মদিনার ছোট একটি গ্রাম । তিনি সেখানে চলে গেলেন এবং সমাজ থেকে অনেক দূরে গিয়ে অবস্থান করলেন। তিনি দুনিয়া বিরাগী হয়ে থাকতে লাগলেন এবং রাসূল -এর নির্দেশমতো জীবন পরিচালনা করতে লাগলেন। একদিন এক লোক তাঁর ঘরে প্রবেশ করে সবকিছু দেখল, কিন্তু সে ঘরে কোনো আসবাবপত্র না পেয়ে জিজ্ঞেস করল তোমাদের আসবাবপত্র কোথায়? তিনি বললেন: আমাদের সেখানে (আখেরাতে) একটি বাড়ি আছে, আমরা সেখানে আমাদের ভালো ভালো আসবাবপত্র পাঠিয়ে দিই ।

লোকটি তাঁর কথা বুঝতে পেরে বলল: কিন্তু আপনি যতদিন এই ঘরে থাকবেন ততদিন তো এখানে কিছু আসবাবপত্র লাগবে । তিনি উত্তর দিলেন: কিন্তু বাড়ির মালিক আমাদেরকে এখানে রাখবেন না । সিরিয়ার গভর্নর তাঁর জন্য তিন শত দিরহাম পাঠিয়ে তাঁকে বললেন: আপনি এর দ্বারা আপনার প্রয়োজন পূরণ করুন। তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন: সিরিয়ার গভর্নর কি আমার থেকে আর কোনো নিম্নমানের লোক পায়নি ? অবশেষে তিনি বত্রিশ হিজরীতে এই ধূলির ধরা ছেড়ে চির বিদায় নেন ।

আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুক এবং ফিরদাউসে তাঁর চির ঠিকানা করে দিন।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবা - ৪র্থ খণ্ড, ৬২ পৃ.
২. আল ইসতিআ’ব - ৪র্থ খণ্ড, ৬১ পৃ. ।
৩. তাহযীবুত্‌ তাহযীব - ২য় খণ্ড, ৪২০ পৃ.
৪. তাীদু আসমায়িস্ সাহাবা - ২য় খণ্ড, ১৭৫ পৃ. ৷ 
৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ - ১ম খণ্ড, ১৫-১৬ পৃ.
৬. হুলিয়াতুল আওলিয়া - ১ম খণ্ড, ১৫৬-১৭০ পৃ. 
৭. সিফাতুস্ সয়াহ্ - ১ম খণ্ড, ২৩৮-২৪৫ পৃ.। 
৮. ত্বাবাকাতুশ্ শা’রানী - ৩২ পৃ.
৯. আল মাআ'রিফ - ১০০-১১১ পৃ.।
১০. শাযারুয্ যাহাব - ১ম খণ্ড, ৩৯ পৃ.। 
১১. আল ইবরু - ১ম খণ্ড, ৩৩ পৃ. ।
১২. যুআমাউল ইসলাম - ১৬৭-১৭৩ পৃ. ।

সাহাবী হযরত আদী বিন হাতেম আত্তায়ী 
রাদিয়াল্লাহু আনহু এর জীবনী


“তারা যখন কুফরী করেছে তুমি তখন ঈমান এনেছ, তারা যখন অস্বীকার করেছে তুমি তখন স্বীকার করেছ, তারা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তুমি তখন কথা পূর্ণ করেছ, তারা যখন পিছু হটেছে তুমি তখন সামনে এগিয়ে গিয়েছ।” [হযরত উমর] 

নবম হিজরীতে আরবের সকল নেতা ইসলাম গ্রহণের দিকে এগিয়ে আসল যদিও তারা এতদিন রাসূল -এর বিরোধিতা করেছিল। তারা রাসূল এর বশ্যতা শিকার করে নেয় যদিও তারা এতদিন রাসূল -এর অবাধ্য হয়েছিল। আমরা এখন আপনাদের নিকটে তেমনি একজন নেতার জীবনকাহিনী বর্ণনা করব। যিনি প্রথমে রাসূল -এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু পরে রাসূল -এর নিকটে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি আর কেউ নয়, তিনি হচ্ছেন হযরত আদী বিন হাতেম আত্তায়ী । তাঁর পিতা এতই দানশীল ছিলেন যে তাঁকে মানুষ দানশীলতার উদাহরণ হিসেবে পেশ করত । তাঁর নামটি কি আপনি জানেন? অবশ্যই জানেন। কেননা ছোটবেলা থেকে আমরা বড়দের মুখে দানশীলতার উদাহরণ হিসেবে যে নামটি শুনতাম। “হাতেম তায়ী” । আদী বিন হাতেম যুক্তি-এর পিতা ছিলেন তায়ী গোত্রের রাজা। আর এই সূত্র ধরে তিনি তাঁর পিতার পরে সেই গোত্রের রাজা হলেন । রাসূল যখন ইসলামের দিকে বিভিন্ন অঞ্চলের রাজাদেরকে আহ্বান করলেন আদী বিন হাতেম আলী তখন রাসূল -এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। তিনি ধারণা করলেন রাসূল -এর ডাকে সাড়া দিলে তাঁর রাজত্ব চলে যাবে। তিনি রাজ্যহারা হয়ে যাবেন। আর এ সকল কারণে তিনি রাসূল কে না দেখেই তাঁর চরম বিরোধিতা শুরু করেন এবং তাঁকে তীব্র ঘৃণা করতে লাগলেন ।

তিনি দীর্ঘ বিশ বছর রাসূল সমাহার ও ইসলামের বিরোধিতা করেন, কিন্তু তিনি সারা জীবন ইসলামের বিরোধিতা করতে পারেননি। কেননা আল্লাহর ইচ্ছা তিনি তাঁকে ইসলামের বুঝ দান করবেন। আর তাই অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেদায়েতের বুঝ দান করেছেন । হযরত আদী বিন হাতেম -এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনীটি ভুলার মতো নয় । আর তাই আমরা তাঁর নিজের মুখে বর্ণিত সেই ঘটনাটি আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম । তিনি বলেন: আমি আরবদের মধ্যে রাসূল  -কে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতাম। রাসূল কে আমার থেকে বেশি আর কেউ ঘৃণা করত না । আমি একজন ভদ্র ব্যক্তি ছিলাম। আর ধর্মীয় দিক দিয়ে আমি খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ছিলাম। যখন আমি রাসূল এর কথা জানতে পারি তখন থেকে আমি তাঁকে ঘৃণা করতে লাগলাম । অন্যদিকে রাসূল এর কাজের পরিধি বাড়তে লাগল, তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং তাঁর সৈন্যবাহিনী আরবের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল । তখন একদিন আমি আমার গোলাম যে আমার উট চরাতো তাকে বললাম: তুমি আমার জন্য কিছু উট প্রস্তুত রেখ যা দিয়ে সহজে ভ্রমণ করা যাবে। যদি তুমি শুনতে পাও মুহাম্মদের কোনো বাহিনী এ এলাকায় আসছে তুমি সাথে সাথে আমাকে তা জানাবে।

একদিন সকালে গোলামটি আমার নিকটে এসে বলল: আপনি যদি কোনো কিছু করতে চান তাহলে এখনই করুন? আমি বললাম: কেন? সে বলল: আমি কিছুক্ষণ আগে একটি বাহিনী দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? তারা বলল: এরা হচ্ছে মুহাম্মদের বাহিনী । আমি তাকে বললাম: আমার বাহন প্রস্তুত কর। তারপর আমি আমার পরিবারের লোকদেরকে ডেকে আমাদের সফরের কথা বললাম। আমরা সিরিয়াতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। কেননা সেটা ছিল আমাদের ধর্মের মূল ভূমি। তাছাড়া সেখানে গেলে আমাদের স্বধর্মীয় ভাইদের সাথে মিলিত হতে পারব। আমার পরিবারের সকলের থেকে আমি বেশি তাড়াহুড়া করতে লাগলাম। যখন আমরা বিপজ্জনক এলাকা পার হলাম তখন আমি আমাদের পরিবারের সকল সদস্যের খোঁজ নিতে লাগলাম। খুঁজে দেখলাম আমি আমার বোনকে নজদ এলাকায় অন্যান্য লোকদের সাথে রেখে এসেছি। এখন যে আমি গিয়ে তাকে নিয়ে আসব সে রকম কোনো পথ ছিল না । এরপর আমরা যারা ছিলাম তারা সিরিয়াতে গিয়ে পৌঁছি এবং আমাদের স্বধর্মীয় ভাইদের সাথে অবস্থান করতে থাকি। আর অন্যদিকে আমি আমার বোনের ব্যাপারে যে ভয় করেছি তা ঘটে গেল। ওই দিকে আমার নিকটে খবর পৌঁছে মুহম্মদের বাহিনী আমাদের এলাকায় আক্রমণ করে আমার বোনসহ সবাইকে বন্দি করে নিয়ে গেছে।

বন্দিদের সাথে আমার বোনকেও রাখা হলো। রাসূল বন্দিদেরকে হেঁটে হেঁটে দেখতে ছিলেন। যখন তিনি আমার বোনের নিকটে আসলেন..... আমার বোন বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা মারা গেছে আর আমার প্রতিনিধি পালিয়ে গেছে; সুতরাং আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিন আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করবেন । রাসূল বললেন: তোমার প্রতিনিধি কে? সে বলল: আদী বিন হাতেম আত্তায়ী । তিনি বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে পলায়নকারী । রাসূল তাকে ওই অবস্থায় রেখে চলে গেলেন ।

পরের দিন যখন রাসূল আবার আসলেন সে আবার একই কথা বলল এবং রাসূল পানাহার তাকে একই উত্তর দিলেন। পরের দিন রাসূল আবার আসলে সে নিরাশ হয়ে আর কিছু বলেনি। কিন্তু তার পিছনের একটি লোক তাকে ইশারা করে কিছু বলার জন্য তখন দাঁড়ালো এবং বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা মারা গেছে আর আমার প্রতিনিধি পালিয়ে গেছে; সুতরাং আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিন আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করবেন। রাসূল বললেন: আমি তা করেছি। সে বলল: আমি সিরিয়ায় আমার পরিবারের সাথে মিলিত হতে চাই । তিনি বললেন: কিন্তু এতে তুমি তাড়াহুড়া করবে না যতক্ষণ না কোনো বিশ্বস্ত লোক না পাওয়া যায়। যে তোমাকে সিরিয়াতে পৌঁছে দিবে। সুতরাং যখন তুমি কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি পাবে তখন আমাকে জানাবে । রাসূল সালাত যখন চলে গেলেন সে জিজ্ঞেস করল কোন ব্যক্তি তাকে কথা বলার জন্য ইশারা করেছে। জবাবে তারা বলল: আলী বিন আবী জ্বালিব। তারপর সে সেখানে অবস্থান করতে লাগল। অবশেষে তাকে নেওয়ার জন্য এক দল লোক আসল । সে রাসূল এর নিকটে এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রের একদল লোক আমাকে নেওয়ার জন্যে এসেছে। তারা অনেক বিশ্বস্ত এবং শক্তিশালীও যারা আমাকে সিরিয়াতে পৌছিয়ে দিতে পারবে। রাসূল তাকে উত্তম কাপড়ে সজ্জিত করে দিলেন, তার চলার জন্য তাকে একটি উট বাহন হিসেবে দিলেন এবং তার সফরের সব খরচ দিয়ে দিলেন। তারপর সে তাদের সাথে রওয়ানা হলো । আদী বিন হাতেম বললেন: আমার বোনের ব্যাপারে যে সকল সংবাদ শুনতে পেলাম সেই অনুযায়ী তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু মুহাম্মদ  তার প্রতি যে দয়া এবং সদ্ব্যবহারের যে কথাগুলো শুনেছি তা কোনো ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

আল্লাহর শপথ! আমি যখনই কোনো উটের মধ্যে পালকি দেখতাম আমি সেদিকে ছুটে যেতাম। তেমনি একটি কাফেলা আসতে দেখে আমি ছুটে গিয়ে বললাম: হাতেমের কন্যা? পালকির ভেতর থেকে সে বলল: আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী আর জালিম । তুমি তোমার স্ত্রী আর কিছু সন্তান নিয়ে চলে এসেছ আর বাকিদেরকে রেখে এসেছ। আমি বললাম: হে আমার বোন! তুমি আমার ব্যাপারে কোনো খারাপ কিছু বলবে না। আমি তাকে বিভিন্ন কথা দ্বারা সন্তুষ্ট করতে লাগলাম । সে আমার নিকটে তার সাথে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার বিবরণ দিল। তার বলা ঘটনাগুলো আমার নিকটে আসা সংবাদের সাথে পুরোটাই মিলে গেছে । আমি তাকে বললাম: সেই (মুহাম্মদ) ব্যক্তিকে তোমার কেমন মনে হয়েছে? সে বলল: তুমি অবশ্যই তাড়াতাড়ি তাঁর সাথে দেখা করবে যদি তিনি নবী হয়ে থাকেন তাহলে তো তা তোমার জন্য কল্যাণ নিয়ে আসবে! আর যদি তিনি নবী না হয়ে রাজাও হয়ে থাকেন তাহলেও তুমি তাঁর কাছে লাঞ্ছিত হবে না । আদী বিন হাতেম বলেন: তারপর আমি আমার বাহনকে প্রস্তুত করে মুহাম্মদ এর কাছে রওয়ানা দিলাম। অবশেষে আমি রাসূল এর নিকটে এসে পৌঁছলাম। ইতোমধ্যে আমি শুনতে পেয়েছি রাসূল বলেছেন: আমি অবশ্যই আশা করি আল্লাহ তাআলা আমার হাতে আদী বিন হাতেমের হাত রাখবেন ।

তিনি তখন মসজিদে ছিলেন। আমি তার নিকটে প্রবেশ করি এবং তাঁকে সালাম দিই। তিনি বললেন: লোকটি কে? আমি বললাম: আদী বিন হাতেম । তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসলেন এবং আমার হাত ধরে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। আল্লাহর শপথ! তিনি যখন আমাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময় পথে এক দুর্বল মহিলার সাথে দেখা হয়। সেই মহিলার সাথে তার একটি ছোট বাচ্চাও ছিল। তিনি তার প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলতে শুরু করেন। তার প্রয়োজন পুরো করা পর্যন্ত তিনি তাকে সময় দিলেন আর আমি তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম । এই দৃশ্য দেখে আমি মনে মনে বলতে লাগলাম- আল্লাহর শপথ! এই লোক কোনো রাজা হতে পারে না । তারপর তিনি আমার হাত ধরে তার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে আসার পর তিনি আমাকে বসার জন্য একটি আঁশভর্তি চামড়ার বলিশ দিয়ে বললেন: এতে বস।
আমি তাতে বসতে লজ্জাবোধ করলাম। আমি বললাম: বরং আপনি বসেন। তিনি বললেন: না তুমি বস ।
অবশেষে আমি তাঁর কথা মতো তাতে বসলাম। আর তিনি মাটিতে বসলেন কেননা ঘরে ওটি ব্যতীত বসার জন্য আর কিছুই ছিল না । আমি মনে মনে বললাম: আল্লাহর শপথ! এই রকম অবস্থা কোনো রাজার হতে পারে না । তারপর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন : তুমি মিরবা নামক জায়গা দিয়ে সফর করার সময় এমন কিছু জিনিস গ্রহণ করেছ যা তোমার ধর্ম অনুযায়ী তোমার জন্য হালাল ছিল না।
আমি বললাম: হ্যাঁ, তাঁর এই কথার দ্বারা আমি বুঝতে পারলাম তিনি সত্যিই একজন নবী ।

তিনি বললেন: হে আদী! সম্ভবত তুমি এই ধর্ম গ্রহণ করছ না মুসলমানদের অভাব ও দারিদ্র্যতা দেখে। আল্লাহর শপথ! অচিরেই মুসলমানদের সম্পদ মতো বেশি হবে যে, সকাহ্ গ্রহণ করার মতো কোনো লোক পাওয়া যাবে না । হে আদী! সম্ভবত তুমি এই ধর্ম গ্রহণ করছ না মুসলমানদের সংখ্যা কম দেখে এবং তাদের শত্রু বেশি দেখে। আল্লাহর শপথ! অচিরেই এমন হবে যে, কোনো মহিলা থেকে তুমি শুনতে পাবে সে সুদূর কাদেসিয়া থেকে উটে করে এই ঘর জিয়ারত করতে আসবে, কিন্তু পথে সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করবে না। সম্ভবত তুমি এই ধর্ম গ্রহণ করছ না এই কারণে যে, তুমি দেখছ রাজত্ব অমুসলিমদের হাতে। আল্লাহর শপথ! অচিরেই তুমি শুনতে পাবে বাবেলের শুভ্র সে ভবনটি মুসলমানরা বিজয় করেছে এবং কিসরা বিন হরমুজের ধন ভাণ্ডার মুসলমানদের করতলে চলে এসেছে । আমি বললাম: কিসরা বিন হরমুজের ধন ভাণ্ডার? তিনি বললেন: হ্যাঁ, কিসরা বিন হরমুজের ধন ভাণ্ডার । হযরত আদী বললেন: তখন আমি সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করি । হযরত আদী বিন হাতেম মি অনেক লম্বা হায়াত পেয়েছেন। তিনি বলতেন:রাসূল আমাকে যে তিনটি কথা বললেন তার দুইটি বাস্তবায়ন হয়েছে। আল্লাহর শপথ তৃতীয় কথাও বাস্তবায়ন হবে। আমি এক মহিলাকে দেখেছি সে সুদূর কাদেসিয়া থেকে উটে করে এই ঘর জিয়ারত করতে এসেছে, কিন্তু পথে সে এক আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করেনি। আমি সেই বাহিনী প্রথম সারিতে ছিলাম যারা কিসরা বিন হরমুজের ধন ভাণ্ডার বিজয় করে নিয়ে এসেছে।

আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় রাসূল এর তৃতীয় কথাটিও তাঁর জীবনে বাস্তবায়ন হয়েছে। যা ঘটেছে খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীয-এর খেলাফত আমলে। মুসলমানদের সম্পদ মতো বেশি হয়েছে যে, এক ব্যক্তি ঘোষণা দিল কে আছ যাকাতের মাল নিবে? কিন্তু যাকাতের মাল নেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি।
আল্লাহ তাআলা রাসূল-এর কথা সত্যায়িত করেছেন আর আদী বিন হাতেম আলী কসমকে পূর্ণ করেছেন।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবা - ২য় খণ্ড, ৪৬৮ পৃ.।
২. আল ইসতিআ'ব - ৩য় খণ্ড, ১৪০ পৃ.।
৩. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী - ৩য় খণ্ড, ৪৬-৪৮ পৃ.। 
৪. তাহযীবুত্ তাহযীব - ৭ম খণ্ড, ১৬৬-১৬৭ পৃ.
৫. আল জামউ বায়না রিজালিস্ সহীহাইন – ১ম খণ্ড, ৩৯৮ পৃ.
৬. খুলাসাতু তাহীবিত্ তাহযীবিল কামাল - ২৬৩-২৬৪ পৃ.। 
৭. তাজরীদু আসমায়িস্ সাহাবা - ২য় খণ্ড, ১৬ পৃ. 
৮. তাক্বরীবুত্ তাহযীব - ২য় খণ্ড, ১৬ পৃ.।
৯. আল ইবরু - ১ম খণ্ড, ৭৪ পৃ.।
১০. আত্ তারীখুল কাবীর – ১ম খণ্ড, ৪৩ পৃ. ।
১১. উসদুল গবাহ - ৩য় খণ্ড, ৩৯২-৩৯৪ পৃ.।
১২. শাঘ্রাতুয্ যাহাব - ১ম খণ্ড, ৭৪ পৃ.। 
১৩. আল মাআ'রিফ - ১৩৬ পৃ.
১৪. আল মুআম্মারুন - ৪৬ পৃ. । 
১৫. ইবনু কাছীর - ৫ম খণ্ড ৬৫ পৃ. 
১৬. ফাহুল বারী - ৬ষ্ঠ খণ্ড ২১০ পৃ. । 
১৭. দালায়িলুল নুবুওয়্যাহ্ - ৪৭২ পৃ.।

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.