হযরত সালমান আল ফারেসী (রাঃ) এর জীবনী
“ঈমান যদি সুরাইয়াতেও থাকতো তাহলেও এদের মতো কিছু লোক তা অর্জন করত” [রাসূল সালমান -এর পিঠে হাত রেখে এই কথা বলেন]
এই জীবনীটি এমন এক ব্যক্তির জীবনী যিনি সারা জীবন সত্যকে পাওয়া জন্যে দিক দিগন্তে ছুটেছেন। যিনি সারা জীবন সত্যকে অনুসন্ধান করতে করতে অতিবাহিত করেছেন। সে মহান ব্যক্তি হচ্ছেন হযরত সালমান ফারেসী আমরা তাঁর নিজ মুখের বর্ণিত আত্মজীবনী আপনাদের সামনে তুলে ধরব। যেকোনো ব্যক্তির সম্পর্কে অন্যের বর্ণনার থেকে তাঁর নিজ বর্ণনাটি অধিক সত্য ও সঠিক বর্ণনা ৷ প্রিয় পাঠক! তাঁর আত্মজীবনী এতটাই অবাক করার মতো, যা সবার হৃদয়কে স্পর্শ করে। তিনি বলেন : আমার বাড়ি ইস্পাহানের অন্তর্গত জাইয়ান নামক গ্রামে অবস্থিত। আমার পিতা গ্রামের মাতব্বর ছিলেন। আমার পরিবার খুব ধনী ছিল এবং সমাজে আমদের অবস্থান খুব ভালো ছিল। জন্মের পর থেকে আমি আমার পিতার নিকট আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি ছিলাম। ধীরে ধীরে আমি সকলের নিকটে অধিক প্রিয় হতে লাগলাম।
আমার প্রতি সকলের দৃষ্টি আলাদা, কিন্তু এ কারণে আমার পিতা-মাতা আমার ব্যাপারে ভয় করতে লাগল । তাই তারা আমাকে ঘরের বাইরে যেতে দিত না যেমনিভাবে মেয়েদেরকে ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না । আমি তখন খুব বেশি অগ্নিপূজা করতাম। আমার এমন আগ্রহ দেখে তারা আমাকে অগ্নিজ্বালক হিসেবে নিয়োজিত করে। আমার দায়িত্ব ছিল দিনে বা রাতের সামান্য মুহূর্তের জন্যেও যেন এই আগুন নিভে না যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখা ।আমার বাবার বিশাল শস্য খামার ছিল। যা থেকে আমরা অনেক ফসল পেতাম। আমার বাবা তা দেখাশুনা করতেন এবং সংরক্ষণ করতেন। একদিন তাকে কোনো এক কাজে অন্য এক গ্রামে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তিনি আমাকে বললেন: হে আমার ছেলে! আমারতো এক জায়গায় যেতে হবে; সুতরাং তুমি বাগানে যাও এবং আমার কাজটি আজ তুমি করে দাও । আমি বাগানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলোমি। যাওয়ার পথে খ্রিস্টানদের একটি গির্জা দেখতে পেলাম। আমি তাদের নামাজ আদায় করার পদ্ধতি দেখতে পেয়েছি। আর তা আমার মনোযোগ কেড়ে নিল ।
আমি খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মের ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতাম না । কেননা আমাকে আমার বাবা-মা ছোটবেলা থেকে ঘরের বাইরে যেতে দেননি। আমি তাদের আওয়াজ শুনে তারা কি করে তা দেখার জন্য ভেতরে প্রবেশ করলাম । তাদের নামাজের পদ্ধতি দেখে আমি খুবই মুগ্ধ হলাম এবং তাদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম । আমি মনে মনে বললাম: আল্লাহর শপথ! আমার যা করি তা থেকে এটি অনেক উত্তম। আল্লাহর শপথ! আমি আমার বাবার খামারে না গিয়ে সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত তাদের সাথেই ছিলাম। তারপর আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম- এ ধর্মের মূল কোথায় অবস্থিত। তারা বলল: সিরিয়ায় । যখন রাত ঘনিয়ে আসে আমি বাড়িতে ফিরে আসি। বাড়ি ফিরার পর আমার বাবার সাথে দেখা হলে আমি কি কি করেছি সে সম্পর্কে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন।
আমি বললাম: বাবা! আমি যাওয়ার পথে কিছু মানুষকে দেখলাম তারা গির্জায় নামাজ আদায় করছে। তাদের সেই নামাজ আমাকে মুগ্ধ করেছে তাই আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম । আমার বাবা একথা শুনে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি বলতে লাগলেন হে আমার সন্তান! ওই ধর্ম উত্তম নয়........; বরং তোমার ও তোমার বাপ-দাদার ধৰ্মই উত্তম।আমি বললাম: কখনো না; বরং তাদের ধর্ম আমাদের ধর্ম থেকে উত্তম । আমার বাবা আমার কথা শুনে আমার ব্যাপারে ভয় করতে লাগলেন, না জানি আমি বাপ-দাদার ধর্ম থেকে দূরে সরে যাই। তাই তিনি আমাকে পায়ে শিকল দিয়ে বাড়িতে আটকে রাখলেন।
আমি সুযোগ পেয়ে খ্রিস্টানদের নিকটে এক লোককে প্রেরণ করে বললাম: যখন সিরিয়ার দিকে কোনো কাফেলা রওয়ানা করবে তখন আমাকে জানাবে । কিছুদিন না যেতে তারা আমাকে জানাল সিরিয়ার দিকে এক কাফেলা রওয়ানা হবে। আমি আমার পায়ের শিকল জোর করে খুলতে চেষ্টা করি এবং অবশেষে আমি খুলে ফেলতে সক্ষম হই। এরপর আমি খুব গোপনে ঘর থেকে বের হয়ে যাই এবং তাদের সাথে সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছি । বাহন থেকে নামার পর আমি তাদেরকে বললাম: এ ধর্মের সবচেয়ে বড় গুরু কে? তারা বলল: উসকুফ যিনি এই গির্জার প্রধান । আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আমি খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। তাই আমি চাই আপনার খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করব এবং আপনার থেকে এ ধর্মের নিয়ম-কানুন শিখব আর আপনার সাথে নামাজ আদায় করব ।
তিনি বললেন: আস, আমি তাঁর নিকটে গেলাম এবং তাঁর খেদমতে নিয়োজিত হলাম। কিন্তু কিছুদিন পর আমি দেখলাম লোকটি খুব মন্দ। সে মানুষকে আল্লাহর পথে দান করতে উৎসাহিত করত এবং দানের সওয়াব সম্পর্কে বর্ণনা করত, কিন্তু যখন মানুষ দান করত সে তা গরিবদের না দিয়ে নিজের জন্য জমা করে রাখত । এমনকি সে বড় বড় সাতটি কলস স্বর্ণ জমা করে ৷ আর এ কারণে আমি তাকে খুব ঘৃণা করতে লাগলাম। আমি তার মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করলাম। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করার জন্য একত্রিত হলো । আমি তাদেরকে বললাম: তোমাদের গুরু এই লোকটি খুব খারাপ লোক ছিল। সে তোমাদেরকে সকাহ্ দেওয়ার কথা বলত, কিন্তু তোমরা যখন তার কাছে তোমাদের সম্পদ দান করতে সে তা থেকে গরিব মিসকিনদেরকে সামান্য পরিমাণও দান করত না; বরং নিজের জন্য জমা করে রাখত । তারা বলল: তুমি তা কিভাবে জানলে? আমি বললাম: আমি তোমাদেরকে তার জমানো ধনভাণ্ডার দেখাব ।
তারা বলল: হ্যাঁ, তুমি আমাদেরকে তা দেখাও ৷ আমি তাদেরকে তা দেখালাম, তারা সেখান থেকে সাতটি স্বর্ণ-রুপার কলস বের করল। যখন তারা তা দেখল তারা বলল: আল্লাহর শপথ! আমরা তাকে দাফন করব না, এরপর তারা তাকে শূলিতে চড়ায় এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করে ৷ তারপর কিছুদিন না যেতেই তার স্থানে অন্য একজন লোক নিয়োগ করা হয়, আর আমি তাঁর খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করি। আমি তাঁর মতো দুনিয়াবিরাগী এবং আখেরাতমুখী লোক আর দেখিনি। তিনি দিন-রাত ইবাদতে কাটাতেন। আর এ কারণে আমি তাকে খুব ভালোবাসতে শুরু করি এবং দীর্ঘদিন আমি তাঁর খেদমত করে কাটাই। যখন তিনি মৃত্যুর মুখে পতিত হন আমি তাঁকে বললাম: আপনার পর আমি কার নিকটে যাব? তিনি বললেন: আমার জানা মতো কোনো ব্যক্তি এরূপ নেই তবে মুসেলে বসবাসকারী এক ব্যক্তি আছে, সে সত্যের ওপর আছে এবং সত্যকে বিকৃত করে না । যখন তিনি মারা গেলেন আমি মুসেলের সেই ব্যক্তির নিকটে যাই। আমি তাঁর নিকটে আমার সব ঘটনা খুলে বলি। আমি তাঁকে বললাম: উমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার নিকটে আসার জন্যে আদেশ দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন আপনি সত্যের উপরে আছেন। তিনি বললেন: তুমি আমার নিকটে থাক।
তারা বলল: হ্যাঁ আমরা তোমাকে নিয়ে যাব । তারা আমাকে নিয়ে আসল। যখন আমরা ওয়াদিল কুরাতে পৌঁছলাম তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আমাকে এক ইয়াহুদির নিকটে বিক্রি করে দেয়। আমি তার খেদমত করতে থাকি ।
এর কিছুদিন পরে সেই ইয়াহুদিকে তার চাচাতো ভাই দেখতে আসে এবং সে তার থেকে আমাকে ক্রয় করে ইসরিবে নিয়ে আসে। এই শহরে এসে আমি সেই সকল বৈশিষ্ট্যগুলো পেলাম যা যা আম্মুরিয়ার লোকটি আমাকে বলেছিলেন। আর তাই আমি তার সাথে মদিনায় অবস্থান করতে লাগলাম । নবী করীম সাপ্তাহ তখন মক্কার মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে ছিলেন, কিন্তু আমি দাস হওয়ার কারণে সেই খবর পাইনি । এর কিছুদিন পর রাসূল মদিনায় হিজরত করেন। আল্লাহর কসম! আমি খেজুরের গাছের মাথায় কাজ করছিলাম আর আমার মালিক নিচে বসা ছিলেন এমন সময় তার নিকটে তার চাচাতো ভাই এসে বলল: আল্লাহ তাআলা আউস ও খায়ায গোত্রকে হত্যা করত, তারা কোবা নগরীতে এক লোককে স্বাগতম জানানোর জন্যে একত্রিত হয়েছে। তারা ধারণা করে সে লোকটি নবী।
আমি যখন একথা শুনলাম সাথে সাথে আমার জ্বর হওয়ার মতো কম্পন শুরু হয়ে গেল। আমি মতো বেশি কাঁপতে লাগলাম যেন আমি পড়ে যাব। আমি তাড়াতাড়ি নেমে গেলাম এবং তাকে বললাম: আপনি কি বলেছেন? খবরটি আবার বলুন । একথা বলাতে আমার মালিক আমার উপরে খুব রাগান্বিত হয়ে আমাকে খুব জোরে ঘুষি মেরে বললেন: তোমার এর দরকার কি? তুমি তোমার কাজে যাও । যখন সন্ধ্যা হলো আমি আমার জমা করা কিছু খেজুর নিয়ে তার নিকটে রওয়ানা হলাম । আমি তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বললাম: আমি জানতে পেরেছি আপনি খুব সৎলোক । আর আপনার সাথে গরিব অনেক লোক আছে যারা খুব অভাবী। আর এগুলো হচ্ছে আমার কাছে থাকা কিছু সকার খেজুর। আমার ধারণা মতে আপনারাই এর বেশি হকদার। এ কথা বলে আমি তা তাকে দিলাম । তিনি তা নিয়ে তার সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা এগুলো খাও, কিন্তু তিনি তা থেকে কিছুই খেলেন না। আমি মনে মনে বললাম: এটি হচ্ছে প্রথম আলামত ।
তারপর আমি চলে যাই এবং আবার কিছু খেজুর জমা করি। যখন তিনি কোবা থেকে মদিনায় আসেন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আমি দেখেছি আপনি সদ্কাহ্ খান না তাই আমি আপনার জন্যে কিছু হাদিয়া এনেছি। তখন তিনি তা থেকে নিজে খেলেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে খেতে বললেন ।আমি তাঁর নিকটে থাকতে শুরু করলাম এবং তাঁকে ভালো লোক হিসেবেই পেলাম, কিন্তু কিছুদিন পর তিনিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আমি তাঁকে বললাম: হে উমুক! আমি আল্লাহকে পাওয়ার আশায় আপনার নিকটে এসেছি আর আপনি আমার ব্যাপারে সব জানেন, সুতরাং আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার নিকটে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন?
তিনি বললেন: হে বৎস! এমন কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে আমার জানা নেই যে আমার এই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, তবে নসীবীনে এক ব্যক্তি আছে তুমি তার কাছে যেতে পার। তাঁর দাফন-কাফন শেষ হওয়ার পর আমি তাঁর আদেশ মতো সে লোকের কাছে যাই এবং তাঁকে সব খুলে বলি ।
তিনি আমাকে বললেন: তুমি আমার কাছে থাক আমি তাঁর কাছে থাকতে শুরু করলাম এবং আমি তাঁকে ভালো লোক হিসেবে পেলাম। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমি তাঁর কাছে থাকি। তাঁর মৃত্যুশয্যায় আমি তাঁকে বললাম: আপনি তো আমার সম্পর্কে জানেন সুতরাং আপনার পরে আমাকে কার কাছে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন: হে বৎস! আমার জানা নেই এমন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যে আমার এই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, তবে আম্মুরিয়ায় এক ব্যক্তি আছে তুমি তার কাছে যেত পার । আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং আমার সব ঘটনা তাঁকে বললাম । তিনি আমাকে বললেন: তুমি আমার কাছে থাক । আমি তাঁর কাছে থাকতে শুরু করলাম এবং তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমি তাঁর কাছেই থাকি। যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে আসে আমি তাঁকে বললাম: আপনি আমার সম্পর্কে জানেন; সুতরাং আপনি আমাকে কার নিকটে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন: হে বৎস! আমার জানা নেই এমন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যে আমার এই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, কিন্তু একজন নবী আগমনের সময় অনেক নিকটবর্তী। যিনি আরবে আগমন করবেন। যিনি ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্মের ওপর প্রেরিত হবেন। তারপর তিনি দুই পাথরের মধ্যবর্তী খেজুরের বাগানের এলাকায় হিজরত করবেন। তাঁর কিছু আলামত থাকবে সেগুলো তুমি ভুলে যাবে না।
তিনি হাদিয়া খাবেন, কিন্তু সদ্কাহ্ খাবেন না। তাঁর দুই কাঁধের মধ্যখানে মোহরে নবুওয়াত থাকবে। তুমি যদি সেই দেশে যেতে পার তাহলে যাও । তাঁর মৃত্যুর পর আমি আম্মুরিয়াতে কিছুদিন অবস্থান করি। ঠিক সেই সময়ে সেখানে আরবের কোনো এক গোত্র থেকে কিছু লোক ব্যবসা করতে যায় । আমি তাদেরকে বললাম: তোমরা যদি আমাকে আরব দেশে নিয়ে যাও তাহলে আমি তোমাদেরকে আমার এই গরু এবং ছাগল দুইটি দিয়ে দিব। তারা বলল: হ্যাঁ আমরা তোমাকে নিয়ে যাব । তারা আমাকে নিয়ে আসল। যখন আমরা ওয়াদিল কুরাতে পৌঁছলাম তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আমাকে এক ইয়াহুদির নিকটে বিক্রি করে দেয়। আমি তার খেদমত করতে থাকি ।
এর কিছুদিন পরে সেই ইয়াহুদিকে তার চাচাতো ভাই দেখতে আসে এবং সে তার থেকে আমাকে ক্রয় করে ইসরিবে নিয়ে আসে। এই শহরে এসে আমি সেই সকল বৈশিষ্ট্যগুলো পেলাম যা যা আম্মুরিয়ার লোকটি আমাকে বলেছিলেন। আর তাই আমি তার সাথে মদিনায় অবস্থান করতে লাগলাম । নবী করীম সাপ্তাহ তখন মক্কার মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে ছিলেন, কিন্তু আমি দাস হওয়ার কারণে সেই খবর পাইনি । এর কিছুদিন পর রাসূল মদিনায় হিজরত করেন। আল্লাহর কসম! আমি খেজুরের গাছের মাথায় কাজ করছিলাম আর আমার মালিক নিচে বসা ছিলেন এমন সময় তার নিকটে তার চাচাতো ভাই এসে বলল: আল্লাহ তাআলা আউস ও খায়ায গোত্রকে হত্যা করত, তারা কোবা নগরীতে এক লোককে স্বাগতম জানানোর জন্যে একত্রিত হয়েছে। তারা ধারণা করে সে লোকটি নবী।
আমি যখন একথা শুনলাম সাথে সাথে আমার জ্বর হওয়ার মতো কম্পন শুরু হয়ে গেল। আমি মতো বেশি কাঁপতে লাগলাম যেন আমি পড়ে যাব। আমি তাড়াতাড়ি নেমে গেলাম এবং তাকে বললাম: আপনি কি বলেছেন? খবরটি আবার বলুন । একথা বলাতে আমার মালিক আমার উপরে খুব রাগান্বিত হয়ে আমাকে খুব জোরে ঘুষি মেরে বললেন: তোমার এর দরকার কি? তুমি তোমার কাজে যাও । যখন সন্ধ্যা হলো আমি আমার জমা করা কিছু খেজুর নিয়ে তার নিকটে রওয়ানা হলাম । আমি তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বললাম: আমি জানতে পেরেছি আপনি খুব সৎলোক । আর আপনার সাথে গরিব অনেক লোক আছে যারা খুব অভাবী। আর এগুলো হচ্ছে আমার কাছে থাকা কিছু সকার খেজুর। আমার ধারণা মতে আপনারাই এর বেশি হকদার। এ কথা বলে আমি তা তাকে দিলাম । তিনি তা নিয়ে তার সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা এগুলো খাও, কিন্তু তিনি তা থেকে কিছুই খেলেন না ।
আমি মনে মনে বললাম: এটি হচ্ছে প্রথম আলামত ।
তারপর আমি চলে যাই এবং আবার কিছু খেজুর জমা করি। যখন তিনি কোবা থেকে মদিনায় আসেন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আমি দেখেছি আপনি সদ্কাহ্ খান না তাই আমি আপনার জন্যে কিছু হাদিয়া এনেছি। তখন তিনি তা থেকে নিজে খেলেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে খেতে বললেন । আমি মনে মনে বললাম: এটি হচ্ছে দ্বিতীয় আলামত । তারপর একদিন আমি তাঁর নিকটে গেলাম। তিনি তখন বাকিউল গরকদে ছিলেন। আমি দেখতে পেলাম তিনি বসে আছেন, তখন তিনি চাদর পরা অবস্থায় ছিলেন। আমি তাকে সালাম দিলাম এবং তার পেছনে গেলাম যাতেকরে আম্মুরিয়ার লোকটির বর্ণিত খতমে নবুওয়াতটি আমি দেখতে পাই।
যখন রাসূল দেখলেন আমি তাঁর পিঠের দিকে তাকাচ্ছি তিনি আমার প্রয়োজন বুঝতে পেরে তাঁর পিঠ থেকে চাদর তুলে নেন। অতঃপর আমি তার পিঠের দিকে তাকালাম এবং খতমে নবুওয়াত দেখতে পেলাম। আমি তা দেখে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁকে চুমু দিলাম এবং কাঁদতে শুরু করলাম। রাসূল আমাকে বললেন: তোমার কি হয়েছে?
আমি তাঁকে আমার সব ঘটনা খুলে বললাম। এতে তিনি অনেক আশ্চর্য হলেন। তিনি চাইলেন আমি যেন এ ঘটনা তাঁর সাহাবীদেরকে শুনাই। আমি তা সাহাবীদেরকে শুনালাম এতে তাঁরাও অনেক অবাক হলো এবং খুব খুশি হলো । হযরত সালমান ফারেসীর ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষিত হউক এবং আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুক। যিনি সত্যের অন্বেষণে সারাটি জীবন ব্যয় করেছিলেন।
৩. আল জারহু ওয়াত্ তা'দীল – ২য় খণ্ড, ২৯৬-২৯৭ পৃ.
। ৪. আল জামউ বায়না রিজালিস্ সহীহাইন - ১ম খণ্ড, ১৯৩ পৃ. ।
৫. সিয়ারু আ'লামিল নুবালা – ১ম খণ্ড, ৩৬২-৪০৫ পৃ.।
৬. তারীখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী - ২য় খণ্ড, ১৫৮-১৬৩ পৃ. ।
৭. উসদুল গবাহ - ২য় খণ্ড, ৩২৮-৩৩২ পৃ.
৮. ত্ববাকাতুশ্ শা’রানী - ৩০-৩১ পৃ.
৯. সিফাতুস্ সয়া - ১ম খণ্ড, ২১০-২২৫ পৃ. 1
১০. শাযরাতুয্ যাহাব - ১ম খণ্ড, ৪৪ পৃ.
১১. তাক্বরীবুত্ তাহযীব - ১ম খণ্ড, ৩১৫ পৃ. ।
১২. তাহযীবুত্ তাহযীব - ৪র্থ খণ্ড, ১৩৭-১৩৯ পৃ.
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন