হযরত আনাস বিন মালেক আল আনসারী রাদিয়াতকে আনহু
“হে আল্লাহ তাকে সম্পদ ও সন্তান দান করুন এবং তাকে বরকত দান করুন।”
[তাঁর জন্য রাসূল মালাধাই-এর বিশেষ দোয়া]
আনাস আমি যখন ফুটন্ত গোলাপের বয়সি ছিলেন তখনই তাঁর মা গুমাইসা যদিশাহার তাঁকে কালেমায়ে শাহাদাত শিখিয়ে দিলেন। তাঁর মায়ের কোমল হৃদয় ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সামাধান -এর ভালোবাসায় সিক্ত ছিল।
এ প্রচার শুনে হযরত আনাস অন্যান্য শিশুদের সাথে সেই দিকে দৌড় দিতেন, কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে না পেয়ে বিষণ্ন মনে ফিরে আসতেন।এক সুন্দর সকালে কিছু লোক ইয়াসরিবে ঘোষণা করল- মুহাম্মদ ও তাঁর হিজরতের সাথি মদিনার অতি নিকটে চলে এসেছেন।
এ ঘোষণা শুনে সকলে অধীর আগ্রহে ওই মোবারকময় পথের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল যে পথ কল্যাণময় ও সঠিক পথের প্রদর্শক নবীকে তাদের নিকটে নিয়ে আসবে এবং তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্যে দলে দলে তারা এগিয়ে যেতে লাগল । শিশুদের দলগুলো মানুষের ভিড়ের মাঝে অবস্থান নিল। তাদের চেহারায় আনন্দ- বন্যা বইয়ে যাচ্ছিল যা তাদের কচি মন ও ছোট হৃদয়গুলোকে খুশিতে ভরে দিচ্ছে। আর সেই শিশুদের দলগুলোর অগ্রভাগে ছিলেন হযরত আনাস বিন মালেক
নবী করীম সালাম তাঁর সাহাবী আবু বকর -কে সাথে নিয়ে মদিনায় এসে পৌঁছলেন। তখন তাঁদেরকে আবাল বৃদ্ধ বণিতা নির্বিশেষে সবাই স্বাগতম জানাতে লাগল । আর অন্দর মহলের মহিলারা ও ছোট ছোট শিশুরা উঁচুস্থানে আরোহণ করে নবী করীম সালাহাই-কে দেখতে লাগল আর বলতে লাগল-
কোন ব্যক্তি তিনি ? -
কোন ব্যক্তি তিনি?..
এ সকল কারণে সেই দিনটি ছিল স্মরণীয় একটি দিন। যা শত বছর পার হওয়ার পরেও হযরত আনাস -এর স্মরণে ছিল ।
নবী করীম মদিনায় অবস্থান করতে থাকলেন; এরই মাঝে একদিন উম্মে আনাস গুমাইসা বিনতে মিলহান বাদি হার তাঁর পুত্র আনাসকে নিয়ে নবী করীম স্যালাইছি-এর খেদমতে হাজির হলেন। তখন তাঁর সাথে তাঁর ছেলেও ছিল। যে তাঁর আশপাশে ছুটা-ছুটি করছিল। আর তখন তার চুলগুলো কপালের ওপর হাওয়ায় উড়তে ছিল।
“হে আল্লাহর রাসূল সালালাহ ! আনসারী সকল পুরুষ ও মহিলা আপনাকে কিছু না কিছু হাদিয়া দিয়েছে, কিন্তু আমার কাছে আপনাকে হাদিয়া দেওয়ার মতো কিছুইনেই সুতরাং আপনি আমার এই ছেলেকে আপনার খাদেম হিসেবে গ্রহণ করুন, যাতে করে সে আপনার মর্জি অনুযায়ী আপনার খেদমত করতে পারে।”
নবী করীম এতে আনন্দিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তাঁকে পরিবারের একজন সদস্য করে নিলেন ।
হযরত আনাস জমি বলেন:
“রাসূল ম্যালাহাই ছিলেন সবার চেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, সবার চেয়ে উদার মনের অধিকারী এবং সবার চেয়ে অধিক দয়ার অধিকারী। তিনি একদিন আমাকে কোনো এক প্রয়োজনে এক জায়গায় পাঠালেন, আমি বের হলাম, কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল আমি বাজারে গিয়ে অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করব। আর খেলাধুলা করার জন্যেই তিনি আমাকে যে কাজের আদেশদিয়েছেন সেই কাজে আমি যায়নি। যখন আমি তাদের নিকটে গিয়ে পৌঁছলাম তখন আমি আমার পেছনে কোনো এক ব্যক্তির অস্তিত্ব অনুভব করলাম। তিনি আমার কাপড় টেনে ধরলেন। আমি ফিরে দেখি তিনি অন্য কেউ না তিনি স্বয়ং রাসূল । তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন: হে উনাইস! আমি তোমাকে যেখানে যাওয়ার জন্যে বলেছি সেখানে গিয়েছ?
হযরত আনাস আমি তো নবী করীম -এর ইন্তেকালের পরে আশি বছরের অধিক বেঁচে ছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ে তাঁর অন্তর নবী করীম -এর ভরে যায় এবং নবুওয়াতের ফিক্হী জ্ঞানে তাঁর আকল পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আর ওই সকল জ্ঞান দ্বারা সাহাবী ও তাবেয়ীদের অন্তর জীবিত হতো। যে সকল জ্ঞান তিনি রাসূল -এর পথ-প্রদর্শনা থেকে প্রচার করতেন এবং রাসূল - এর পবিত্র বাণী ও মহান কর্ম থেকে বর্ণনা করতেন।
ওই দিনের কথা যেদিন রাসূল -এর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। আর ওই দিনের কথা যেদিন রাসূল -এর সাথে তাঁর শেষ সাক্ষাতের সমাপ্তি হলো।যখন তিনি প্রথম দিনের কথা বলতেন তখন তিনি খুব গর্ব বোধ করতেন এবং খুব আনন্দিত হতেন। আর যখন দ্বিতীয় দিনের কথা বলতেন তখন নিজেও খুব কাঁদতেন, মানুষদেরকেও কাঁদাতেন । তিনি বেশি বেশি বলতেন: আমি রাসূল -কে দেখেছি যেদিন তিনি আমাদের মাঝে আগমন করেন। আর ওই দিনও দেখেছি যেদিন তিনি আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। এই দুই দিনের মতো আর কোনো দিন দেখিনি ৷ যেদিন তিনি মদিনায় আগমন করেন সেই দিন মদিনার সবকিছু আলোকিত হয়েছিল....
আর যেদিন তিনি আমাদেরকে ছেড়ে তাঁর প্রতিপালকের কাছে চলে গেলেন সেই দিন সবকিছু অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল..
হযরত আনাস রাশিয়ার কিয়ামতের দিন রাসূল -এর শাফায়াত পাওয়ার অনেক বেশি আশা করতেন। আর এই কারণেই তিনি বেশি বেশি বলতেন:
“আমি অবশ্য কিয়ামতের দিন রাসূল সালামাহ -এর সাক্ষাৎ আশা করি । আর রাসূল -এর সাথে সাক্ষাৎ হলে আমি বলব: হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সেই ছোট খাদেম উনাইস।” যখন হযরত আনাস মৃত্যু শয্যায় শায়িত হলেন তিনি তাঁর পরিবারের লোকদেরকে বললেন: তোমরা আমাকে “লা ইলাহা ইল্লাহ”-এর তালক্বীন দাও । এরপর তিনি কালেমা পড়তে পড়তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন । তিনি অসীয়ত করে গিয়েছিলেন রাসূল -এর একটি ছোট লাঠি তা যেন তাঁর সাথে কবরে দেওয়া হয়। আর ওই লাঠিটা তাঁর অসীয়ত মতো তাঁর কোমর ও জামার মাঝে রাখা হয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা কল্যাণকর যা কিছু হযরত আনাস -কে দান করেছেন তা তাঁর জন্য সুখকর হোক । সাপ্তাহার-এর কোলে পুরো দশ বছর অতিবাহিত করেছিলেন। তিনি রাসূল হাদীস বর্ণনাকারীদের মাঝে তিনি তৃতীয়। হযরত আবু হুরায়রা ও হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমরের পরেই তাঁর স্থান।
তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবাহ্ – ১ম খণ্ড, ৭১ পৃ. ।
২. আল ইসতিআ'ব – ১ম খণ্ড, ৭১ পৃ.।
৩. তাহযীবুত্ তাহযীব - ১ম খণ্ড, ৩৭৬ পৃ.
৪. আল জাউ বায়না রিজালিস্ সহীহাইন – ১ম খণ্ড, ৩৫ পৃ.
৫. উদুল গবাহ্ - ১ম খণ্ড, ২৫৭ পৃ.।
৬. সিফাতুস্ সফওয়াতে – ১ম খণ্ড, ২৯৮ পৃ.
৭. আল মাআরিফ – ১৩৩ পৃ.
৮. আল ইবরু – ১ম খণ্ড, ১০৭ পৃ.।
৯. সিরাতু বাতল – ১০৭ পৃঃ ।
১০. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী - ৩য় খণ্ড, ৩২৯ পৃ. 1
১১. ইবনু আসাকির - ৩য় খণ্ড, ১৩৯ পৃ.।
১২. আল জারহু ওয়াতা'দীল – ১ম খণ্ড, ২৮৬ পৃ.
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন