পশুর পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় ঐ পশু কুরবাণী করা যাবে কি? - Poshur Pata Baccha Khakla Kurbani Kora Jaba ki?
ভূমিকা : পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে এমনকি নিজের, নিজ পরিবারের ও সন্তান-সন্ততির চাইতেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সর্বাধিক ভালবাসা প্রত্যেক মুসলমানের উপর অবশ্য কর্তব্য। আর রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার দাবী হ’ল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত সকল বাণী ও বিধানকে মেনে নেওয়া এবং এগুলির কোন একটিকেও উপেক্ষা না করা। অথচ রাসূল (ছাঃ)-এর উপর পবিত্র এই ভালবাসার ক্ষেত্রে কতিপয় মুসলমান অতিভক্তির আতিশয্যে বিভিন্ন রকম শিরক-বিদ‘আতে লিপ্ত হয়ে থাকে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা পেশ করার প্রয়াস পাব।-
রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার উদ্দেশ্য : রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার কতিপয় বিশেষ ও মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন- (১) আল্লাহর ভালবাসাকে গুরুত্ব দেওয়া। কেননা রাসূল (ছাঃ)-কে ভালাবাসা আল্লাহর ভালবাসা অর্জনেরই অন্যতম উপায়। (২) রাসূল (ছাঃ) সকল নবী-রাসূলগণের মধ্যে সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং তিনি ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তান থেকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হবেন। (৩) তিনি আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীনকে যথাযথভাবে প্রচার করেছিলেন। (৪) শরী‘আতের বিধানের ক্ষেত্রে তিনি স্বীয় উম্মতের উপর রহমদিল ছিলেন। (৫) তিনি তাঁর উম্মতকে যথাসাধ্য নছীহত করেছেন এবং আল্লাহর পথে দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে সম্ভবপর ধৈর্যধারণকারী ছিলেন। (৬) তিনি মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। (৭) রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসা দুনিয়া এবং আখেরাতে ছওয়াব লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই তাঁকে ভালবাসার জন্য আমাদেরকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে চেষ্টা করতে হবে।
রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার ঈমানী আলামত
রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার বেশকিছু ঈমানী আলামত বা নিদর্শন রয়েছে। নিম্নে কতিপয় আলামত উল্লেখ করা হ’ল।-
(১) সৃষ্টির সকলের চাইতে রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসাকে প্রধান্য দেওয়া : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’লেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট নবী ও রাসূল এবং তিনি পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রেরিত রহমত স্বরূপ। তাই তাঁকে যথাসাধ্য ভালবাসতে হবে। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌنِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ، وَاللهُ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ- ‘তুমি বল, তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, নিজ বংশ ও ধন-সম্পদ সমূহ তোমরা যা আয় কর, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা হওয়ার আশংকা কর এবং বাসস্থান, তোমরা যাকে ভালবাস, আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চাইতেও যদি এগুলি অধিক প্রিয় হয়; তাহ’লে তোমরা আল্লাহর শাস্তি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না’ (তওবা ৯/২৪)।
(ক) নিজের পিতা-পুত্রের চাইতে রাসূল (ছাঃ)-কে অধিক ভালবাসা : এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,اَلنَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ، وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ، إِلَّآ أَنْ تَفْعَلُوآ إِلَى أَوْلِيَآئِكُمْ مَّعْرُوفًا، كَانَ ذَالِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا- ‘নবী (মুহাম্মাদ) মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ট এবং তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মা। আর আল্লাহর কিতাবে রক্ত সম্পর্কীয়গণ পরস্পরের অধিক নিকটবর্তী অন্যান্য মুমিন ও মুহাজিরদের চাইতে। তবে তোমরা যদি তাদের প্রতি সদাচরণ কর সেটা স্বতন্ত্র বিষয়। আর এটাই মূল কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে’ (আহযাব ৩৩/৬)।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছঃ) এরশাদ করেন,لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَّالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ- ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকটে সর্বাধিক প্রিয় হব তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ হ’তে’।[1]
(খ) নিজের পরিবার এবং ধন-সম্পদের চাইতে রাসূল (ছাঃ)-কে অধিক ভালবাসা : আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছঃ) বলেন,لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ- ‘কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকটে সর্বাধিক প্রিয় হব তার পরিবার, ধন-সম্পদ ও সকল মানুষ হ’তে’।[2]
(গ) নিজের জীবনের চাইতেও রাসূল (ছাঃ)-কে সর্বাধিক ভালবাসা : আব্দুল্লাহ বিন হিশাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম এমতাবস্থায় যে, তিনি তখন ওমরের হাত ধরেছিলেন। ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিজের জীবন ব্যতীত আপনি আমার কাছে সকল কিছুর চাইতে অধিক প্রিয়। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন,لاَ وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ فَإِنَّهُ الآنَ وَاللهِ لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ نَفْسِى، فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- الآنَ يَا عُمَرُ- ‘না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! যতক্ষণ না আমি তোমার নিকটে তোমার জীবনের চাইতে প্রিয় হবো (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণ মমিন হ’তে পারবে না)। একথাশুনে ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবনের চাইতেও অধিক প্রিয়। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, হে ওমর তুমি এখন প্রকৃত ঈমানদার হ’তে পারলে!’।[3]
(২) রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত সমূহকে যথাযথভাবে ভালবাসা : তাঁর নির্দেশিত যেকোন বিষয় মেনে নেওয়া এবং সে বিষয়ে কোনরূপ ওযর-আপত্তি পেশ না করা। সেই সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহগুলির কোন একটি নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوآ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَّقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ- ‘মুমিনদের কথা তো কেবল এটাই হবে, যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয় তাদের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য, তখন তারা বলবে আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর তারাই হবে সফলকাম’ (নূর ২৪/৫১)।
(৩) রাসূল (ছাঃ)-এর সীরাত গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করা : রাসূল (ছাঃ)-এর জীবন চরিত গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করা এবং তাঁর আদর্শে মুমিনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে সাধ্যমত ঢেলে সাজানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
(৪) রাসূল (ছাঃ)-এর উপর অধিকহারে দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত। তাই তাঁর উপর অধিকহারে দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা মুমিনের জন্য আবশ্যক। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّ اللهَ وَمَلَآئِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ، يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা তার প্রতি দরূদ ও যথাযথভাবে সালাম প্রেরণ কর’ (আহযাব ৩৩/৫৬)।
(৫) রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবী ও পরিবারবর্গকে ভালবাসা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবায়ে কেরাম এবং পরিবারবর্গকে ভালবাসা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। অথচ মুসলিম নামধারী শী‘আরা হাতে গোণা কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত বাকীদেরকে ‘কাফের’ গণ্য করার ধৃষ্টতা দেখাতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। এবিষয়ে প্রকৃত মুমিনদের কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,وَالَّذِينَ جَآءُوا مِنْم بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ، وَلاَ تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلاَّ لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ- ‘যারা পরে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর, যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রবর্তী। আর যারা ঈমান এনেছে তাদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনরূপ হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয়ই তুমি অতিশয় করুণাময়, পরম দয়ালু’ (হাশর ৫৯/১০)।
যায়েদ বিন আরক্বাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) একদা আলোচনায় দাঁড়িয়ে বললেন,...وَأَهْلُ بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، ‘আর আমার পরিবারবর্গের বিষয়ে আমি তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি’।[4] অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গের যথাযথ সম্মান বজায় রাখতে হবে।
অথচ এই ভালবাসার অপব্যবহার করে আমাদের দেশে ‘আওলাদে রাসূল’ বা রাসূলের বংশধর হওয়ার দাবীদারগণ ধর্মপ্রাণ জনগণের নযর-নেয়াযের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে স্ব-ঘোষিত ‘আওলাদে রাসূল’-এর মিথ্যা ফযীলত বর্ণনা করে থাকেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা বংশপরম্পরায় রাসূল (ছাঃ)-এর বংশের সাথে মিলেও যায়নি অথবা তারা রাসূল (ছাঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ-অনুকরণও করেন না। বরং তাদের কর্মকান্ড সমূহ বিভিন্ন শিরক-বিদ‘আতে ভরপুর।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا، مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ- ‘তোমরা আমার ছাহাবীদের গালি দিও না। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ওহোদ পর্বতের ন্যায় স্বর্ণ দান করে, তবুও তাদের কারুর এক মুদ (৬২৫ গ্রাম) কিংবা অর্ধ মুদ আমলের সমপরিমাণ হ’তে পারবে না’।[5] অতএব ছাহাবায়ে কেরাম, রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গ থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের সৎকর্মশীল দাঈ ও কর্মীগণকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসা মুমিনগণের জন্য অবশ্য কর্তব্য।
(৬) রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের উদগ্র বাসনা : রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে জান্নাতবাসী হওয়ার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদগ্র বাসনা সদা জাগ্রত রাখা। সেই সাথে ফরয ও সুন্নাত সমূহের প্রতি পূর্ণভাবে যত্নশীল হওয়া আবশ্যক। যেমন (ক) রাসূল (ছাঃ) বলেন,مِنْ أَشَدِّ أُمَّتِي لِي حُبًّا نَاسٌ يَكُونُونَ بَعْدِي، يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ رَآنِي بِأَهْلِهِ وَمَالِهِ- ‘আমার উম্মতের মধ্যে আমাকে অত্যধিক ভালবাসবে কতিপয় ব্যক্তি, যারা আমার বিগত হওয়ার পর আসবে। তাদের মধ্যে কেউ এমন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে যে, যদি সে তার পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদের বিনিময়েও আমাকে দেখতে পেত!’[6] (খ) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ فِي يَدِهِ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أَحَدِكُمْ يَوْمٌ وَلاَ يَرَانِي، ثُمَّ لَأَنْ يَّرَانِي أَحَبُّ إِلَيْهِ مَنْ أَهْلِهِ وَمَالِهِ مَعَهُمْ- ‘যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার কসম করে বলছি, তোমাদের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন তোমরা আমার সাক্ষাৎ পাবে না। অথচ আমার সাক্ষাৎ লাভ তোমাদের নিকট তখন তোমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের চেয়েও অধিক প্রিয় হবে’।[7]
বেলাল (রাঃ) শাম দেশে ছিলেন। ওমর (রাঃ) সফরে শামের ‘জাবিয়া’তে গেলে লোকেরা ওমর (রাঃ)-এর নিকট জানতে চাইলেন যে, বেলাল (রাঃ) আযান দিবেন কি-না? কারণ রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুবরণের পর বেলাল (রাঃ) আর কখনো আযান দেননি।-فَأَذَّنَ يَوْماً، فَلَمْ يُرَ يَوْماً كَانَ أَكْثَرَ بَاكِياً مِنْ يَوْمَئِذٍ، ذِكْراً مِنْهُم لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- ‘অতঃপর তিনি একদিন আযান দিলেন এবং ঐদিন এমন অঝোরে কান্নাকাটি করলেন যে, ইতিপূর্বে বেলাল আর কখনো এরূপ কান্না করেননি। কেননা আযানে রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসার স্মৃতি তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল।[8]
(৭) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা : যারা ইসলামের শত্রু, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রু, তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা নিষিদ্ধ। যেমন আল্লাহ বলেন,لاَ تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَآدُّونَ مَنْ حَآدَّ اللهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوآ آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَآءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ، ‘যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী তাদের কাউকে তুমি এমন পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। যদিও তারা তাদের পিতৃপুরুষ, সন্তানাদি, ভ্রাতৃমন্ডলী অথবা নিকটাত্মীয় হয়’ (মুজাদালাহ ৫৮/২২)। অতএব শুধুমাত্র দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্যে বাহ্যিক সদাচরণ ব্যতীত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।
রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার কতিপয় আমলী নিদর্শন
উপরে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার ক্ষেত্রে ঈমানী আলামত আলোচনার পর এক্ষণে তাঁকে ভালবাসার কতিপয় আমলী নিদর্শন আলোকপাতের প্রয়াস পাব ইনশআল্লাহ।-
(১)রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ দ্রুততার সাথে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা : এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত ও ছাহাবায়ে কেরামের বাস্তব জীবনে সংঘটিত ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ নিম্নে তুলে ধরা হ’ল।- যেমন (ক) আল্লাহ বলেন,اَلَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْم بَعْدِ مَآ أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ، لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ- ‘যারা আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়েছে নিজেরা আহত হওয়ার পরও, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে ও তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা প্রতিদান’ (আলে ইমরান ৩/১৭২)।
(খ) আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদ হারামের আয়াত (মায়েদাহ ৫/৯১) নাযিল হওয়ার পর এক ব্যক্তি এসে বলল, আপনাদের কাছে এ সংবাদ এসে পৌঁছেছে কি? তারা বললেন, কি সংবাদ? অতঃপর সে বলল, মদ হারাম করা হয়েছে। তারা বললেন, হে আনাস! এই পাত্র সমূহের মদ ফেলে দাও। আনাস (রাঃ) বললেন যে,فَمَا سَأَلُوا عَنْهَا وَلاَ رَاجَعُوهَا بَعْدَ خَبَرِ الرَّجُلِ- ‘তারা এ বিষয়ে কোন প্রশ্নও করেননি এবং ঐ ব্যক্তির সংবাদে প্রশ্নের পৃনরাবৃত্তি-ও করেননি’ (বুখারী হা/৪৬১৭)। কেননা আল্লাহ বলেন,وَمَآ آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا، ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও’ (হাশর ৫৯/৭)। তিনি আরও বলেন,مَنْ يُّطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ تَوَلَّى فَمَآ أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا- ‘যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহরই আনুগত্য করে। আর যে বিমুখ হয়, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর সংরক্ষকরূপে প্রেরণ করিনি’ (নিসা ৪/৮০)। অন্যত্র তিনি বলেন,يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوآ أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যকার নেতৃবর্গের’ (নিসা ৪/৫৯)।
(গ) ইরবায বিন সারিয়া (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন,...فَإِنَّهُ من يَّعش مِنْكُم فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ- ...‘কেননা আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে, তারা অতিসত্বর বহুবিধ মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে অাঁকড়ে ধরবে। তাকে মযবূতভাবে ধারণ করবে এবং মাড়ির দাঁত সমূহ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন থেকে বিরত থাকবে। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবন হ’ল বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই হ’ল গোমরাহী’।[9]
(ঘ) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) একদা খুৎবা চলাকালীন সময়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আগমন করলেন। তিনি তাঁকে বলতে শুনলেন, اِجْلِسُوا ‘তোমরা বসে পড়’। তখন তিনি মসজিদের বাইরে যেখানে ছিলেন, সেখানেই বসে পড়লেন। এভাবে নবী করীম (ছাঃ) তাঁর খুৎবা সমাপ্ত করলেন। আর এই ঘটনাটি তিনি জানতে পারলেন। অতঃপর তিনি দো‘আ করে বললেন,زَادَكَ اللهُ حِرْصًا عَلَى طَوَاعِيَةِ اللهِ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولِهِ- ‘আল্লাহ তোমার আগ্রহ বৃদ্ধি করুন আল্লাহর আনুগত্যে ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে’।[10]
(ঙ) মুগীরা বিন শো‘বা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে জনৈকা আনছার মেয়েকে বিবাহের বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করি। তিনি বললেন, اِذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ يُّؤْدَمَ بَيْنَكُمَا، ‘তুমি যাও এবং তাকে দেখে নাও। কেননা তাতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালবাসার সৃষ্টি হবে’। অতএব আমি উক্ত আনছার মেয়ের পিতার নিকটে এসে তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলাম এবং সেই সাথে নবী করীম (ছাঃ)-এর কথাটিও তাদেরকে অবহিত করলাম। কিন্তু আমার মনে হ’ল যে, তারা এটা অপসন্দ করলেন। রাবী বলেন, মেয়েটি পর্দার আড়াল থেকে উক্ত বর্ণনা শুনে বলল, যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আপনাকে পাত্রী দেখার আদেশ দিয়ে থাকেন, তবে আপনি দেখে নিন। অন্যথায় আল্লাহর দোহাই (আমাকে দেখবেন না)। মুগীরা (রাঃ) বলেন, আমি তাকে দেখে নিলাম এবং বিবাহ করলাম। পরবর্তীতে মুগীরা (রাঃ) তার সাংসারিক সুখ ও সুসম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে কৃতজ্ঞ হ’তেন’।[11] অতএব সার্বিক জীবনে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ দ্রুততার সাথে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রতিটি মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।
(২)রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতকে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা : চতুর্থ হিজরীতে রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক প্রেরিত ‘বিরে মাঊনা’র দাওয়াতী কাফেলার অন্যতম সদস্য হারাম বিন মিলহান (রাঃ)-কে যখন পিছন থেকে বর্শা নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি নিজ দেহের ফিনকি দেওয়া রক্ত দু’হাতে নিজের চেহারা এবং মাথায় মেখে বলে উঠলেন,اَللهُ أَكْبَرُ، فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ- ‘আল্লাহু আকবার! কা‘বার রবের কসম!! আমি সফলকাম হয়েছি’।[12] অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশে দাওয়াত প্রদান ও সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনের জন্য তিনি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। আর শাহাদত লাভের মাধ্যমে তিনি সফলকাম হয়েছেন।[13]
অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ ও সুন্নাত সমূহকে রক্ষার জন্য ছাহাবায়ে কেরাম যেভাবে সোচ্চার ছিলেন, আমাদেরকেও সেভাবে সুন্নাত রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
(৩) শরী‘আতের সর্বোচ্চ ধারক হিসাবে রাসূল (ছাঃ)-কে মেনে নেওয়া : রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার অন্যতম নিদর্শন হ’ল, রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক প্রদত্ত বিধান সর্বান্তকরণে মেনে নেওয়া। যেমন আল্লাহ বলেন,فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا- ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হ’তে পারে না, যতক্ষণ তারা তাদের মীমাংসার বিষয়ে তোমাকে ফায়ছালাকারী হিসাবে মেনে না নিবে। অতঃপর তোমার প্রদত্ত সিদ্ধান্তে তাদের অন্তরে কোনরূপ কুটিলতা রাখবে না এবং সম্পূর্ণরূপে তা মেনে নিবে’ (নিসা ৪/৬৫)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-কে দ্বীন ও শরী‘আতের সর্বোচ্চ ধারক ও বাহক হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং সর্বান্তকরণে রাসূল (ছাঃ)-এর ছহীহ হাদীছ সমূহ বাস্তব জীবনে মেনে নিতে হবে।
(৪) রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসায় বাড়াবাড়ি না করা : পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের নিয়ে তাদের উম্মতের অতিভক্তি, মতানৈক্য ও বাড়াবাড়িতে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল’।[14] তাদের উক্ত বিষয়ে সাবধান করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لاَ تُطْرُونِى كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ- ‘তোমরা আমার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমনটি খৃস্টানরা মরিয়ম তনয় ঈসাকে নিয়ে করেছে। আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূলই বল’।[15]
আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ)-এর মৃত্যুপীড়া শুরু হ’লে তিনি একটা চাদরে নিজের মুখমন্ডল ঢেকে নিলেন। যখন নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হ’ল, তখন মুখমন্ডল হ’তে চাদর সরিয়ে দিয়ে বললেন,لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ- ‘আল্লাহর লা‘নত ইহূদী ও খৃষ্টানদের প্রতি, যারা তাদের নবীগণের কবর সমূহকে সিজদার স্থানে পরিণত করেছে’।[16] এ কথা বলে তিনি মুসলমানদেরকে ভক্তির আতিশয্যে কবর পূজার শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করেছিলেন।
আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে আলাপচারিতার সময় বলল, مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ، ‘যা আল্লাহ ও আপনি ইচ্ছা করেন’। জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন,جَعَلْتَنِى لِلَّهِ عَدْلاً، مَا شَاءَ اللهُ وَحْدَهُ- ‘তুমি তো আমাকে আল্লাহর সমতুল্য গণ্য করলে। বরং (বল) একমাত্র আল্লাহ ইচ্ছা করেন’।[17]
আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে বলল,يَا مُحَمَّدُ يَا سَيِّدَنَا وَابْنَ سَيِّدِنَا وَخَيْرَنَا وَابْنَ خَيْرِنَا، ‘হে মুহাম্মাদ, হে আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার পুত্র। আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِتَقْوَاكُمْ، وَلاَ يَسْتَهْوِيَنَّكمُ الشَّيْطَانُ، أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ، وَاللهِ مَا أُحِبُّ أَنْ تَرْفَعُونِى فَوْقَ مَنْزِلَتِى الَّتِى أَنْزَلَنِى اللهُ عَزَّ وَجَلَّ- ‘হে জনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। বরং আমি আব্দুল্লাহর পুত্র ‘মুহাম্মাদ’। আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর কসম! আমি পসন্দ করিনা যে, মহান আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদা প্রদান করেছেন, তোমরা অতিরঞ্জিত করে আমাকে তার ঊর্ধ্বে উঠাবে’।[18]
(৫) রাসূল (ছাঃ)-এর সম্মান যথাযথভাবে বজায় রাখা : পৃথিবীর দিকে দিকে নাস্তিক-মুরতাদরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শান-মান হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সদা অপতৎপর থাকে। তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উচ্চ সম্মান যথাযথভাবে বজায় রাখার জন্য মুমিনদেরকে সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন,اَلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ، يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلاَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ، فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ- ‘যারা আনুগত্য করে এই রাসূলের যিনি নিরক্ষর নবী, এ বিষয়ে তারা তাদের কিতাব তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পেয়েছে। যিনি তাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ দেন ও অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করেন। তিনি তাদের জন্য পবিত্রগুলি হালাল করেন ও অপবিত্রগুলো নিষিদ্ধ করেন এবং তাদের উপর থেকে বোঝা ও শৃংখল সমূহ নামিয়ে দেন যা তাদের উপরে ছিল। অতএব যারা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাকে সম্মান করেছে ও সাহায্য করেছে এবং সেই জ্যোতির্ময় কুরআনের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে নাযিল হয়েছে, তারাই হ’ল প্রকৃত সফলকাম’ (আ‘রাফ ৭/১৫৭)।
(৬) রাসূল (ছাঃ)-এর বাণীকে উপেক্ষা না করা : রাসূল (ছাঃ)-এর কোন নির্দেশ, হাদীছ অথবা বিধান পেলে মাথা পেতে মেনে নেওয়া যরূরী। যেমন আল্লাহ বলেন,وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَّكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ، وَمَنْ يَّعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالاً مُّبِينًا- ‘কোন মুমিন পুরুষ বা মুমিনা নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোন অধিকার নেই, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ প্রদান করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, সে সুস্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হবে’ (আহযাব ৩৩/৩৬)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার দাবী হ’ল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত কোন বাণী ও বিধানকে উপেক্ষা না করা এবং যথাযথভাবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে সার্বিক জীবন পরিচালনা করা।
(৭) রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানকে বাস্তবায়ন করা :
বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র, ইযম-তরীকা, জাতীয় ও বিজাতীয় মতবাদ সমূহকে পরিহার করে আল্লাহ প্রেরিত অহি-র আলোকে ঈমান আনয়ন করা প্রতিটি মুমিনের যরূরী কর্তব্য। কেননা রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধান আল্লাহর-ই প্রেরিত অহি। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى- مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى- وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى- إِنْ هُوَ إِلاَّ وَحْيٌ يُّوحَى- ‘কসম নক্ষত্ররাজির যখন সেগুলি অস্ত যায়’। ‘তোমাদের সাথী ভ্রষ্ট হয়নি এবং ভ্রান্তও হয়নি’। ‘আর সে খেয়াল-খুশীমত মনগড়া কোন কথাও বলে না’। ‘সেটিতো কেবলমাত্র অহি ব্যতীত নয়, যা তার নিকট প্রেরণ করা হয়’ (নাজ্ম ৫৩/১-৪)।
রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানের প্রতি মুশরিকদের সন্দেহের প্রতিবাদে আল্লাহ বলেন,وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآنُ أَنْ يُّفْتَرَى مِنْ دُونِ اللهِ وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ الْكِتَابِ لاَ رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ- ‘আর এই কুরআন তো এমন নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত যা অন্যের কাছ থেকে রচিত হয়েছে। বরং এটি পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের প্রত্যয়নকারী এবং কিতাবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানকারী। যাতে কোনই সন্দেহ নেই। এটি জগত সমূহের প্রতিপালকের নিকট হ’তে প্রদত্ত’ (ইউনুস ১০/৩৭)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানে ঈমান আনা ও তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ভালবাসার অন্যতম প্রধান শর্ত।
[ক্রমশঃ]
-ইহসান ইলাহী যহীর
* পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
[1]. বুখারী হা/১৫; মুসলিম হা/৪৪; মিশকাত হা/৭।
[2]. মুসলিম হা/৪৪; বায়হাক্বী শো‘আব হা/১৩১২।
[3]. বুখারী হা/৬৬৩২; হাকেম হা/৫৯২২; আহমাদ হা/১৮০৭৬; ইবনুল মুলাক্কিন (৭২৩-৮০৪ হি. কায়রো, মিসর), আত-তাওযীহু লি শরহিল জামে‘ইছ ছগীর হা/৬২৬৪-এর আলোচনা; ইবনু বাত্ত্বাল কুরতুবী, শরহ ছহীহুল বুখারী ‘মুছাফাহা’ অনুচ্ছেদ ৯/৪৪ পৃ.।
[4]. মুসলিম হা/২৪০৮; মিশকাত হা/৬১৩১।
[5]. বুখারী হা/৩৬৭৩; মুসলিম হা/২৫৪০; মিশকাত হা/৬০০৭।
[6]. মুসলিম হা/২৮৩২; মিশকাত হা/৬২৭৫।
[7]. মুসলিম হা/২৩৬৪; মিশকাত হা/৫৯৬৯।
[8]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১/৩৫৭ পৃ.।
[9]. আবুদাঊদ হা/৪৬০৭ প্রভৃতি; মিশকাত হা/১৬৫।
[10]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ৪/৭৩; ইবনু কাছীর, আস-সীরাতুন নববিইয়াহ ৩/৪৮৭; আল-বিদায়াহ ৪/২৫৮।
[11]. ইবনু মাজাহ হা/১৮৬৬; আহমাদ হা/১৮১৬২; বায়হাক্বী হা/১৩৮৭২; মিশকাত হা/৩১০৭; ছহীহাহ হা/৯৬-এর আলোচনা।
[12]. বুখারী হা/২৮০১, ৪০৯১; আহমাদ হা/১২৪২৫; মুসলিম হা/৬৭৭।
[13]. ফাৎহুল বারী শরহ বুখারী হা/৪০৯০-এর আলোচনা ৭/৩৮৮ পৃ.।
[14]. মুসলিম হা/১৩৩৭; মিশকাত হা/২৫০৫।
[15]. বুখারী হা/৩৪৪৫; মিশকাত হা/৪৮৯৭।
[16]. বুখারী হা/৪৩৫-৪৩৬; মুসলিম হা/৫৩১; মিশকাত হা/৭১২।
[17]. আহমাদ হা/৩২৪৭; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/২৯৫৭৩; ছহীহাহ হা/১০৯৩।
[18]. আহমাদ হা/১৩৫৫৩; নাসাঈ কুবরা হা/১০০০৭; ছহীহাহ হা/১৫৭২।
যেসব আমলের উপকার আমলকারী থেকে অন্য মানুষের মাঝে সঞ্চারিত হয়, আল্লাহ রাববুল ‘আলামীনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ঐ আমলগুলোই অধিক সহায়ক। কারণ এসব আমলের উপকার ও ছওয়াব শুধু আমলকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অন্য মানুষ এমনকি অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও তা সঞ্চারিত হয়। ফলে এ কাজের ফল আমভাবে সবাই ভোগ করে।
এই উপকারী নেক আমলের মধ্যে আবার সেসব আমল আরো বেশী উত্তম, মৃত্যুর পরেও যার ছওয়াবের ধারা বন্ধ হয় না। মৃত্যুর পরে যখন মানুষ কবরে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকবে, তখন সেসব আমলের ছওয়াব কবরের জীবনে তিনি পেতে থাকবেন। এজন্য যেকোন মুসলিমের কর্তব্য হবে নশ্বর এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বে এমন কিছু আমল রেখে যাওয়া, যা দ্বারা পরবর্তীকালে অন্য মানুষ উপকৃত হবে এবং সেও এর মাধ্যমে কবরে ও পরকালে উপকৃত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا- ‘বস্ত্ততঃ তোমরা নিজেদের জন্য যতটুকু সৎকর্ম অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকটে পাবে। সেটাই হ’ল উত্তম ও মহান পুরস্কার’ (মুযযাম্মিল ৭৩/২০)।
কবি বলেন,
وَكُنْ رَجُلاً إِنْ أَتَوْا بَعْدَهُ + يَقُولُونَ مَرَّ وَهَذَا الأَثَرُ
‘তুমি হও এমন মানুষ, যার পরে অন্য যারা আসবে তারা বলবে,
লোকটা চলে গেছে বটে, তবে রেখে গেছে এই পদচিহ্ন’।
আলোচ্য নিবন্ধে আমরা গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ের নানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।-
উপকারী আমলের প্রকারভেদ :
উপকার সাধনের দিক দিয়ে মানুষের আমল দু’প্রকার। (১) ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ আমল। আরবীতে বলে ‘আমলে ক্বাছের’ (عمل قاصر) (২) অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল আমল। আরবীতে বলে ‘আমলে মুতা‘আদ্দী’ (عمل متعدي)। যে আমলের উপকারিতা ও ছওয়াব শুধুই আমলকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ তা প্রথম শ্রেণীভুক্ত। যেমন- ছালাত, ছিয়াম, ই‘তিকাফ ইত্যাদি। আর যে আমলের উপকারিতা আমলকারী থেকে অন্যদের মাঝে সঞ্চারিত হয়, তা দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। এ উপকারিতা ইহলৌকিক হ’তে পারে। যেমন- মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করা, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা ইত্যাদি। আবার পারলৌকিক হ’তে পারে। যেমন- আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত প্রদান, শিক্ষাদান ইত্যাদি। এ শ্রেণীর আমলকে পরোপকারী আমলও বলা যায়।
উক্ত দু’প্রকার আমলের মধ্যে কোন প্রকার আমল শ্রেষ্ঠ সে সম্পর্কে বিদ্বানগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ উপকারী আমল থেকে অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল শ্রেষ্ঠ। জনৈক ফক্বীহ এজন্যই বলেছেন, যে ইবাদত অত্যধিক কল্যাণপ্রসূ সেই ইবাদত সর্বোত্তম। কুরআন ও সুন্নাহতে প্রচুর আয়াত ও হাদীছ রয়েছে যাতে মানুষের উপকারে আত্মনিয়োগ করতে বলা হয়েছে, তাদের কল্যাণ করতে প্রেরণা যোগানো হয়েছে এবং তাদের অভাব ও প্রয়োজন মিটাতে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। এখানে এমন কিছু হাদীছ তুলে ধরা হ’ল :
(১) আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ- ‘একজন আবেদের উপর একজন আলেমের মর্যাদা ততখানি যতখানি পূর্ণিমা রাতে তারকারাজির উপর চাঁদের মর্যাদা’।[1]
(২) খায়বার যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী (রাঃ)-কে বলেছিলেন,لأَنْ يَهْدِىَ اللهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ- ‘যদি তোমার দ্বারা আল্লাহ একজন ব্যক্তিকেও হেদায়াত দান করেন, তবে সেটি তোমার জন্য মূল্যবান লাল উটের (কুরবানীর) চাইতে উত্তম হবে’।[2]
(৩) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا- ‘যে ব্যক্তি হেদায়াত তথা ইসলামের দিকে দাওয়াত দিবে তার ঠিক ততটুকু ছওয়াব মিলবে যতটুকু তার কথা মান্যকারীদের মিলবে। মান্যকারীদের ছওয়াব তাতে মোটেও হ্রাস পাবে না’।[3]
যেসব আমলের উপকার ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেসব আমলকারী যখন মারা যায় তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল আমল যিনি করেন মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় না।
নবী-রাসূলগণকে পাঠানোর পিছনে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যই ছিল মাখলূকের উপকার সাধন। তাঁরা মানব জাতিকে আল্লাহর পথ দেখিয়ে গেছেন। তাদের জীবন-জীবিকা যাতে কল্যাণময় হয় এবং আখেরাতে তারা উপকৃত হয় সে উপায় তাঁরা বলে গেছেন। তাঁরা মানুষের সংস্রব ত্যাগ করে নির্জনে বসবাস করবেন সেজন্য আল্লাহ পাক তাদের পাঠাননি। এজন্যই নবী করীম (ছাঃ) তাঁর সেসব ছাহাবীর কাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন যারা জনগণের সাথে যোগাযোগ ছেড়ে দিয়ে নিরিবিলিতে আল্লাহর ইবাদতে মশগূল হ’তে মনস্থ করেছিলেন।[4]
মূলতঃ অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা সার্বিক বিবেচনায় বলা হয়েছে। নচেৎ অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল মাত্রই যে ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ কল্যাণমূলক আমল থেকে শ্রেয় হবে এমন কথা নয়। যেমন- ছালাত, ছিয়াম ও হজ্জ তো নিছকই ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ কল্যাণমূলক ইবাদত। আর এগুলো ইসলামের মূল স্তম্ভ ও ভিত্তি। এজন্যই জনৈক আলেম বলেছেন,إِنَّ أَفْضَلَ الْعِبَادَاتِ : الْعَمَلُ عَلَى مَرْضَاةِ الرَّبِّ فِي كُلِّ وَقْتٍ بِمَا هُوَ مُقْتَضَى ذَلِكَ الْوَقْتِ وَوَظِيفَتُهُ ‘শ্রেষ্ঠতম ইবাদত সেই আমল, যা প্রতি মুহূর্তে সময়ের দাবী মেনে মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টিকল্পে করা হয়’।[5]
মানুষের উপকার সাধন নবী-রাসূলগণের বৈশিষ্ট্য :
অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল বা কাজ নবী-রাসূলগণের কর্মনীতির অন্তর্ভুক্ত। যারা নবী-রাসূলগণকে মেনে চলতে চান এবং তাদের পদচিহ্ন ধরে পথ চলতে চান তাদেরও কর্তব্য মানুষের কল্যাণ সাধন করা। নবী-রাসূলগণ ছিলেন সর্বাধিক মানবদরদী। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে তাঁরা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় ও পথ বলে গেছেন। পাপাচারের অন্ধকার থেকে পুণ্যের আলোয় উদ্ভাসিত পথের দিকে মানবজাতিকে বের করে আনতে তাঁরা অবিরাম চেষ্টা করে গেছেন। যে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব ব্যতীত দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মান ও সৌভাগ্য অর্জন সম্ভব নয় সেই তাওহীদের প্রতিই ছিল তাঁদের আহবান। তাঁরা কেবল মানবজাতির জন্য পরকালীন কল্যাণের কথাই ভাবেননি বরং তাদের জাগতিক কল্যাণের কথাও তাঁদের মাথায় ছিল।
ইউসুফ (আঃ) মিসররাজের খাদ্যবিভাগ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন,قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ ‘ইউসুফ বলল, আপনি আমাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত করুন। নিশ্চয়ই আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও (এ বিষয়ে) বিজ্ঞ’ (ইউসুফ ১২/৫৫)। তাঁর এ দায়িত্বগ্রহণের ফলে জনগণের অনেক উপকার হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে যখন আশেপাশের দেশগুলো দুর্ভিক্ষকবলিত, তখন তাঁর দক্ষ পরিচালনায় মিসরীয়রা দুর্ভিক্ষ থেকে নিরাপদ ছিল।
মূসা (আঃ) যখন মিসর থেকে মাদইয়ান গমন করেন তখন তিনি একদল লোককে তাদের পশুপালের পানি পান করাতে দেখতে পান। সেখানে দু’জন কিশোরী ছিল, যারা তাদের বয়সের স্বল্পতাজনিত দুর্বলতা হেতু তাদের পশুগুলোকে পানি পান করাতে পারছিল না। তিনি কূয়ার মুখ থেকে পাথরের ঢাকনা সরিয়ে তাদের ছাগলগুলোর পানি পানের ব্যবস্থা করে দেন।[6]
নবী করীম (ছাঃ)-এর পরোপকারিতার গুণ তো সুবিদিত। এ সম্পর্কে তাঁর নবুঅত লাভের দিন খাদীজা (রাঃ) বলেছিলেন,كَلاَّ وَاللهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَقْرِى الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ- ‘কখনই নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনই আপনাকে অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায় পরিবারের দায় বহন করেন, নিঃস্ব মানুষের আয়-রোযগারের ব্যবস্থা করে দেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে চলতে গিয়ে বিপদে পতিতদের সাহায্য করেন’।[7]
এই একই পথের পথিক ছিলেন ছাহাবায়ে কেরাম ও নেককার লোকেরা।
আবুবকর (রাঃ) আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন এবং অভাবী লোকদের সাহায্য করতেন। এ কারণেই যখন তাঁর জাতি তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দিতে চাইছিল তখন ইবনুদ দাগিন্নাহ নামক জনৈক মুশরিক বলেছিলেন,إِنَّ مِثْلَكَ لاَ يَخْرُجُ وَلاَ يُخْرَجُ، فَإِنَّكَ تَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَقْرِى الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ- ‘আপনার মতো মানুষ তো নিজ থেকে দেশ ছাড়তে পারে না, আর আপনাকে দেশছাড়া করাও যেতে পারে না। আপনি তো নিঃস্ব মানুষের আয়-রোযগারের ব্যবস্থা করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায় পরিবারের দায় বহন করেন, মেহমানদের সেবাযত্ন করেন এবং সত্যের পথে চলতে গিয়ে বিপদে পতিতদের সাহায্য করেন’।[8]
ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বিধবাদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং রাতে সময় করে তাদের পানি যোগান দিতেন।
আলী বিন হোসাইন (রাঃ) রাতের আঁধারে মিসকীন-অভাবীদের বাড়িতে প্রতিনিয়ত রুটি দিয়ে আসতেন। যখন তিনি মারা গেলেন তখন থেকে তাদের এ সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। ইবনু ইসহাক বলেন, মদীনাবাসীদের মাঝে কিছু মানুষ প্রত্যহ খানাপিনা লাভ করতেন, কিন্তু তারা জানতেন না যে কোত্থেকে এই খাদ্য আসে। তারপর যখন আলী বিন হোসাইন যয়নুল আবেদীন মারা গেলেন তখন থেকে তারা সে সুযোগ হারিয়ে ফেলেন যা প্রত্যহ রাতে তাদের মিলত।[9]
এমনিভাবে এই উম্মতের নেককার লোকেরা যখনই মানবকল্যাণের সুযোগ পেয়েছেন তখনই তারা সে সুযোগ লুফে নিয়েছেন। যখনই তারা এমন সুযোগ পেয়েছেন তখনই তারা খুব আনন্দিত হয়েছেন এবং এ দিনকে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন গণ্য করেছেন।
সুফিয়ান ছাওরী (রাঃ) যখন তাঁর দরজায় কোন প্রার্থী-ফকীরকে দেখতে পেতেন তখনই বলে উঠতেন, ‘স্বাগত জানাই তাকে, যিনি আমার পাপ ধুয়ে দিতে এসেছেন’।
ফুযাইল বিন আইয়ায (রহঃ) বলতেন, এই প্রার্থী-ভিক্ষুকরা কতই না ভালো! তারা আমাদের পাথেয় আখেরাত পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে বয়ে নিয়ে দাঁড়িপাল্লায় রেখে দিচ্ছে।
অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল কল্যাণের প্রতিদান কিভাবে শ্রেষ্ঠ :
অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল কল্যাণের প্রতিদান কিভাবে ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ আমল থেকে শ্রেষ্ঠ হ’ল সে সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছ থেকে কিছু বাণী তুলে ধরা হ’ল :
১. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,وَالْعَصْرِ، إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ، إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ- ‘কালের শপথ! নিশ্চয়ই সকল মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতীত, যারা (জেনে-বুঝে) ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করেছে এবং পরস্পরকে ‘হক’-এর উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (আছর ১০৩/১-৩)।
মুফাস্সির আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা সময়ের শপথ করেছেন যা কি-না রাত ও দিনের সমষ্টি এবং বান্দাদের ইবাদত ও আমলের ক্ষেত্র। সময়ের শপথ করে তিনি বলেছেন, মানুষ মাত্রেই ক্ষতির মধ্যে। তবে চারটি গুণবিশিষ্ট মানুষ ক্ষতিমুক্ত। [ক্রমশঃ]
-মূল (আরবী) : মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ
-অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
[1]. আবুদাউদ হা/৩৬৪১; ছহীহুল জামে‘ হা/৪২১২।
[2]. মুসলিম হা/২৪০৬ (৩৪)।
[3]. মুসলিম হা/২৬৭৪।
[4]. বুখারী হা/৪৭৭৬; মুসলিম হা/০৫।
[5]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৮৫-৮৭।
[6]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩১৮৪২, সনদ ছহীহ (ইবনু কাছীর)।
[7]. বুখারী হা/০৩।
[8]. বুখারী হা/২২৯৭, ৩৯০৫।
[9]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৪/৩৯৩।
আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلاَلَةٍ مِّنْ طِينٍ- ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ- ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ- ‘নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’। ‘অতঃপর আমরা তাকে (পিতা-মাতার মিশ্রিত) জনন কোষরূপে (মায়ের গর্ভে) নিরাপদ আধারে সংরক্ষণ করি’। ‘অতঃপর উক্ত জননকোষকে আমরা পরিণত করি জমাট রক্তে। তারপর জমাট রক্তকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে। অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিতে। অতঃপর অস্থিসমূহকে ঢেকে দেই মাংস দিয়ে। অতঃপর আমরা ওকে একটি নতুন সৃষ্টিরূপে পয়দা করি। অতএব বরকতময় আল্লাহ কতই না সুন্দর সৃষ্টিকারী!’ (মুমিনূন ২৩/১২-১৪)।
উক্ত আয়াতগুলিতে মানব সৃষ্টির সূচনাগত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে মাটি থেকে সরাসরি আদমকে অতঃপর আদম থেকে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করার পরবর্তী পর্যায়ে আল্লাহ আদম সন্তানদের মাধ্যমে বনু আদমের বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। এখানেও রয়েছে সাতটি স্তর। যেমন : মৃত্তিকার সারাংশ তথা প্রোটোপ্লাজম, বীর্য বা শুক্রকীট, জমাট রক্ত, মাংসপিন্ড, অস্থিমজ্জা, অস্থি পরিবেষ্টনকারী মাংস এবং সবশেষে রূহ সঞ্চারণ।[1] স্বামীর শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে রক্ষিত ডিম্বকোষে প্রবেশ করার পর উভয়ের সংমিশ্রিত বীর্যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে (দাহর ৭৬/২)। উল্লেখ্য যে, পুরুষের একবার নির্গত লম্ফমান বীর্যে লক্ষ-কোটি শুক্রাণু থাকে। আল্লাহর হুকুমে তন্মধ্যকার একটি মাত্র শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করে। এই শুক্রকীট পুরুষ ক্রোমোজম Y অথবা স্ত্রী ক্রোমোজম X হয়ে থাকে। এর মধ্যে যেটি স্ত্রীর ডিম্বের X ক্রোমোজমের সাথে মিলিত হয়, সেভাবেই পুত্র বা কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আল্লাহর হুকুমে।
মাতৃগর্ভের তিন তিনটি গাঢ় অন্ধকার পর্দার অন্তরালে (যুমার ৩৯/৬) দীর্ঘ নয় মাস ধরে বেড়ে ওঠা প্রথমতঃ একটি পূর্ণ জীবন সত্তার সৃষ্টি, অতঃপর একটি জীবন্ত প্রাণবন্ত ও প্রতিভাবান শিশু হিসাবে দুনিয়াতে ভূমিষ্ট হওয়া কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার। কোন মানুষের পক্ষে এই অকল্পনীয় সৃষ্টিকর্ম আদৌ সম্ভব কী? ঐ গোপন কুঠরীতে পিতার ২৩টি ক্রোমোজম ও মাতার ২৩টি ক্রোমোজম একত্রিত করে সংমিশ্রিত বীর্য কে প্রস্ত্তত করেন? অতঃপর ১২০ দিন পরে তাতে রূহ সঞ্চার করে তাকে জীবন্ত মানব শিশুতে পরিণত করেন এবং পূর্ণ-পরিণত হওয়ার পরে সেখান থেকে বাইরে ঠেলে দেন (‘আবাসা ৮০/১৮-২০)।
আল্লাহ বলেন,إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا- ‘আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি (পিতা-মাতার) মিশ্রিত জনন কোষ হ’তে, তাকে পরীক্ষা করার জন্য। অতঃপর আমরা তাকে করেছি শ্রবণশক্তি সম্পন্ন ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’ (দাহর ৭৬/২)।
আধুনিক বিজ্ঞান এ তথ্য জানতে পেরেছে মাত্র ১৮৭৫ সালে ও ১৯১২ সালে। তার পূর্বে এরিস্টটল সহ সকল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল যে, পুরুষের বীর্যের কোন কার্যকারিতা নেই (সৃষ্টিতত্ত্ব ৪২১ পৃ.; নবীদের কাহিনী ১/২৫ পৃ.)। অথচ রাসূলের হাদীছ এটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে।
যেমন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহা) বলেন, ‘একদিন আনাস (রাঃ)-এর মা উম্মে সুলায়েম (রাঃ) এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ সত্য বলায় লজ্জা পান না। নারীদের স্বপ্নদোষ হলে তাদের গোসল আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। যখন সে পানি দেখে। এতে উম্মে সালামাহ লজ্জায় মুখ ঢাকেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, নারীর কি স্বপ্নদোষ হয়? তিনি বললেন, তোমার ডান হাত ধূলি ধূসরিত হৌক! না হ’লে তার সন্তান তার চেহারার সদৃশ কিভাবে হয়?’ ছহীহ মুসলিমের বর্ণনায় বর্ধিতভাবে এসেছে, ‘পুরুষের বীর্য গাঢ় ও সাদা এবং স্ত্রীর বীর্য পাতলা ও হলদে। উভয়ের মধ্যে (আল্লাহর হুকুমে) যেটি জয়ী হয় অথবা গর্ভাশয়ে প্রবেশ করে সন্তান তার সদৃশ হয়’।[2]
আল্লাহ বলেন,لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَّشَآءُ إِنَاثًا وَّيَهَبُ لِمَنْ يَّشَآءُ الذُّكُورَ- أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَّإِنَاثًا وَّيَجْعَلُ مَنْ يَّشَآءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ- ‘আল্লাহর জন্যই রাজত্ব নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের। তিনি যা চান তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে চান কন্যা সন্তান দান করেন ও যাকে চান পুত্র সন্তান দান করেন’। ‘অথবা যাকে চান পুত্র ও কন্যা যমজ সন্তান দান করেন এবং যাকে চান বন্ধ্যা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান’ (শূরা ৪২/৪৯-৫০)।
বীর্য মাতৃগর্ভে ৬ দিন বুদ্বুদ আকারে থাকে। তারপর জরায়ুতে সম্পর্কিত হয়। ৩ মাসের আগে ছেলে বা মেয়ে চিহ্নিত হয় না। ৪ মাস পর তাতে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়। তাতে বাচ্চা নড়েচড়ে ওঠে ও আঙ্গুল চুষতে থাকে। যাতে সে জন্মের পর মায়ের স্তন চুষতে পারে। এ সময় তার কপালে চারটি বস্ত্ত লিখে দেওয়া হয়। আজাল, আমল, রিযিক, ভাগ্যবান বা হতভাগা।[3]
উল্লেখ্য যে, মাটি থেকে সৃষ্ট হওয়া আদমের নাম হ’ল ‘আদম’ এবং জীবন্ত আদমের পাঁজর হ’তে সৃষ্ট হওয়ায় তাঁর স্ত্রীর নাম হ’ল ‘হাওয়া’ (কুরতুবী)। আর আদম থেকেই আল্লাহ সকল মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেন,يَآأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَّاحِدَةٍ وَّخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَّنِسَآءً، وَاتَّقُوا اللهَ الَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا- ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর ঐ জোড়া থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অগণিত পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের নিকট প্রার্থনা করে থাক এবং রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সম্পর্কে সতর্ক থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষক’ (নিসা ৪/১)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা নারীদের সাথে উত্তম আচরণ কর। কারণ তাদেরকে পাঁজরের হাড় হ’তে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বাঁকা হ’ল উপরের হাড় (সে হাড় থেকে নারীদের সৃষ্টি)। অতএব তুমি যদি তাকে সোজা করতে যাও, তবে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি ছেড়ে দাও, তাহ’লে সবসময় বাঁকাই থাকবে। সুতরাং তোমরা নারীদের সাথে ভাল ব্যবহার কর’।[4]
পৃথিবীতে বিচরণশীল সকল প্রাণী আল্লাহর একেকটি পৃথক সৃষ্টি। যেমন তিনি বলেন,وَمَا مِنْ دَآبَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلاَ طَآئِرٍ يَّطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلاَّ أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ، ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রাণীকুল এবং দু’ডানায় ভর করে আকাশে সন্তরণশীল পক্ষীকুল তোমাদের মতই একেকটি সৃষ্টি’ (আন‘আম ৬/৩৮)। অতএব মানুষ ও বানর দু’টিই পৃথক জাতি। মানুষ কখনো বানর ছিল না এবং বানর কখনো মানুষ হয় না। আজও কোন বানর মানুষ হচ্ছে না।
অতঃপর মায়ের গর্ভে শিশুর আকৃতি গঠন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ- ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি মায়ের গর্ভে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (আলে ইমরান ৩/৬)। তিনি আরও বলেন, خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَّاحِدَةٍ، ثُمَّ جَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ الْأَنْعَامِ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجٍ يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِّنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلاَثٍ، ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একজন ব্যক্তি (আদম) হ’তে। অতঃপর তার থেকে তার জোড়া (হাওয়াকে) সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন আট প্রকার গবাদিপশু। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে ত্রিবিধ অন্ধকারে একটার পর একটা সৃষ্টির মাধ্যমে’ (যুমার ৩৯/৬)। ঐ তিনটি অন্ধকার হ’ল মায়ের পেট, জরায়ু ও জরায়ু মুখ বা গর্ভাধার। আর সবকিছুই আল্লাহ নিজ হাতে করেছেন। যেমন তিনি বলেন,قَالَ يَآإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ، ‘হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু’হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে তোমাকে কোন্ বস্ত্ত বাধা দিল?’ (ছোয়াদ ৩৮/৭৫)।
মানুষ সৃষ্টির ৩টি পর্যায় নির্ধারণের মধ্যে প্রথমে অবয়ব গঠন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে শক্তির আনুপাতিক হার বণ্টন, পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান ও সবশেষে রূহ সঞ্চার। মৃত্তিকাজাত সকল প্রাণীর জীবনের প্রথম ও মূল একক (Unit) হ’ল ‘প্রোটোপ্লাজম’ (Protoplasm)। যাকে বলা হয় ‘আদি প্রাণসত্তা’। এ থেকেই সকল প্রাণী সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য ফরাসী চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলী (১৯২০-১৯৯৮ খৃ.) একে Bomb shell বলে অভিহিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মাটির সকল প্রকারের রাসায়নিক উপাদান। মানুষের জীবন বীজে প্রচুর পরিমাণে ৪টি উপাদান পাওয়া যায়। অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ও হাইড্রোজেন।
আর ৮টি পাওয়া যায় সাধারণভাবে সমপরিমাণে। সেগুলি হ’ল- ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন, সালফার ও আয়রণ। আরও ৮টি পদার্থ পাওয়া যায় স্বল্প পরিমাণে। সিলিকন, মোলিবডেনাম, ফ্লুরাইন, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, আয়োডিন, কপার ও যিংক। এই ২০টি উপাদান সংমিশ্রিত করে জীবনের কণা বা Protoplasm তৈরী হয়। জনৈক বিজ্ঞানী ১৫ বছর ধরে উক্ত উপাদানগুলি মিশিয়ে জীবন সৃষ্টির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। জনৈক বিজ্ঞানী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এসব মৌল উপাদান সংমিশ্রিত করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাতে কোন জীবনের ‘কণা’ পরিলক্ষিত হয়নি (সৃষ্টিতত্ত্ব ৪০৮ পৃ.)। এই সংমিশ্রণ ও তাতে জীবন সঞ্চার আল্লাহ ব্যতীত কারু পক্ষে সম্ভব নয়। বিজ্ঞান এক্ষেত্রে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে (নবীদের কাহিনী ১/২৪)।
কেননা রূহ সৃষ্টির ক্ষমতা কারু নেই। যেমন আল্লাহ বলেন,وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَآ أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلاَّ قَلِيلاً- ‘আর ওরা তোমাকে প্রশ্ন করছে ‘রূহ’ সম্পর্কে। তুমি বল, রূহ আমার প্রতিপালকের একটি আদেশ মাত্র। আর এ বিষয়ে তোমাদের অতি সামান্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৮৫)। তিনি বলেন,إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَآ أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَّقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ- فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَّإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ- ‘যখন তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন তাকে কেবল বলেন, হও। অতঃপর তা হয়ে যায়’। ‘অতএব (সকল প্রকার শরীক হ’তে) মহা পবিত্র তিনি, যার হাতে রয়েছে সবকিছুর রাজত্ব এবং তাঁর দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (ইয়াসীন ৩৬/৮২-৮৩)।
সপ্তম শ্রেণীর ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ে লেখা হয়েছে, শিক্ষার্থী ‘নিসর্গ’ বলছে, ‘আমাদের আদি পুরুষেরা নাকি বানর ছিল?’ উত্তরে শিক্ষিকা ‘খুশি আপা’ তাদেরকে ‘লুসি’র গল্প শোনালেন। আর তা এই যে, ১৯৭৪ সালের ২৪শে নভেম্বর ইথিওপিয়ার হাডর এলাকায় বহু পুরানো একটি ফসিল কংকালের কিছু অংশ পাওয়া যায়। গবেষকরা বলছেন, এই কংকাল ছিল ৩২ লক্ষ বছর পূর্বেকার একজন নারীর। যার পায়ের হাড় ছিল প্রায় মানুষের মতোই। অতঃপর ‘খুশি আপা’র নির্দেশ মতে শিক্ষার্থীরা মানুষ ও সমাজ কোথা থেকে এলো’ সেটি বের করার জন্য স্ব স্ব কল্পনা মোতাবেক পরের দিন এ্যসাইনমেন্ট জমা দিল। অতঃপর ‘বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে চারপাশ দেখি’ অধ্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারা একটি ‘ফ্লো’ ছক তৈরী করে ফেলল। যেখানে ‘বিভিন্ন সময়ের মানুষ’ শিরোনামে ৪টি ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, বানর থেকে তারা অবশেষে একটি যুবতী নারীতে পরিণত হয়েছে। ‘খুশী আপা’ সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। তাতে সবাই উক্ত পরিকল্পনার প্রশংসা করল।
যদি একথা সত্য হয়, তাহ’লে প্রশ্ন হয় বর্তমান যুগের মানুষ আর ৩২ লক্ষ বছর পূর্বেকার ‘ফসিলে’র বানর কি একই? ‘ফসিলে’র ঐ বানর কি এ যুগের মানুষের মত কথা বলতে পারত? তাদের কি এ যুগের মানুষের মত মেধা ছিল? এ যুগের কথিত এসব পন্ডিতদের কান্ড দেখে মূসা (আঃ)-এর উম্মতের কথা মনে পড়ে। যখন তিনি ‘তাওরাত’ গ্রহণের জন্য ৪০ দিনের মেয়াদে তূর পাহাড়ে দ্রুত গমন করেন এবং বনু ইস্রাঈলদের তার পিছে পিছে আসতে বলেন। সেই সময় তার অনুপস্থিতিতে মুনাফিক ‘সামেরী’ স্বর্ণালংকার সমূহ পুড়িয়ে একটা গোবৎসের মূর্তি তৈরী করে। যা থেকে এক প্রকার শব্দ বের হ’ত। এতে সামেরী ও তার সঙ্গী-সাথীরা উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, هَذَا إِلَهُكُمْ وَإِلَهُ مُوسَى فَنَسِيَ- ‘এটাই হ’ল তোমাদের উপাস্য ও মূসার উপাস্য। যা সে পরে ভুলে গেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৮)।
মূসা (আঃ)-এর তূর পাহাড়ে গমনকে সে অপব্যাখ্যা দিয়ে বলল, মূসা বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছে। এখন তোমরা সবাই গো-বৎসের পূজা কর’।
মূসার বড় ভাই হারূণ (আঃ) তাদেরকে বললেন, ‘হে আমার কওম! তোমরা এই গো-বৎস দ্বারা পরীক্ষায় পতিত হয়েছ। তোমাদের পালনকর্তা অতীব দয়ালু। অতএব তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল’। ‘কিন্তু সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল, মূসা আমাদের কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজায় রত থাকব’ (ত্বোয়াহা ২০/৯০-৯১)।
বস্ত্ততঃ গো-বৎসের শব্দ থেকেই তারা ফিতনায় পড়ে গিয়েছিল (কুরতুবী)। অথচ সে কোন কথা বলতে পারত না এবং সে ছিল মুক-বধির ও বোবা। তবুও ইহূদী নেতারা তাকেই উপাস্য ভেবে নিয়ে পূজা শুরু করল। এ যুগেও কথিত ‘ফসিলে’র ধোঁকায় পড়ে জ্ঞানী-গুণী লোকেরা নিজেদের আদি পুরুষ বানর ছিল বলে ধারণা করেছেন। অথচ এরূপ চিন্তা করাটাও মানুষের জন্য অপমানকর।
সেদিন মূসা (আঃ) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারীদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন (বাক্বারাহ ২/৫৪)। এভাবে তাদের কিছু লোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়।
অতঃপর তিনি উক্ত শিরকের প্রচলনকারী সামেরীর শাস্তি ঘোষণা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘মূসা বলল, দূর হও। তোর জন্য সারা জীবন এ শান্তিই রইল যে, তুই বলবি, ‘আমাকে স্পর্শ করো না’। আর তোর জন্য রইল একটি নির্দিষ্ট সময়কাল। যার ব্যতিক্রম হবে না। তুই তোর সেই উপাস্যের প্রতি লক্ষ্য কর যাকে নিয়ে তুই থাকতিস। আমরা সেটিকে (গো-বৎসটিকে) জ্বালিয়ে দেবই। অতঃপর ওটাকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে ছড়িয়ে দেবই’ (ত্বোয়াহা ২০/৯৫-৯৭)।
অর্থাৎ মূসা (আঃ) সামেরীর জন্য পার্থিব জীবনে এই শাস্তি নির্ধারণ করেন যে, সবাই তাকে বর্জন করবে এবং কেউ তার কাছে ঘেঁষবে না। তিনি তাকেও নির্দেশ দেন যে, সে কারও গায়ে হাত লাগাবে না। সারা জীবন এভাবেই সে বন্য জন্তুর ন্যায় সবার কাছ থেকে আলাদা থাকবে। এটাও সম্ভবপর যে, পার্থিব আইনগত শাস্তির ঊর্ধ্বে খোদ তার সত্তায় আল্লাহর হুকুমে এমন বিষয় সৃষ্টি হয়েছিল, যদ্দরুন সে নিজেও অন্যকে স্পর্শ করতে পারত না এবং অন্যেরাও তাকে স্পর্শ করতে পারত না।
যেমন এক বর্ণনায় এসেছে যে, মূসা (আঃ)-এর বদদো‘আয় তার মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সে কাউকে হাত লাগালে বা কেউ তাকে হাত লাগালে উভয়েই জ্বরাক্রান্ত হয়ে যেত’ (কুরতুবী, ত্বোয়াহা ২০/৯৫)। এই ভয়ে সে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরত। কাউকে নিকটে আসতে দেখলেই সে চীৎকার করে বলে উঠতো لامِسَاسَ ‘আমাকে কেউ স্পর্শ করো না’। বস্ত্ততঃ মৃত্যুদন্ডের চাইতে এটিই ছিল কঠিন শাস্তি। যা দেখে অপরের শিক্ষা হয়।
প্রশ্ন হ’ল, বর্তমান যুগের এসব বানরবাদীদের শাস্তি কে দিবে? অথচ দেশের বানরগুলির একটিও মানুষ না হ’লেও মানুষের বাচ্চাগুলি সর্বত্র বাঁদরামী করছে। ইভটিজিং, খুন-ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক সেবন ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। প্রশাসন তাদেরকে ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সমাজ এদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে। এরপরেও সরকারী শিক্ষা সিলেবাসের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। যাতে সমাজের অধঃপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। কি কৈফিয়ত দিবেন প্রশাসন ক্বিয়ামতের দিন?
[1]. মুমিনূন ২৩/১২-১৪; মুমিন ৪০/৬৭; ফুরক্বান ২৫/৪৪; তারেক্ব ৮৬/৫-৭।
[2]. বুখারী হা/১৩০; মুসলিম হা/৩১৩; মিশকাত হা/৪৩৩-৩৪ ‘গোসল’ অনুচ্ছেদ।
[3]. বুখারী হা/৭৪৫৪; মুসলিম হা/২৬৪৩; মিশকাত হা/৮২ ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ।
[4]. নিসা ৪/১; বুখারী হা/৩৩৩১; মুসলিম হা/১৪৬৮; মিশকাত হা/৩২৩৮ ‘বিবাহ’ অধ্যায়।