হযরত বারা বিন মালিক আল আনসারী রাদিয়ারার
“সাবধান! তোমরা বারাকে কখনো সেনাপতির দায়িত্ব দিবে না, কেননা ভয় হয় সে নির্দ্বিধায় তার সৈন্যদেরকে শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিবে।”
[হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু]
রাসূল -এর উল্লেখযোগ্য একজন সাহাবী হযরত বারা বিন মালিক স্বামিয়ানা যার চুলগুলো ছিল এলোমেলো উস্কুখুস্কু। তাঁর শরীর সর্বদা ধুলায় মলিন থাকতো। গোস্তবিহীন হাড্ডিসার শরীর যার প্রতিটি হাড্ডি ভেসে ছিল। দর্শকের দৃষ্টি তাঁর দিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়লেও সেই দৃষ্টি সাথে সাথে ফিরে আসত । এরপরও তিনি এমন একজন লোক ছিলেন যিনি মল্লযুদ্ধে শতজন মুশরিক বীরকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন। তিনি ছিলেন সশস্ত্র সাহসী বীরযোদ্ধা যিনি যুদ্ধে সর্বদা সম্মুখে অবস্থান করতেন। এ কারণে হযরত উমর তার শানে বলেছেন: “সাবধান! তোমরা বারাকে কখনো সেনাপতির দায়িত্ব দিবে না, কেননা ভয় হয় সে নির্দ্বিধায় তার সৈন্যদেরকে শত্রুর সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিবে।”
এই ঘটনাটি রাসূল -এর ইন্তেকালের কয়েক ঘণ্টা পর থেকে শুরু হয়। রাসূল -এর ইন্তেকালের পর মক্কা, মদিনা ও তায়েফের লোকেরা ব্যতীত অন্যান্য গোত্রের লোকেরা একযোগে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে আগের ধর্মে ফিরে যেতে লাগল। যেমনিভাবে তারা ইসলামের বিজয় দেখে একযোগে ইসলামে প্রবেশ করেছিল, রাসূল -এর ইন্তেকালের পর ঠিক তেমনিভাবে ইসলাম ত্যাগ করে একযোগে মুরতাদ হতে লাগল। তখন মক্কা, মদিনা, তায়েফ ও অন্যান্য কিছু গোত্রের লোকেরা যাদের অন্তরকে আল্লাহ ঈমানের ওপর মজবুত রেখেছে তারাই ইসলামে স্থায়ী ছিলেন।
ইসলামবিরোধী ধ্বংসাত্মক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন এই ফিতনা মোকাবিলা করতে হযরত আবু বকর পর্বতমালার ন্যায় কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের থেকে এগারো জন সেনাপতি প্রস্তুত করলেন। আর এই এগারো জনকে পথ প্রদর্শন করতে আরো এগারো জন ব্যক্তিকে নিয়োজিত করলেন । মানুষকে হেদায়েতের পথে নিয়ে আসার জন্যে এবং যারা ইসলাম থেকে বিমুখ হতে চায় তাদেরকে তরবারির আঘাতে সোজা করার জন্যে, তিনি প্রস্তুতকৃত সেনাপতিদেরকে জাযিরাতুল আরবের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন । তখন ইসলাম ত্যাগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংখ্যায় আধিক্যে ছিল বনু হানীফা নামক গোত্রটি। যারা ভণ্ড নবী মুসায়লাতুল কাজ্জাবের সহচর। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব তার গোত্র ও সহকারী গোত্র থেকে মোট চল্লিশ হাজার দুর্ধর্ষ সৈনিক নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ।
ইয়ামামার ময়দানে উভয় দল যুদ্ধের মুখোমুখি হলো। তাদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। যুদ্ধের প্রথমদিকে মুসায়লামা ও তার বাহিনীর বিজয়ের পাল্লা ভারি হতে লাগল। যুদ্ধের অবস্থা মতো ভয়াবহ হয় যে, মুসলমানরা ময়দানে দাঁড়াতে পারছিল না। তাদের পায়ের তলের মাটি কাঁপতে শুরু করে। আর তাই তারা ধীরে ধীরে পিছনের দিকে যেতে লাগল। এমনকি শত্রু বাহিনীর সৈন্যরা খালেদ বিন ওয়ালিদ -এর তাঁবুটিও দখল করে নিল। যে তাঁবুটি মুসলমানদের সবচেয়ে বড় তাঁবু ছিল। তারা তাঁবুটি উঠিয়ে ফেলল এবং উহার পর্দাগুলো ছিঁড়ে ফেলল। তারা তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করে, কিন্তু তিনি পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেলেন। এই যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলে যে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে তা মুসলিম বাহিনী আঁচ করতে পারে। যদি মুসলমানরা আজ তাদেরকে পরাজিত করতে না পারে তাহলে ইসলাম আর কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। শরিকবিহীন সত্ত্বা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার মতো কেউ আর এই পৃথিবীতে বাকি থাকবে না । আর তাই হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ আবার সৈন্যদের মনোবল ফিরিয়ে এনে তাদেরকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। তিনি মুহাজির ও আনসার সাহাবীদেরকে দুইটি বাহিনীতে ভাগ করলেন। আর তৃতীয় বাহিনী হিসেবে বেদুঈনদেরকে নির্ধারণ করে সর্বোপরি মুসলিম সৈন্যদেরকে মুহাজির, আনসার ও বেদুঈন তিন ভাগে ভাগ করলেন।
তিনি প্রত্যেক সন্তানকে তাদের পিতার ঝাণ্ডার নিচে একত্রিত করলেন যাতে করে তারা যুদ্ধে তাদের অবস্থান উপলব্ধি করতে পারে ।
মুসলমান ও মুরতাদদের মাঝে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যে যুদ্ধের মতো যুদ্ধ মুসলমানরা কখনো দেখেনি। মুসায়লামার বাহিনী অটল পর্বতের মতো যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান নিল। অন্যদিকে মুসলমানরা এমন দুঃসাহসিকতা ও বীরত্ব দেখাতে লাগল, যদি তা লিপিবদ্ধ করা হতো তাহলে তা অতুলনীয় রণকাব্যে রূপ নিত । ইনি হলেন হযরত সাবিত বিন কায়েস যার হাতে আনসারদের ঝাণ্ডা তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি সুগন্ধি মেখে কাফনের কাপড় পরে নিজের জন্যে একটি কবর খুঁড়ে তাতে নেমে পড়লেন। তিনি সগোত্রীয় ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে স্থির অবিচল থেকে যুদ্ধ করতে করতে এক সময় শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন । ইনি হলেন হযরত জায়িদ বিন খাত্তাব । যিনি হযরত উমর এল-এর আপন ভাই। তিনি মুসলমানদেরকে ডেকে বললেন: হে মানুষেরা তোমরা তোমাদের অবস্থানে অনড় থাক, তোমাদের শত্রুদেরকে খতম করতে থাকো এবং সামনের দিকে পা বাড়াও.. । আল্লাহর শপথ! আমি এর পরে আর কোনো কথা বলব না যতক্ষণ না মুসায়লামাকে পরাজিত করব অথবা আমি শহীদ হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাব । তারপর তিনি শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করলেন। অবশেষে লড়াই করতে করতে তিনি শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
আর ইনি হযরত সালেম বলে । যিনি মুহাজিরদের ঝাণ্ডা হাতে নিলেন, কিন্তু অন্যান্যরা তাঁর দুর্বলতার কারণে অটল অবিচল না থাকার ভয় করতে লাগল । তারা তাঁকে বলল: আমরা আপনার দিক থেকে আক্রান্ত হওয়ার ভয় করছি। তিনি বললেন: যদি তোমরা আমার দিক থেকে আক্রান্ত হও তাহলে আমি কতই না নিকৃষ্ট কোরআন ধারণকারী । এরপর তিনি শত্রুদের মোকাবিলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অবশেষে তিনি তাদের আক্রমণের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
এরপর জান্নাত....................
তারপর তিনি মুশরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর সাথে একযোগে আনসাররাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিনি শত্রুদের কাতার ভেঙে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন এবং তাঁর তরবারি দ্বারা শত্রুদের ঘাড়ে আঘাত করতে লাগলেন। আক্রমণ তীব্র হওয়ার কারণে মুশরিকরা পিছু হঠতে বাধ্য হলো। তারা তাদের বাগানে আশ্রয় নিল। যে বাগান ইতিহাসে মরণ বাগান নামে পরিচিত। কেননা সেখানে একত্রে অসংখ্য লোক মারা গিয়েছিল, যার তুলনা ইতিহাসে নেই ।এই বাগানটি চারদিকে উঁচু প্রাচীর দ্বারা ঘেরাও করা ছিল। তাই মুসায়লামা ও তার অনুগত সৈন্যরা এর ভেতরে ঢুকে ফটক বন্ধ করে দিল। বাগানের দেওয়ালটি সুউচ্চে তাই তারা এর ভেতরে দুর্গের মতো আশ্রয় নিল । তারা ভেতর থেকে মুসলমানদের দিকে বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করতে লাগল, কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় মুসলমানরা তাদের ওপর কোনোভাবেই আক্রমণ করতে পারছিল না । আর তখনি বারা বিন মালিক এগিয়ে গিয়ে বললেন: হে আমার গোত্রের লোকেরা তোমরা আমাকে চাকতিতে বসাও, তারপর তা বর্শার দ্বারা উপরে তুলে আমাকে বাগানের ভেতরে দরজার নিকটে ছেড়ে দাও। হয় আমি শহীদ হয়ে যাব, অন্যথায় তোমাদের জন্য দরজা খুলে দিব । চোখের পলকে বারা বিন মালিক চাকতিতে বসলেন। তিনি ছিলেন চিকন ও হালকা ওজনের মানুষ। তারপর ওই চাকতিটি দশটি বর্শা দ্বারা ওপরে তুলে তাঁকে বাগানের ভেতরে মুসায়লামার হাজার হাজার সৈন্যের মাঝে ফেলে দিল। তিনি তাদের সামনে বজ্ররের ন্যায় পতিত হলেন। তিনি দরজার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। অন্যদিকে মুসায়লামার সৈন্যরা তাঁকে দেখে তাঁর দিকে তেড়ে আসে । তিনি তাদের দশ জন সৈন্যের ঘাড়ে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তাদেরকে খতম করে দিলেন। অবশেষে তিনি দরজা খুলতে সক্ষম হলেন। এর মধ্যে তার শরীরে আশিটিরও বেশি তরবারি ও বর্শার আঘাত লাগে । দরজা খোলার সাথে সাথে মুসলমানরা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এরপর তারা মুরদাত ও ইসলামের শত্রুদের মাথায় তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এমনকি সেখানে মুসলমানরা মুসায়লামার বিশ হাজারের কাছাকাছি সৈন্যকে হত্যা করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়। অবশেষে তারা মুসায়লামার নিকটে পৌঁছে গেল এবং তাকে হত্যা করে ধরাশায়ী করল।
হযরত বারা বিন মালিক -কে চিকিৎসা করার জন্য নিয়ে আসা হলো। হযরত খালিদ মিনারে তাঁর নিকটে এক মাস অবস্থান করেন। দীর্ঘ এক মাস পর আল্লাহ তাআলা তাঁকে সুস্থতা দান করেন। তাঁর সাহসী ভূমিকায় আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে ইয়ামামার যুদ্ধে বিজয় দান করেছিলেন। হযরত বারা বিন মালিক সর্বদা শাহাদাত লাভের আশায় বিভোর থাকতেন। যে শাহাদাতের কামনা তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে করেছিলেন, কিন্তু সেদিন তার ভাগ্যে তা লিখা ছিল না। এ কারণে তিনি একের পর এক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে লাগলেন। তিনি আশা করতেন তিনি শহীদ হয়ে নবী করীম -এর সাথে মিলিত হবেন । পারস্যের তুসতর নামক এলাকা বিজয়ের দিন পারস্যবাসী একটি মজবুত দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলমানরা সেই দুর্গের চারদিক ঘেরাও করে। যখন কাফেরদের ওপর যুদ্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো তখন তারা ওপর থেকে লোহার শিকলে বাঁধা উত্তপ্ত লাল টকটকে আংটা ফেলতে শুরু করল। সেই সকল লোহার আংটা যার গায়ে বিধে যেত সে হয় মারা যেত না হয় পঙ্গু হয়ে যেত।
অবশেষে তারা আঘাতকৃত লোকটিকে মৃত বা পঙ্গু অবস্থায় তাদের নিকটে নিয়ে যেত এবং তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করত। এমন একটি লোহার টুকরা বারা বিন মালিক
ওপরে পতিত হলো। তিনি তা দেখে দেওয়ালের দিকে লাফ দিলেন এবং সে লোহার আংটাটি ধরে ফেললেন। এতে তাঁর হাত পুড়ে গিয়ে হাতের গোস্ত খসে পড়তে লাগল, কিন্তু তিনি সেই দিকে কোনো ভুরুক্ষেপ করলেন না; বরং তিনি তাঁর ভাইকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। আর তখন তাঁর হাতে কোনো গোশত বাকি ছিল না। গোশতগুলো খসে পড়ে হাড্ডিগুলো ভেসে উঠল । এই যুদ্ধে তিনি আল্লাহর নিকটে দোয়া করেছেন আল্লাহ যেন তাঁকে শাহাদাত দান করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তাকে শহীদী মৃত্যু দান করেন। আল্লাহ তাআলা হযরত বারা বিন মালিক -এর চেহারাকে জান্নাতে উজ্জ্বল করুক এবং রাসূল -এর সহবতে তাঁর চক্ষু শীতল করুক। তিনি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন।
৮. কা'দাতু ফাতহি ফারিস লশিত খাত্তাব।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন