ফেব্রুয়ারি 2023

অডিও অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অধ্যাপক গোলাম আযম অধ্যাপক নূরুল ইসলাম অধ্যাপক মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোঃ নুরুল ইসলাম আকারুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম আবদুল্লাহ নাজীব আবদুস শহীদ নাসিম আবু বকর বিন হাবীবুর রহমান আবুল কালাম আজাদ আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজীজ আস সুদাইস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী আব্দুল আযীয আব্দুল আযীয ইবন আহমাদ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায আব্দুল হামিদ ফাইযী আব্দুল হামীদ আল ফাইযী আব্দুল হামীদ আল মাদানী আব্দুল্লাহ আল কাফী আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আসসাদ আব্দুল্লাহ ইবনে জাহান আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে ইবরাহীম আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ সালাফী আমিনুল ইসলাম আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিম আশরাফ আলী থানভী আহমাদ মুসা জিবরীল ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ আল হাকীল এ এন এম সিরাজুল ইসলাম কামারুজ্জামান বিন আব্দুল বারী কুরবানী খন্দকার আবুল খায়ের খালেদ আবু সালেহ খুররম জাহ মুরাদ জহুর বিন ওসমান জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আযযাইদ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ড. জাকির নায়েক ড. মোঃ আব্দুল কাদের ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ড. রুকাইয়্যাহ বিনতে মুহাম্মদ আল মাহারিব ড. সায়ীদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী ডক্টর মুহাম্মদ মুশাররফ হুসাইন ডাঃ দেওয়ান একেএম আবদুর রহীম নামায নারী নূর মুহাম্মদ বদীউর রহমান পরকালের আমল প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিয়া প্রবন্ধ প্রশ্ন-উত্তর ফজলুর রহমান ফয়সাল বিন আলি আল বাদানী বিষয়ভিত্তিক মহানবী মাও হুসাইন বিন সোহরাব মাওলানা আবদুল আলী মাওলানা আবদুস সাত্তার মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা মোঃ আবদুর রউফ মাওলানা মোঃ ফযলুর রহমান আশরাফি মাসুদা সুলতানা রুমী মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম মুফতি কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান মুযাফফার বিন মুহসিন মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আততুওয়াইযীরি মুহাম্মদ গোলাম মাওলা মুহাম্মদ চৌধুরী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মুহাম্মদ তাকী উসমানী মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মুহাম্মদ শহীদুল মুলক মুহাম্মদ সলেহ আল মুনাজ্জেদ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমীন মোঃ সাইফুল ইসলাম মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দ মোস্তাফিজুর রহমানের ইবনে আব্দুল আযীয আল মাদানী মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে রজব আল হাম্বলী রফিক আহমাদ শাইখ নাসেরুদ্দিন আল আলবানী শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী শাইখ সালেহ বিন ফাওযান শাইখ হোসাইন আহমাদ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ শামসুল আলম সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী সানাউল্লাহ নজির সানাউল্লাহ নজির আহমদ সাহাবীদের জীবনী সিয়াম হাফিয মুহাম্মাদ আইয়ুব বিন ইদু মিয়া

 

 পশুর পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় ঐ পশু কুরবাণী করা যাবে কি?




উত্তর : পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় পশু কুরবাণী করায় শরী‘আতে কোন বাধা নেই। এছাড়া উক্ত পশুর গোশত খাওয়া যাবে। এমনকি রুচি হ’লে পেটের বাচ্চাও খেতে পারে। আবু সাঈদ খুদরী বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমরা উটনী, গাভী ও ছাগী যবেহ করি এবং কখনো কখনো আমরা তার পেটে বাচ্চা পাই। আমরা ঐ বাচ্চা ফেলে দিব, না খাব? রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘তোমাদের ইচ্ছা হ’লে খাও। কারণ বাচ্চার মাকে যবেহ করা বাচ্চাকে যবেহ করার শামিল’ (আবুদাউদ হা/২৮২৮; মিশকাত হা/৪০৯১-৯২)

হযরত আনাস বিন মালেক আল আনসারী রাদিয়াতকে আনহু

“হে আল্লাহ তাকে সম্পদ ও সন্তান দান করুন এবং তাকে বরকত দান করুন।”
[তাঁর জন্য রাসূল মালাধাই-এর বিশেষ দোয়া]
আনাস আমি যখন ফুটন্ত গোলাপের বয়সি ছিলেন তখনই তাঁর মা গুমাইসা যদিশাহার তাঁকে কালেমায়ে শাহাদাত শিখিয়ে দিলেন। তাঁর মায়ের কোমল হৃদয় ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সামাধান -এর ভালোবাসায় সিক্ত ছিল।

তেমনি হযরত আনাস তাঁর মায়ের থেকে শুনে শুনে নবী করীম সানাহার-এর ভালোবাসায় আসক্ত হয়ে পড়েন। এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। কেননা কখনো কখনো চোখে দেখার চেয়েও কানে শুনার দ্বারা মানুষ বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আর তাই এই ছোট শিশু মক্কায় গিয়ে নবী করীম সালাহাই-কে এক নযর দেখে সৌভাগ্যবান হওয়ার কতই না আশা করত ৷ তবে তাকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি, এরই মধ্যে রাসূল সমাধান ও তাঁর হিজরতের সাথি হযরত আবু বকর সিদ্দিক সৌভাগ্যবতী ও আশীর্বাদপ্রাপ্ত ভূমি ইয়াসরিবের দিকে তাঁদের হিজরতে সফর শুরু করেন। এতে মদিনার প্রতিটি ঘরে খুশির বাতাস বইতে শুরু করে আর সকলের অন্তর আনন্দের জোয়ারে ভাসতে থাকে। তখন থেকে সকলের দৃষ্টি ও অন্তর নবী করীম সালামাহ ও তাঁর হিজরতে সাথির পথপানে অপলক চেয়ে রইল । মদিনার যুবকেরা নবী করীম সানাহার-এর আগমনের বার্তা প্রতি দিন সকাল হলে এ বলে প্রচার করত- মুহাম্মদ মদিনায় আগমন করেছেন...................... মুহাম্মদ মদিনায় আগমন করেছেন......................
এ প্রচার শুনে হযরত আনাস অন্যান্য শিশুদের সাথে সেই দিকে দৌড় দিতেন, কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে না পেয়ে বিষণ্ন মনে ফিরে আসতেন।এক সুন্দর সকালে কিছু লোক ইয়াসরিবে ঘোষণা করল- মুহাম্মদ ও তাঁর হিজরতের সাথি মদিনার অতি নিকটে চলে এসেছেন।

এ ঘোষণা শুনে সকলে অধীর আগ্রহে ওই মোবারকময় পথের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল যে পথ কল্যাণময় ও সঠিক পথের প্রদর্শক নবীকে তাদের নিকটে নিয়ে আসবে এবং তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্যে দলে দলে তারা এগিয়ে যেতে লাগল । শিশুদের দলগুলো মানুষের ভিড়ের মাঝে অবস্থান নিল। তাদের চেহারায় আনন্দ- বন্যা বইয়ে যাচ্ছিল যা তাদের কচি মন ও ছোট হৃদয়গুলোকে খুশিতে ভরে দিচ্ছে। আর সেই শিশুদের দলগুলোর অগ্রভাগে ছিলেন হযরত আনাস বিন মালেক

নবী করীম সালাম তাঁর সাহাবী আবু বকর -কে সাথে নিয়ে মদিনায় এসে পৌঁছলেন। তখন তাঁদেরকে আবাল বৃদ্ধ বণিতা নির্বিশেষে সবাই স্বাগতম জানাতে লাগল । আর অন্দর মহলের মহিলারা ও ছোট ছোট শিশুরা উঁচুস্থানে আরোহণ করে নবী করীম সালাহাই-কে দেখতে লাগল আর বলতে লাগল-
কোন ব্যক্তি তিনি ? -
কোন ব্যক্তি তিনি?..
এ সকল কারণে সেই দিনটি ছিল স্মরণীয় একটি দিন। যা শত বছর পার হওয়ার পরেও হযরত আনাস -এর স্মরণে ছিল ।

নবী করীম মদিনায় অবস্থান করতে থাকলেন; এরই মাঝে একদিন উম্মে আনাস গুমাইসা বিনতে মিলহান বাদি হার তাঁর পুত্র আনাসকে নিয়ে নবী করীম স্যালাইছি-এর খেদমতে হাজির হলেন। তখন তাঁর সাথে তাঁর ছেলেও ছিল। যে তাঁর আশপাশে ছুটা-ছুটি করছিল। আর তখন তার চুলগুলো কপালের ওপর হাওয়ায় উড়তে ছিল।

তিনি নবী করীম -কে অভিবাদন জানানোর পর বললেন:
“হে আল্লাহর রাসূল সালালাহ ! আনসারী সকল পুরুষ ও মহিলা আপনাকে কিছু না কিছু হাদিয়া দিয়েছে, কিন্তু আমার কাছে আপনাকে হাদিয়া দেওয়ার মতো কিছুইনেই সুতরাং আপনি আমার এই ছেলেকে আপনার খাদেম হিসেবে গ্রহণ করুন, যাতে করে সে আপনার মর্জি অনুযায়ী আপনার খেদমত করতে পারে।”
নবী করীম এতে আনন্দিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তাঁকে পরিবারের একজন সদস্য করে নিলেন ।

হযরত আনাস যাঁকে আদর করে উনাইস বলে ডাকা হতো, তিনি যেদিন রাসূল -এর খেদমতে নিয়োজিত হয়ে সৌভাগ্যবান হলেন ওই দিন তাঁর বয়স ছিল মাত্র দশ বছর । তিনি ওই দিন থেকে নবী করীম সামাধান তাঁর প্রতিপালকের সাথে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তাঁর কোলে ও তত্ত্বাবধানে জীবন অতিবাহিত করেন । আর এতে তিনি রাসূল -এর সংস্পর্শে তাঁর জীবনের পূর্ণ দশ বছর অতিবাহিত করার সুযোগ লাভ করেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি নবী করীম থেকে হেদায়াতের এমন সুধা পান করেন যার দ্বারা তাঁর অন্তর পবিত্রতা লাভ করেছে, এবং তাঁর থেকে মতো সংখ্যক হাদীস সংরক্ষণ করেন যা দ্বারা তাঁর বক্ষ পরিপূর্ণ হয়েছে। তিনি নবী করীম -এর এমন এমন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত হলেন যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানতে পারেনি। হযরত আনাস রাদিয়ার নবী করীম থেকে এমন ভালোবাসা ও আদর স্নেহ পেয়েছেন যা কোনো পুত্র তার পিতা থেকেও পায়নি। শুধু তাই না; বরং তিনি নবী করীম সালাহাই-এর উত্তম চরিত্র ও সুন্দর ব্যবহারের স্বাদ এমনভাবে গ্রহণ করেছেন যা দেখে দুনিয়াবাসী ঈর্ষান্বিত হয়েছে। তাঁর প্রতি নবী করীম -এর ব্যবহার কেমন ছিল তা তাঁর বর্ণিত হাদীস পড়ে আমরা সহজে উপলব্ধি করতে পারব। কেননা তাঁর নিজস্ব বর্ণনাটি ওই ব্যাপারে আমাদেরকে সহজে ও ভালোভাবে বুঝাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে ।

হযরত আনাস জমি বলেন:
“রাসূল ম্যালাহাই ছিলেন সবার চেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, সবার চেয়ে উদার মনের অধিকারী এবং সবার চেয়ে অধিক দয়ার অধিকারী। তিনি একদিন আমাকে কোনো এক প্রয়োজনে এক জায়গায় পাঠালেন, আমি বের হলাম, কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল আমি বাজারে গিয়ে অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করব। আর খেলাধুলা করার জন্যেই তিনি আমাকে যে কাজের আদেশদিয়েছেন সেই কাজে আমি যায়নি। যখন আমি তাদের নিকটে গিয়ে পৌঁছলাম তখন আমি আমার পেছনে কোনো এক ব্যক্তির অস্তিত্ব অনুভব করলাম। তিনি আমার কাপড় টেনে ধরলেন। আমি ফিরে দেখি তিনি অন্য কেউ না তিনি স্বয়ং রাসূল । তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন: হে উনাইস! আমি তোমাকে যেখানে যাওয়ার জন্যে বলেছি সেখানে গিয়েছ?

তখন আমি হতভম্ব হয়ে গিয়ে বললাম: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এখনই যাচ্ছি। আল্লাহর শপথ! আমি দশ বছর নবী করীম -এর খেদমত করেছি, কিন্তু তিনি কখনো আমার কোনো কাজে আমাকে এ কথা বলেননি “তুমি কেন এটি করেছ” অথবা কোনো কাজ না করার কারণে তিনি এও বলেননি “তুমি কেন তা করনি।”নবী করীম হযরত আনাসকে আদর করে উনাইস বলে ডাকতেন। যার কারণে তিনি কখনো তাঁকে “উনাইস” বলে ডাকতেন আবার কখনো ডাকতেন “হে আমার ছেলে।” নবী করীম তাঁকে প্রচুর পরিমাণে উপদেশ ও নসীহত করতেন যা তাঁর অন্তরকে পরিপূর্ণ করেছে এবং জ্ঞানকে পূর্ণতা দিয়েছে । উপদেশগুলো এমন ছিল.... “হে বৎস! কারো প্রতি কোনো প্রকার হিংসা ও বিদ্বেষ ব্যতীত যদি তুমি সকাল ও সন্ধ্যা অতিবাহিত করতে সক্ষম হও, তবে তুমি তা কর। “হে বৎস! এটি আমার সুন্নাত আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে জীবিত করল সে আমাকে ভালোবাসে... আর যে আমাকে ভালোবাসে সে জান্নাতে আমার সাথেই থাকবে... “হে বৎস! তুমি যখন তোমার পরিবারের নিকটে প্রবেশ করবে তখন তাদেরকে সালাম দিবে কেননা তা তোমার জন্য ও তোমার পরিবারের জন্য বরকতময় হবে।”
হযরত আনাস আমি তো নবী করীম -এর ইন্তেকালের পরে আশি বছরের অধিক বেঁচে ছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ে তাঁর অন্তর নবী করীম -এর ভরে যায় এবং নবুওয়াতের ফিক্হী জ্ঞানে তাঁর আকল পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আর ওই সকল জ্ঞান দ্বারা সাহাবী ও তাবেয়ীদের অন্তর জীবিত হতো। যে সকল জ্ঞান তিনি রাসূল -এর পথ-প্রদর্শনা থেকে প্রচার করতেন এবং রাসূল - এর পবিত্র বাণী ও মহান কর্ম থেকে বর্ণনা করতেন।

মুসলমানদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে হযরত আনাস তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন। যখন তারা কোনো কাজে জটিলতায় পড়তো তখন তারা তাঁর নিকটে ছুটে আসত অথবা কোনো বিধান যদি তাদের বুঝে না আসত তারা ওই বিধানের ব্যাপারে তাঁর সমাধান মেনে নিতো । এই রকম একটি ঘটনা- ধর্ম নিয়ে বিতর্ককারী কিছু লোক, কিয়ামতের দিনে রাসূল সালামাই-এর হাউজে কাউসারের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক শুরু করল। অতঃপর তারা এর সমাধানের জন্য হযরত আনাস সিরাতাল -এর নিকটে আসল। তিনি বললেন: “আমি এ ধারণা করেছি যে, আমার জীবিত অবস্থায় তোমাদের কিছু লোক হাউজে কাউসার নিয়ে বিতর্ক করবে। আমি আমার জীবনে এমন কোনো নামাজ আদায় করিনি যে নামাজে রাসূল সানাহার-এর হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করার দোয়া করিনি।” হযরত আনাস তার জীবনে অধিকাংশ সময় রাসূল -এর সাথে অতিবাহিত করা দিনগুলোর বর্ণনা করে কাটাতেন । তিনি যেদিন রাসূল -এর কাছে এসেছেন সেই দিনের কথা বলে খুব আনন্দ প্রকাশ করতেন, আর যেদিন রাসূল বিদায় নিয়ে চলে গেলেন সেই দিনের কথা বলে খুব কান্নাকাটি করতেন । তিনি রাসূল -এর কথা ও কাজ অনুসরণ করার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন । রাসূল যা পছন্দ করতেন তিনিও তা পছন্দ করতেন আর রাসূল যা অপছন্দ করতেন তিনিও তা অপছন্দ করতেন। তিনি দুইটি দিনের কথা বেশি বেশি বলতেন:
ওই দিনের কথা যেদিন রাসূল -এর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। আর ওই দিনের কথা যেদিন রাসূল -এর সাথে তাঁর শেষ সাক্ষাতের সমাপ্তি হলো।যখন তিনি প্রথম দিনের কথা বলতেন তখন তিনি খুব গর্ব বোধ করতেন এবং খুব আনন্দিত হতেন। আর যখন দ্বিতীয় দিনের কথা বলতেন তখন নিজেও খুব কাঁদতেন, মানুষদেরকেও কাঁদাতেন । তিনি বেশি বেশি বলতেন: আমি রাসূল -কে দেখেছি যেদিন তিনি আমাদের মাঝে আগমন করেন। আর ওই দিনও দেখেছি যেদিন তিনি আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। এই দুই দিনের মতো আর কোনো দিন দেখিনি ৷ যেদিন তিনি মদিনায় আগমন করেন সেই দিন মদিনার সবকিছু আলোকিত হয়েছিল....

আর যেদিন তিনি আমাদেরকে ছেড়ে তাঁর প্রতিপালকের কাছে চলে গেলেন সেই দিন সবকিছু অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল..

আমি শেষবার যেদিন রাসূল -এর দিকে তাকালাম সেদিন ছিল সোমবার যখন তাঁর কক্ষের পর্দা খুলে ফেলা হলো। তখন আমি তাঁর চেহারা মোবারক দেখলাম পবিত্র পাতার মতো। সেদিন সকল মানুষ আবু বকর -এর পিছনে দাঁড়িয়ে রাসূল -কে দেখছিল। মানুষ খুব অস্থির হয়ে যাচ্ছিল, আবু বকর সবাইকে স্থির থাকার ইশারা করলেন। এরপর এ দিনের শেষ মুহূর্তে রাসূল বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তাঁকে মাটিতে ঢেকে দেওয়ার পর থেকে আমরা তাঁর চেহারা মোবারকের মতো উত্তম আর কিছুই দেখতে পাইনি । নবী করীম হযরত আনাসের জন্যে অনেক বার দোয়া করেছিলেন....... তাঁর দোয়ার মধ্যে বিশেষ একটি দোয়া- “হে আল্লাহ! তাকে সম্পদ ও সন্তান দান করুন এবং তাকে বরকত দান আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর এই দোয়া কবুল করেছেন। আর এই কারণে হযরত আনাস আর আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সন্তান ও সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনীর সংখ্যা এক শতের উপরে দেখে গেছেন । শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর হায়াতেও বরকত দান করেছেন। তিনি পূর্ণ এক শতাব্দী বেঁচে ছিলেন। তিনি একশত তিন বছর হায়াত পেয়েছেন।
হযরত আনাস রাশিয়ার কিয়ামতের দিন রাসূল -এর শাফায়াত পাওয়ার অনেক বেশি আশা করতেন। আর এই কারণেই তিনি বেশি বেশি বলতেন:

“আমি অবশ্য কিয়ামতের দিন রাসূল সালামাহ -এর সাক্ষাৎ আশা করি । আর রাসূল -এর সাথে সাক্ষাৎ হলে আমি বলব: হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সেই ছোট খাদেম উনাইস।” যখন হযরত আনাস মৃত্যু শয্যায় শায়িত হলেন তিনি তাঁর পরিবারের লোকদেরকে বললেন: তোমরা আমাকে “লা ইলাহা ইল্লাহ”-এর তালক্বীন দাও । এরপর তিনি কালেমা পড়তে পড়তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন । তিনি অসীয়ত করে গিয়েছিলেন রাসূল -এর একটি ছোট লাঠি তা যেন তাঁর সাথে কবরে দেওয়া হয়। আর ওই লাঠিটা তাঁর অসীয়ত মতো তাঁর কোমর ও জামার মাঝে রাখা হয়েছিল।

আল্লাহ তাআলা কল্যাণকর যা কিছু হযরত আনাস -কে দান করেছেন তা তাঁর জন্য সুখকর হোক । সাপ্তাহার-এর কোলে পুরো দশ বছর অতিবাহিত করেছিলেন। তিনি রাসূল হাদীস বর্ণনাকারীদের মাঝে তিনি তৃতীয়। হযরত আবু হুরায়রা ও হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমরের পরেই তাঁর স্থান।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে আর তাঁর মাকে ইসলাম ও সকল মুসলমানদের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

তথ্য সূত্র
১. আল ইসাবাহ্ – ১ম খণ্ড, ৭১ পৃ. ।
২. আল ইসতিআ'ব – ১ম খণ্ড, ৭১ পৃ.।
৩. তাহযীবুত্‌ তাহযীব - ১ম খণ্ড, ৩৭৬ পৃ.
৪. আল জাউ বায়না রিজালিস্ সহীহাইন – ১ম খণ্ড, ৩৫ পৃ.
৫. উদুল গবাহ্ - ১ম খণ্ড, ২৫৭ পৃ.।
৬. সিফাতুস্ সফওয়াতে – ১ম খণ্ড, ২৯৮ পৃ.
৭. আল মাআরিফ – ১৩৩ পৃ.
৮. আল ইবরু – ১ম খণ্ড, ১০৭ পৃ.।
৯. সিরাতু বাতল – ১০৭ পৃঃ ।
১০. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী - ৩য় খণ্ড, ৩২৯ পৃ. 1
১১. ইবনু আসাকির - ৩য় খণ্ড, ১৩৯ পৃ.।
১২. আল জারহু ওয়াতা'দীল – ১ম খণ্ড, ২৮৬ পৃ.


রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ভালবাসা


ভূমিকা : পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে এমনকি নিজের, নিজ পরিবারের ও সন্তান-সন্ততির চাইতেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সর্বাধিক ভালবাসা প্রত্যেক মুসলমানের উপর অবশ্য কর্তব্য। আর রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার দাবী হ’ল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত সকল বাণী ও বিধানকে মেনে নেওয়া এবং এগুলির কোন একটিকেও উপেক্ষা না করা। অথচ রাসূল (ছাঃ)-এর উপর পবিত্র এই ভালবাসার ক্ষেত্রে কতিপয় মুসলমান অতিভক্তির আতিশয্যে বিভিন্ন রকম শিরক-বিদ‘আতে লিপ্ত হয়ে থাকে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা পেশ করার প্রয়াস পাব।-

রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার উদ্দেশ্য : রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার কতিপয় বিশেষ ও মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন- (১) আল্লাহর ভালবাসাকে গুরুত্ব দেওয়া। কেননা রাসূল (ছাঃ)-কে ভালাবাসা আল্লাহর ভালবাসা অর্জনেরই অন্যতম উপায়। (২) রাসূল (ছাঃ) সকল নবী-রাসূলগণের মধ্যে সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং তিনি ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তান থেকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হবেন। (৩) তিনি আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীনকে যথাযথভাবে প্রচার করেছিলেন। (৪) শরী‘আতের বিধানের ক্ষেত্রে তিনি স্বীয় উম্মতের উপর রহমদিল ছিলেন। (৫) তিনি তাঁর উম্মতকে যথাসাধ্য নছীহত করেছেন এবং আল্লাহর পথে দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে সম্ভবপর ধৈর্যধারণকারী ছিলেন। (৬) তিনি মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। (৭) রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসা দুনিয়া এবং আখেরাতে ছওয়াব লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই তাঁকে ভালবাসার জন্য আমাদেরকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে চেষ্টা করতে হবে।

রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার ঈমানী আলামত

রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার বেশকিছু ঈমানী আলামত বা নিদর্শন রয়েছে। নিম্নে কতিপয় আলামত উল্লেখ করা হ’ল।-

(১) সৃষ্টির সকলের চাইতে রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসাকে প্রধান্য দেওয়া : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’লেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট নবী ও রাসূল এবং তিনি পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রেরিত রহমত স্বরূপ। তাই তাঁকে যথাসাধ্য ভালবাসতে হবে। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌنِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ، وَاللهُ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ- ‘তুমি বল, তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, নিজ বংশ ও ধন-সম্পদ সমূহ তোমরা যা আয় কর, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা হওয়ার আশংকা কর এবং বাসস্থান, তোমরা যাকে ভালবাস, আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চাইতেও যদি এগুলি অধিক প্রিয় হয়; তাহ’লে তোমরা আল্লাহর শাস্তি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না’ (তওবা ৯/২৪)

(ক) নিজের পিতা-পুত্রের চাইতে রাসূল (ছাঃ)-কে অধিক ভালবাসা : এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,اَلنَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ، وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ، إِلَّآ أَنْ تَفْعَلُوآ إِلَى أَوْلِيَآئِكُمْ مَّعْرُوفًا، كَانَ ذَالِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا- ‘নবী (মুহাম্মাদ) মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ট এবং তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মা। আর আল্লাহর কিতাবে রক্ত সম্পর্কীয়গণ পরস্পরের অধিক নিকটবর্তী অন্যান্য মুমিন ও মুহাজিরদের চাইতে। তবে তোমরা যদি তাদের প্রতি সদাচরণ কর সেটা স্বতন্ত্র বিষয়। আর এটাই মূল কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে’ (আহযাব ৩৩/৬)

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছঃ) এরশাদ করেন,لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَّالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ- ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকটে সর্বাধিক প্রিয় হব তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ হ’তে’।[1]

(খ) নিজের পরিবার এবং ধন-সম্পদের চাইতে রাসূল (ছাঃ)-কে অধিক ভালবাসা : আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছঃ) বলেন,لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ- ‘কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকটে সর্বাধিক প্রিয় হব তার পরিবার, ধন-সম্পদ ও সকল মানুষ হ’তে’।[2]

(গ) নিজের জীবনের চাইতেও রাসূল (ছাঃ)-কে সর্বাধিক ভালবাসা : আব্দুল্লাহ বিন হিশাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম এমতাবস্থায় যে, তিনি তখন ওমরের হাত ধরেছিলেন। ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিজের জীবন ব্যতীত আপনি আমার কাছে সকল কিছুর চাইতে অধিক প্রিয়। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন,لاَ وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ فَإِنَّهُ الآنَ وَاللهِ لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ نَفْسِى، فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- الآنَ يَا عُمَرُ- ‘না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! যতক্ষণ না আমি তোমার নিকটে তোমার জীবনের চাইতে প্রিয় হবো (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণ মমিন হ’তে পারবে না)। একথাশুনে ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবনের চাইতেও অধিক প্রিয়। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, হে ওমর তুমি এখন প্রকৃত ঈমানদার হ’তে পারলে!’।[3]

(২) রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত সমূহকে যথাযথভাবে ভালবাসা : তাঁর নির্দেশিত যেকোন বিষয় মেনে নেওয়া এবং সে বিষয়ে কোনরূপ ওযর-আপত্তি পেশ না করা। সেই সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহগুলির কোন একটি নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوآ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَّقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ- ‘মুমিনদের কথা তো কেবল এটাই হবে, যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয় তাদের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য, তখন তারা বলবে আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর তারাই হবে সফলকাম’ (নূর ২৪/৫১)

(৩) রাসূল (ছাঃ)-এর সীরাত গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করা : রাসূল (ছাঃ)-এর জীবন চরিত গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করা এবং তাঁর আদর্শে মুমিনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে সাধ্যমত ঢেলে সাজানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

(৪) রাসূল (ছাঃ)-এর উপর অধিকহারে দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত। তাই তাঁর উপর অধিকহারে দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা মুমিনের জন্য আবশ্যক। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّ اللهَ وَمَلَآئِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ، يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা তার প্রতি দরূদ ও যথাযথভাবে সালাম প্রেরণ কর’ (আহযাব ৩৩/৫৬)

(৫) রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবী ও পরিবারবর্গকে ভালবাসা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবায়ে কেরাম এবং পরিবারবর্গকে ভালবাসা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। অথচ মুসলিম নামধারী শী‘আরা হাতে গোণা কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত বাকীদেরকে ‘কাফের’ গণ্য করার ধৃষ্টতা দেখাতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। এবিষয়ে প্রকৃত মুমিনদের কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,وَالَّذِينَ جَآءُوا مِنْم بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ، وَلاَ تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلاَّ لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ- ‘যারা পরে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর, যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রবর্তী। আর যারা ঈমান এনেছে তাদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনরূপ হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয়ই তুমি অতিশয় করুণাময়, পরম দয়ালু’ (হাশর ৫৯/১০)

যায়েদ বিন আরক্বাম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) একদা আলোচনায় দাঁড়িয়ে বললেন,...وَأَهْلُ بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، ‘আর আমার পরিবারবর্গের বিষয়ে আমি তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি’।[4] অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গের যথাযথ সম্মান বজায় রাখতে হবে।

অথচ এই ভালবাসার অপব্যবহার করে আমাদের দেশে ‘আওলাদে রাসূল’ বা রাসূলের বংশধর হওয়ার দাবীদারগণ ধর্মপ্রাণ জনগণের নযর-নেয়াযের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে স্ব-ঘোষিত ‘আওলাদে রাসূল’-এর মিথ্যা ফযীলত বর্ণনা করে থাকেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা বংশপরম্পরায় রাসূল (ছাঃ)-এর বংশের সাথে মিলেও যায়নি অথবা তারা রাসূল (ছাঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ-অনুকরণও করেন না। বরং তাদের কর্মকান্ড সমূহ বিভিন্ন শিরক-বিদ‘আতে ভরপুর।

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا، مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ- ‘তোমরা আমার ছাহাবীদের গালি দিও না। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ওহোদ পর্বতের ন্যায় স্বর্ণ দান করে, তবুও তাদের কারুর এক মুদ (৬২৫ গ্রাম) কিংবা অর্ধ মুদ আমলের সমপরিমাণ হ’তে পারবে না’।[5] অতএব ছাহাবায়ে কেরাম, রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গ থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের সৎকর্মশীল দাঈ ও কর্মীগণকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসা মুমিনগণের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

(৬) রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের উদগ্র বাসনা : রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে জান্নাতবাসী হওয়ার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদগ্র বাসনা সদা জাগ্রত রাখা। সেই সাথে ফরয ও সুন্নাত সমূহের প্রতি পূর্ণভাবে যত্নশীল হওয়া আবশ্যক। যেমন (ক) রাসূল (ছাঃ) বলেন,مِنْ أَشَدِّ أُمَّتِي لِي حُبًّا نَاسٌ يَكُونُونَ بَعْدِي، يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ رَآنِي بِأَهْلِهِ وَمَالِهِ- ‘আমার উম্মতের মধ্যে আমাকে অত্যধিক ভালবাসবে কতিপয় ব্যক্তি, যারা আমার বিগত হওয়ার পর আসবে। তাদের মধ্যে কেউ এমন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে যে, যদি সে তার পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদের বিনিময়েও আমাকে দেখতে পেত!’[6] (খ) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ فِي يَدِهِ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أَحَدِكُمْ يَوْمٌ وَلاَ يَرَانِي، ثُمَّ لَأَنْ يَّرَانِي أَحَبُّ إِلَيْهِ مَنْ أَهْلِهِ وَمَالِهِ مَعَهُمْ- ‘যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার কসম করে বলছি, তোমাদের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন তোমরা আমার সাক্ষাৎ পাবে না। অথচ আমার সাক্ষাৎ লাভ তোমাদের নিকট তখন তোমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের চেয়েও অধিক প্রিয় হবে’।[7]

বেলাল (রাঃ) শাম দেশে ছিলেন। ওমর (রাঃ) সফরে শামের ‘জাবিয়া’তে গেলে লোকেরা ওমর (রাঃ)-এর নিকট জানতে চাইলেন যে, বেলাল (রাঃ) আযান দিবেন কি-না? কারণ রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুবরণের পর বেলাল (রাঃ) আর কখনো আযান দেননি।-فَأَذَّنَ يَوْماً، فَلَمْ يُرَ يَوْماً كَانَ أَكْثَرَ بَاكِياً مِنْ يَوْمَئِذٍ، ذِكْراً مِنْهُم لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- ‘অতঃপর তিনি একদিন আযান দিলেন এবং ঐদিন এমন অঝোরে কান্নাকাটি করলেন যে, ইতিপূর্বে বেলাল আর কখনো এরূপ কান্না করেননি। কেননা আযানে রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসার স্মৃতি তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল।[8]

(৭) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা : যারা ইসলামের শত্রু, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রু, তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা নিষিদ্ধ। যেমন আল্লাহ বলেন,لاَ تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَآدُّونَ مَنْ حَآدَّ اللهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوآ آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَآءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ، ‘যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী তাদের কাউকে তুমি এমন পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। যদিও তারা তাদের পিতৃপুরুষ, সন্তানাদি, ভ্রাতৃমন্ডলী অথবা নিকটাত্মীয় হয়’ (মুজাদালাহ ৫৮/২২)। অতএব শুধুমাত্র দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্যে বাহ্যিক সদাচরণ ব্যতীত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার কতিপয় আমলী নিদর্শন

উপরে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার ক্ষেত্রে ঈমানী আলামত আলোচনার পর এক্ষণে তাঁকে ভালবাসার কতিপয় আমলী নিদর্শন আলোকপাতের প্রয়াস পাব ইনশআল্লাহ।-

(১)রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ দ্রুততার সাথে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা : এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত ও ছাহাবায়ে কেরামের বাস্তব জীবনে সংঘটিত ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ নিম্নে তুলে ধরা হ’ল।- যেমন (ক) আল্লাহ বলেন,اَلَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْم بَعْدِ مَآ أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ، لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ- ‘যারা আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়েছে নিজেরা আহত হওয়ার পরও, তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে ও তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা প্রতিদান’ (আলে ইমরান ৩/১৭২)

(খ) আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদ হারামের আয়াত (মায়েদাহ ৫/৯১) নাযিল হওয়ার পর এক ব্যক্তি এসে বলল, আপনাদের কাছে এ সংবাদ এসে পৌঁছেছে কি? তারা বললেন, কি সংবাদ? অতঃপর সে বলল, মদ হারাম করা হয়েছে। তারা বললেন, হে আনাস! এই পাত্র সমূহের মদ ফেলে দাও। আনাস (রাঃ) বললেন যে,فَمَا سَأَلُوا عَنْهَا وَلاَ رَاجَعُوهَا بَعْدَ خَبَرِ الرَّجُلِ- ‘তারা এ বিষয়ে কোন প্রশ্নও করেননি এবং ঐ ব্যক্তির সংবাদে প্রশ্নের পৃনরাবৃত্তি-ও করেননি’ (বুখারী হা/৬১৭)। কেননা আল্লাহ বলেন,وَمَآ آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا، ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও’ (হাশর ৫৯/৭)। তিনি আরও বলেন,مَنْ يُّطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ تَوَلَّى فَمَآ أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا- ‘যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহরই আনুগত্য করে। আর যে বিমুখ হয়, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর সংরক্ষকরূপে প্রেরণ করিনি’ (নিসা ৪/৮০)। অন্যত্র তিনি বলেন,يَآأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوآ أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যকার নেতৃবর্গের’ (নিসা ৪/৫৯)

(গ) ইরবায বিন সারিয়া (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন,...فَإِنَّهُ من يَّعش مِنْكُم فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ- ...‘কেননা আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে, তারা অতিসত্বর বহুবিধ মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে অাঁকড়ে ধরবে। তাকে মযবূতভাবে ধারণ করবে এবং মাড়ির দাঁত সমূহ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন থেকে বিরত থাকবে। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবন হ’ল বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই হ’ল গোমরাহী’।[9]

(ঘ) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) একদা খুৎবা চলাকালীন সময়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আগমন করলেন। তিনি তাঁকে বলতে শুনলেন, اِجْلِسُوا ‘তোমরা বসে পড়’। তখন তিনি মসজিদের বাইরে যেখানে ছিলেন, সেখানেই বসে পড়লেন। এভাবে নবী করীম (ছাঃ) তাঁর খুৎবা সমাপ্ত করলেন। আর এই ঘটনাটি তিনি জানতে পারলেন। অতঃপর তিনি দো‘আ করে বললেন,زَادَكَ اللهُ حِرْصًا عَلَى طَوَاعِيَةِ اللهِ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولِهِ- ‘আল্লাহ তোমার আগ্রহ বৃদ্ধি করুন আল্লাহর আনুগত্যে ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে’।[10]

(ঙ) মুগীরা বিন শো‘বা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে জনৈকা আনছার মেয়েকে বিবাহের বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করি। তিনি বললেন, اِذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ يُّؤْدَمَ بَيْنَكُمَا، ‘তুমি যাও এবং তাকে দেখে নাও। কেননা তাতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালবাসার সৃষ্টি হবে’। অতএব আমি উক্ত আনছার মেয়ের পিতার নিকটে এসে তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলাম এবং সেই সাথে নবী করীম (ছাঃ)-এর কথাটিও তাদেরকে অবহিত করলাম। কিন্তু আমার মনে হ’ল যে, তারা এটা অপসন্দ করলেন। রাবী বলেন, মেয়েটি পর্দার আড়াল থেকে উক্ত বর্ণনা শুনে বলল, যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আপনাকে পাত্রী দেখার আদেশ দিয়ে থাকেন, তবে আপনি দেখে নিন। অন্যথায় আল্লাহর দোহাই (আমাকে দেখবেন না)। মুগীরা (রাঃ) বলেন, আমি তাকে দেখে নিলাম এবং বিবাহ করলাম। পরবর্তীতে মুগীরা (রাঃ) তার সাংসারিক সুখ ও সুসম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে কৃতজ্ঞ হ’তেন’।[11] অতএব সার্বিক জীবনে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ দ্রুততার সাথে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রতিটি মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।

(২)রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতকে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা : চতুর্থ হিজরীতে রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক প্রেরিত ‘বিরে মাঊনা’র দাওয়াতী কাফেলার অন্যতম সদস্য হারাম বিন মিলহান (রাঃ)-কে যখন পিছন থেকে বর্শা নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি নিজ দেহের ফিনকি দেওয়া রক্ত দু’হাতে নিজের চেহারা এবং মাথায় মেখে বলে উঠলেন,اَللهُ أَكْبَرُ، فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ- ‘আল্লাহু আকবার! কা‘বার রবের কসম!! আমি সফলকাম হয়েছি’।[12] অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশে দাওয়াত প্রদান ও সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনের জন্য তিনি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। আর শাহাদত লাভের মাধ্যমে তিনি সফলকাম হয়েছেন।[13]

অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ ও সুন্নাত সমূহকে রক্ষার জন্য ছাহাবায়ে কেরাম যেভাবে সোচ্চার ছিলেন, আমাদেরকেও সেভাবে সুন্নাত রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

(৩) শরী‘আতের সর্বোচ্চ ধারক হিসাবে রাসূল (ছাঃ)-কে মেনে নেওয়া : রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার অন্যতম নিদর্শন হ’ল, রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক প্রদত্ত বিধান সর্বান্তকরণে মেনে নেওয়া। যেমন আল্লাহ বলেন,فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا- ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হ’তে পারে না, যতক্ষণ তারা তাদের মীমাংসার বিষয়ে তোমাকে ফায়ছালাকারী হিসাবে মেনে না নিবে। অতঃপর তোমার প্রদত্ত সিদ্ধান্তে তাদের অন্তরে কোনরূপ কুটিলতা রাখবে না এবং সম্পূর্ণরূপে তা মেনে নিবে’ (নিসা ৪/৬৫)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-কে দ্বীন ও শরী‘আতের সর্বোচ্চ ধারক ও বাহক হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং সর্বান্তকরণে রাসূল (ছাঃ)-এর ছহীহ হাদীছ সমূহ বাস্তব জীবনে মেনে নিতে হবে।

(৪) রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসায় বাড়াবাড়ি না করা : পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের নিয়ে তাদের উম্মতের অতিভক্তি, মতানৈক্য ও বাড়াবাড়িতে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল’।[14] তাদের উক্ত বিষয়ে সাবধান করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لاَ تُطْرُونِى كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ- ‘তোমরা আমার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমনটি খৃস্টানরা মরিয়ম তনয় ঈসাকে নিয়ে করেছে। আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূলই বল’।[15]

আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ)-এর মৃত্যুপীড়া শুরু হ’লে তিনি একটা চাদরে নিজের মুখমন্ডল ঢেকে নিলেন। যখন নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হ’ল, তখন মুখমন্ডল হ’তে চাদর সরিয়ে দিয়ে বললেন,لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ- ‘আল্লাহর লা‘নত ইহূদী ও খৃষ্টানদের প্রতি, যারা তাদের নবীগণের কবর সমূহকে সিজদার স্থানে পরিণত করেছে’।[16] এ কথা বলে তিনি মুসলমানদেরকে ভক্তির আতিশয্যে কবর পূজার শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করেছিলেন।

আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে আলাপচারিতার সময় বলল, مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ، ‘যা আল্লাহ ও আপনি ইচ্ছা করেন’। জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন,جَعَلْتَنِى لِلَّهِ عَدْلاً، مَا شَاءَ اللهُ وَحْدَهُ- ‘তুমি তো আমাকে আল্লাহর সমতুল্য গণ্য করলে। বরং (বল) একমাত্র আল্লাহ ইচ্ছা করেন’।[17]

আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে বলল,يَا مُحَمَّدُ يَا سَيِّدَنَا وَابْنَ سَيِّدِنَا وَخَيْرَنَا وَابْنَ خَيْرِنَا، ‘হে মুহাম্মাদ, হে আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার পুত্র। আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِتَقْوَاكُمْ، وَلاَ يَسْتَهْوِيَنَّكمُ الشَّيْطَانُ، أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ، وَاللهِ مَا أُحِبُّ أَنْ تَرْفَعُونِى فَوْقَ مَنْزِلَتِى الَّتِى أَنْزَلَنِى اللهُ عَزَّ وَجَلَّ- ‘হে জনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। বরং আমি আব্দুল্লাহর পুত্র ‘মুহাম্মাদ’। আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর কসম! আমি পসন্দ করিনা যে, মহান আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদা প্রদান করেছেন, তোমরা অতিরঞ্জিত করে আমাকে তার ঊর্ধ্বে উঠাবে’।[18]

(৫) রাসূল (ছাঃ)-এর সম্মান যথাযথভাবে বজায় রাখা : পৃথিবীর দিকে দিকে নাস্তিক-মুরতাদরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শান-মান হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সদা অপতৎপর থাকে। তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উচ্চ সম্মান যথাযথভাবে বজায় রাখার জন্য মুমিনদেরকে সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন,اَلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ، يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلاَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ، فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ- ‘যারা আনুগত্য করে এই রাসূলের যিনি নিরক্ষর নবী, এ বিষয়ে তারা তাদের কিতাব তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পেয়েছে। যিনি তাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ দেন ও অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করেন। তিনি তাদের জন্য পবিত্রগুলি হালাল করেন ও অপবিত্রগুলো নিষিদ্ধ করেন এবং তাদের উপর থেকে বোঝা ও শৃংখল সমূহ নামিয়ে দেন যা তাদের উপরে ছিল। অতএব যারা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাকে সম্মান করেছে ও সাহায্য করেছে এবং সেই জ্যোতির্ময় কুরআনের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে নাযিল হয়েছে, তারাই হ’ল প্রকৃত সফলকাম’ (আ‘রাফ ৭/১৫৭)

(৬) রাসূল (ছাঃ)-এর বাণীকে উপেক্ষা না করা : রাসূল (ছাঃ)-এর কোন নির্দেশ, হাদীছ অথবা বিধান পেলে মাথা পেতে মেনে নেওয়া যরূরী। যেমন আল্লাহ বলেন,وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَّكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ، وَمَنْ يَّعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالاً مُّبِينًا- ‘কোন মুমিন পুরুষ বা মুমিনা নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোন অধিকার নেই, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ প্রদান করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, সে সুস্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হবে’ (আহযাব ৩৩/৩৬)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার দাবী হ’ল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত কোন বাণী ও বিধানকে উপেক্ষা না করা এবং যথাযথভাবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে সার্বিক জীবন পরিচালনা করা।

(৭) রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানকে বাস্তবায়ন করা :

বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র, ইযম-তরীকা, জাতীয় ও বিজাতীয় মতবাদ সমূহকে পরিহার করে আল্লাহ প্রেরিত অহি-র আলোকে ঈমান আনয়ন করা প্রতিটি মুমিনের যরূরী কর্তব্য। কেননা রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধান আল্লাহর-ই প্রেরিত অহি। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى- مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى- وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى- إِنْ هُوَ إِلاَّ وَحْيٌ يُّوحَى- ‘কসম নক্ষত্ররাজির যখন সেগুলি অস্ত যায়’। ‘তোমাদের সাথী ভ্রষ্ট হয়নি এবং ভ্রান্তও হয়নি’। ‘আর সে খেয়াল-খুশীমত মনগড়া কোন কথাও বলে না’। ‘সেটিতো কেবলমাত্র অহি ব্যতীত নয়, যা তার নিকট প্রেরণ করা হয়’ (নাজ্ম ৫৩/১-৪)

রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানের প্রতি মুশরিকদের সন্দেহের প্রতিবাদে আল্লাহ বলেন,وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآنُ أَنْ يُّفْتَرَى مِنْ دُونِ اللهِ وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ الْكِتَابِ لاَ رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ- ‘আর এই কুরআন তো এমন নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত যা অন্যের কাছ থেকে রচিত হয়েছে। বরং এটি পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের প্রত্যয়নকারী এবং কিতাবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানকারী। যাতে কোনই সন্দেহ নেই। এটি জগত সমূহের প্রতিপালকের নিকট হ’তে প্রদত্ত’ (ইউনুস ১০/৩৭)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানে ঈমান আনা ও তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ভালবাসার অন্যতম প্রধান শর্ত।

[ক্রমশঃ]

-ইহসান ইলাহী যহীর

* পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. বুখারী হা/১৫; মুসলিম হা/৪৪; মিশকাত হা/৭।

[2]. মুসলিম হা/৪৪; বায়হাক্বী শো‘আব হা/১৩১২।

[3]. বুখারী হা/৬৬৩২; হাকেম হা/৫৯২২; আহমাদ হা/১৮০৭৬; ইবনুল মুলাক্কিন (৭২৩-৮০৪ হি. কায়রো, মিসর), আত-তাওযীহু লি শরহিল জামে‘ইছ ছগীর হা/৬২৬৪-এর আলোচনা; ইবনু বাত্ত্বাল কুরতুবী, শরহ ছহীহুল বুখারী ‘মুছাফাহা’ অনুচ্ছেদ ৯/৪৪ পৃ.

[4]. মুসলিম হা/২৪০৮; মিশকাত হা/৬১৩১।

[5]. বুখারী হা/৩৬৭৩; মুসলিম হা/২৫৪০; মিশকাত হা/৬০০৭।

[6]. মুসলিম হা/২৮৩২; মিশকাত হা/৬২৭৫।

[7]. মুসলিম হা/২৩৬৪; মিশকাত হা/৫৯৬৯।

[8]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১/৩৫৭ পৃ.

[9]. আবুদাঊদ হা/৪৬০৭ প্রভৃতি; মিশকাত হা/১৬৫।

[10]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ৪/৭৩; ইবনু কাছীর, আস-সীরাতুন নববিইয়াহ ৩/৪৮৭; আল-বিদায়াহ ৪/২৫৮।

[11]. ইবনু মাজাহ হা/১৮৬৬; আহমাদ হা/১৮১৬২; বায়হাক্বী হা/১৩৮৭২; মিশকাত হা/৩১০৭; ছহীহাহ হা/৯৬-এর আলোচনা।

[12]. বুখারী হা/২৮০১, ৪০৯১; আহমাদ হা/১২৪২৫; মুসলিম হা/৬৭৭।

[13]. ফাৎহুল বারী শরহ বুখারী হা/৪০৯০-এর আলোচনা ৭/৩৮৮ পৃ.।

[14]. মুসলিম হা/১৩৩৭; মিশকাত হা/২৫০৫

[15]. বুখারী হা/৩৪৪৫; মিশকাত হা/৪৮৯৭।

[16]. বুখারী হা/৪৩৫-৪৩৬; মুসলিম হা/৫৩১; মিশকাত হা/৭১২।

[17]. আহমাদ হা/৩২৪৭; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/২৯৫৭৩; ছহীহাহ হা/১০৯৩।

[18]. আহমাদ হা/১৩৫৫৩; নাসাঈ কুবরা হা/১০০০৭; ছহীহাহ হা/১৫৭২।






মৃত্যুর আগে রেখে যান পদ চিহ্ন


ভূমিকা :

যেসব আমলের উপকার আমলকারী থেকে অন্য মানুষের মাঝে সঞ্চারিত হয়, আল্লাহ রাববুল ‘আলামীনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ঐ আমলগুলোই অধিক সহায়ক। কারণ এসব আমলের উপকার ও ছওয়াব শুধু আমলকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অন্য মানুষ এমনকি অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও তা সঞ্চারিত হয়। ফলে এ কাজের ফল আমভাবে সবাই ভোগ করে।

এই উপকারী নেক আমলের মধ্যে আবার সেসব আমল আরো বেশী উত্তম, মৃত্যুর পরেও যার ছওয়াবের ধারা বন্ধ হয় না। মৃত্যুর পরে যখন মানুষ কবরে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকবে, তখন সেসব আমলের ছওয়াব কবরের জীবনে তিনি পেতে থাকবেন। এজন্য যেকোন মুসলিমের কর্তব্য হবে নশ্বর এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বে এমন কিছু আমল রেখে যাওয়া, যা দ্বারা পরবর্তীকালে অন্য মানুষ উপকৃত হবে এবং সেও এর মাধ্যমে কবরে ও পরকালে উপকৃত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا- ‘বস্ত্ততঃ তোমরা নিজেদের জন্য যতটুকু সৎকর্ম অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকটে পাবে। সেটাই হ’ল উত্তম ও মহান পুরস্কার’ (মুযযাম্মিল ৭৩/২০)

কবি বলেন,

وَكُنْ رَجُلاً إِنْ أَتَوْا بَعْدَهُ + يَقُولُونَ مَرَّ وَهَذَا الأَثَرُ

‘তুমি হও এমন মানুষ, যার পরে অন্য যারা আসবে তারা বলবে,

লোকটা চলে গেছে বটে, তবে রেখে গেছে এই পদচিহ্ন’।

আলোচ্য নিবন্ধে আমরা গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ের নানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।-

উপকারী আমলের প্রকারভেদ :

উপকার সাধনের দিক দিয়ে মানুষের আমল দু’প্রকার। (১) ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ আমল। আরবীতে বলে ‘আমলে ক্বাছের’ (عمل قاصر) (২) অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল আমল। আরবীতে বলে ‘আমলে মুতা‘আদ্দী’ (عمل متعدي)। যে আমলের উপকারিতা ও ছওয়াব শুধুই আমলকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ তা প্রথম শ্রেণীভুক্ত। যেমন- ছালাত, ছিয়াম, ই‘তিকাফ ইত্যাদি। আর যে আমলের উপকারিতা আমলকারী থেকে অন্যদের মাঝে সঞ্চারিত হয়, তা দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। এ উপকারিতা ইহলৌকিক হ’তে পারে। যেমন- মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করা, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা ইত্যাদি। আবার পারলৌকিক হ’তে পারে। যেমন- আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত প্রদান, শিক্ষাদান ইত্যাদি। এ শ্রেণীর আমলকে পরোপকারী আমলও বলা যায়।

উক্ত দু’প্রকার আমলের মধ্যে কোন প্রকার আমল শ্রেষ্ঠ সে সম্পর্কে বিদ্বানগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ উপকারী আমল থেকে অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল শ্রেষ্ঠ। জনৈক ফক্বীহ এজন্যই বলেছেন, যে ইবাদত অত্যধিক কল্যাণপ্রসূ সেই ইবাদত সর্বোত্তম। কুরআন ও সুন্নাহতে প্রচুর আয়াত ও হাদীছ রয়েছে যাতে মানুষের উপকারে আত্মনিয়োগ করতে বলা হয়েছে, তাদের কল্যাণ করতে প্রেরণা যোগানো হয়েছে এবং তাদের অভাব ও প্রয়োজন মিটাতে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। এখানে এমন কিছু হাদীছ তুলে ধরা হ’ল :

(১) আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ- ‘একজন আবেদের উপর একজন আলেমের মর্যাদা ততখানি যতখানি পূর্ণিমা রাতে তারকারাজির উপর চাঁদের মর্যাদা’।[1]

(২) খায়বার যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী (রাঃ)-কে বলেছিলেন,لأَنْ يَهْدِىَ اللهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ- ‘যদি তোমার দ্বারা আল্লাহ একজন ব্যক্তিকেও হেদায়াত দান করেন, তবে সেটি তোমার জন্য মূল্যবান লাল উটের (কুরবানীর) চাইতে উত্তম হবে’।[2]

(৩) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا- ‘যে ব্যক্তি হেদায়াত তথা ইসলামের দিকে দাওয়াত দিবে তার ঠিক ততটুকু ছওয়াব মিলবে যতটুকু তার কথা মান্যকারীদের মিলবে। মান্যকারীদের ছওয়াব তাতে মোটেও হ্রাস পাবে না’।[3]

যেসব আমলের উপকার ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেসব আমলকারী যখন মারা যায় তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল আমল যিনি করেন মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় না।

নবী-রাসূলগণকে পাঠানোর পিছনে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যই ছিল মাখলূকের উপকার সাধন। তাঁরা মানব জাতিকে আল্লাহর পথ দেখিয়ে গেছেন। তাদের জীবন-জীবিকা যাতে কল্যাণময় হয় এবং আখেরাতে তারা উপকৃত হয় সে উপায় তাঁরা বলে গেছেন। তাঁরা মানুষের সংস্রব ত্যাগ করে নির্জনে বসবাস করবেন সেজন্য আল্লাহ পাক তাদের পাঠাননি। এজন্যই নবী করীম (ছাঃ) তাঁর সেসব ছাহাবীর কাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন যারা জনগণের সাথে যোগাযোগ ছেড়ে দিয়ে নিরিবিলিতে আল্লাহর ইবাদতে মশগূল হ’তে মনস্থ করেছিলেন।[4]

মূলতঃ অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা সার্বিক বিবেচনায় বলা হয়েছে। নচেৎ অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল মাত্রই যে ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ কল্যাণমূলক আমল থেকে শ্রেয় হবে এমন কথা নয়। যেমন- ছালাত, ছিয়াম ও হজ্জ তো নিছকই ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ কল্যাণমূলক ইবাদত। আর এগুলো ইসলামের মূল স্তম্ভ ও ভিত্তি। এজন্যই জনৈক আলেম বলেছেন,إِنَّ أَفْضَلَ الْعِبَادَاتِ : الْعَمَلُ عَلَى مَرْضَاةِ الرَّبِّ فِي كُلِّ وَقْتٍ بِمَا هُوَ مُقْتَضَى ذَلِكَ الْوَقْتِ وَوَظِيفَتُهُ ‘শ্রেষ্ঠতম ইবাদত সেই আমল, যা প্রতি মুহূর্তে সময়ের দাবী মেনে মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টিকল্পে করা হয়’।[5]

মানুষের উপকার সাধন নবী-রাসূলগণের বৈশিষ্ট্য :

অন্যদের মাঝে উপকার সঞ্চারণশীল আমল বা কাজ নবী-রাসূলগণের কর্মনীতির অন্তর্ভুক্ত। যারা নবী-রাসূলগণকে মেনে চলতে চান এবং তাদের পদচিহ্ন ধরে পথ চলতে চান তাদেরও কর্তব্য মানুষের কল্যাণ সাধন করা। নবী-রাসূলগণ ছিলেন সর্বাধিক মানবদরদী। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে তাঁরা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় ও পথ বলে গেছেন। পাপাচারের অন্ধকার থেকে পুণ্যের আলোয় উদ্ভাসিত পথের দিকে মানবজাতিকে বের করে আনতে তাঁরা অবিরাম চেষ্টা করে গেছেন। যে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব ব্যতীত দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মান ও সৌভাগ্য অর্জন সম্ভব নয় সেই তাওহীদের প্রতিই ছিল তাঁদের আহবান। তাঁরা কেবল মানবজাতির জন্য পরকালীন কল্যাণের কথাই ভাবেননি বরং তাদের জাগতিক কল্যাণের কথাও তাঁদের মাথায় ছিল।

ইউসুফ (আঃ) মিসররাজের খাদ্যবিভাগ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন,قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ ‘ইউসুফ বলল, আপনি আমাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত করুন। নিশ্চয়ই আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও (এ বিষয়ে) বিজ্ঞ’ (ইউসুফ ১২/৫৫)। তাঁর এ দায়িত্বগ্রহণের ফলে জনগণের অনেক উপকার হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে যখন আশেপাশের দেশগুলো দুর্ভিক্ষকবলিত, তখন তাঁর দক্ষ পরিচালনায় মিসরীয়রা দুর্ভিক্ষ থেকে নিরাপদ ছিল।

মূসা (আঃ) যখন মিসর থেকে মাদইয়ান গমন করেন তখন তিনি একদল লোককে তাদের পশুপালের পানি পান করাতে দেখতে পান। সেখানে দু’জন কিশোরী ছিল, যারা তাদের বয়সের স্বল্পতাজনিত দুর্বলতা হেতু তাদের পশুগুলোকে পানি পান করাতে পারছিল না। তিনি কূয়ার মুখ থেকে পাথরের ঢাকনা সরিয়ে তাদের ছাগলগুলোর পানি পানের ব্যবস্থা করে দেন।[6]

নবী করীম (ছাঃ)-এর পরোপকারিতার গুণ তো সুবিদিত। এ সম্পর্কে তাঁর নবুঅত লাভের দিন খাদীজা (রাঃ) বলেছিলেন,كَلاَّ وَاللهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَقْرِى الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ- ‘কখনই নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনই আপনাকে অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায় পরিবারের দায় বহন করেন, নিঃস্ব মানুষের আয়-রোযগারের ব্যবস্থা করে দেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে চলতে গিয়ে বিপদে পতিতদের সাহায্য করেন’।[7]

এই একই পথের পথিক ছিলেন ছাহাবায়ে কেরাম ও নেককার লোকেরা।

আবুবকর (রাঃ) আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন এবং অভাবী লোকদের সাহায্য করতেন। এ কারণেই যখন তাঁর জাতি তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দিতে চাইছিল তখন ইবনুদ দাগিন্নাহ নামক জনৈক মুশরিক বলেছিলেন,إِنَّ مِثْلَكَ لاَ يَخْرُجُ وَلاَ يُخْرَجُ، فَإِنَّكَ تَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَقْرِى الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ- ‘আপনার মতো মানুষ তো নিজ থেকে দেশ ছাড়তে পারে না, আর আপনাকে দেশছাড়া করাও যেতে পারে না। আপনি তো নিঃস্ব মানুষের আয়-রোযগারের ব্যবস্থা করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায় পরিবারের দায় বহন করেন, মেহমানদের সেবাযত্ন করেন এবং সত্যের পথে চলতে গিয়ে বিপদে পতিতদের সাহায্য করেন’।[8]

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বিধবাদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং রাতে সময় করে তাদের পানি যোগান দিতেন।

আলী বিন হোসাইন (রাঃ) রাতের আঁধারে মিসকীন-অভাবীদের বাড়িতে প্রতিনিয়ত রুটি দিয়ে আসতেন। যখন তিনি মারা গেলেন তখন থেকে তাদের এ সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। ইবনু ইসহাক বলেন, মদীনাবাসীদের মাঝে কিছু মানুষ প্রত্যহ খানাপিনা লাভ করতেন, কিন্তু তারা জানতেন না যে কোত্থেকে এই খাদ্য আসে। তারপর যখন আলী বিন হোসাইন যয়নুল আবেদীন মারা গেলেন তখন থেকে তারা সে সুযোগ হারিয়ে ফেলেন যা প্রত্যহ রাতে তাদের মিলত।[9]

এমনিভাবে এই উম্মতের নেককার লোকেরা যখনই মানবকল্যাণের সুযোগ পেয়েছেন তখনই তারা সে সুযোগ লুফে নিয়েছেন। যখনই তারা এমন সুযোগ পেয়েছেন তখনই তারা খুব আনন্দিত হয়েছেন এবং এ দিনকে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন গণ্য করেছেন।

সুফিয়ান ছাওরী (রাঃ) যখন তাঁর দরজায় কোন প্রার্থী-ফকীরকে দেখতে পেতেন তখনই বলে উঠতেন, ‘স্বাগত জানাই তাকে, যিনি আমার পাপ ধুয়ে দিতে এসেছেন’।

ফুযাইল বিন আইয়ায (রহঃ) বলতেন, এই প্রার্থী-ভিক্ষুকরা কতই না ভালো! তারা আমাদের পাথেয় আখেরাত পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে বয়ে নিয়ে দাঁড়িপাল্লায় রেখে দিচ্ছে।

অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল কল্যাণের প্রতিদান কিভাবে শ্রেষ্ঠ :

অন্যদের মাঝে সঞ্চারণশীল কল্যাণের প্রতিদান কিভাবে ব্যক্তির নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ আমল থেকে শ্রেষ্ঠ হ’ল সে সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছ থেকে কিছু বাণী তুলে ধরা হ’ল :

১. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,وَالْعَصْرِ، إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ، إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ- ‘কালের শপথ! নিশ্চয়ই সকল মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতীত, যারা (জেনে-বুঝে) ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করেছে এবং পরস্পরকে ‘হক’-এর উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (আছর ১০৩/১-৩)

মুফাস্সির আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা সময়ের শপথ করেছেন যা কি-না রাত ও দিনের সমষ্টি এবং বান্দাদের ইবাদত ও আমলের ক্ষেত্র। সময়ের শপথ করে তিনি বলেছেন, মানুষ মাত্রেই ক্ষতির মধ্যে। তবে চারটি গুণবিশিষ্ট মানুষ ক্ষতিমুক্ত। [ক্রমশঃ]

 -মূল (আরবী) : মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ

-অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

[1]. আবুদাউদ হা/৩৬৪১; ছহীহুল জামে‘ হা/৪২১২।

[2]. মুসলিম হা/২৪০৬ (৩৪)।

[3]. মুসলিম হা/২৬৭৪।

[4]. বুখারী হা/৪৭৭৬; মুসলিম হা/০৫।

[5]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৮৫-৮৭।

[6]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩১৮৪২, সনদ ছহীহ (ইবনু কাছীর)।

[7]. বুখারী হা/০৩

[8]. বুখারী হা/২২৯৭, ৩৯০৫

[9]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৪/৩৯৩।

পৃষ্ঠা: 85
File Size: 655KB

File Name: নারী শিক্ষা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

Download Tags: islamic Book, Islamic Bangla Book, Islamic Bangla pdf Book, Islamic pdf book, Bangla pdf Book, pdf download, google drive link, google drive pdf download link, islamic book pdf download link, sahabider jiboni, Sahabider kahini, islamic kahini, Nobider kanini, muhammad rasullah sallahu alaihiya sallam er jibno, Hazrat Omar, hazrat Abu bokor, Hazrat Usmal, Hazrat Ali, Kholafaye Rashadin, islamic books bangla pdf,islamic book pdf file download,islamic book pdf in english,best islamic books pdf bangla, sunni islamic books bangla pdf islamic book list bangla, fera islamic book pdf free download, motivational islamic book bangla pdf download, top islamic books bangla pdf download,sunni islamic books bangla pdf, bangla kitab pdf, islamic foundation books pdf free download, islamic boi pdf, free download, islamic book pdf, rokomari islamic book, islamic history books pdf in bangla, nobider kahini bangla pdf, nobider jiboni bangla, nobider jiboni bangla pdf, nobider kahini book, nobider name, nobi golpo bangla, nobider jiboni bangla pdf, nobider jibon kahini bangla, nobider kahini bangla pdf, 25 জন নবী রাসুলের জীবনী, nobita jiboni, iqra cartoon prophet stories bangla, nobider name, hadith e jibreel in bangla,আবু বকর রাঃ এর ঘটনা, আবু বকর সিদ্দিক নামের অর্থ,hazrat abu bakr islamic date of birth, হযরত আবু বকর সিদ্দিক জীবনী pdf, biography of abu bakr siddiq pdf, হযরত আবু বকর রাঃ এর মৃত্যু, শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের নাম, সাহাবী কাকে বলে, জান্নাতী সাহাবী, জান্নাতি ২০ সাহাবীর নাম, কোরআনে বর্ণিত সাহাবীর নাম, শহীদ সাহাবীদের নাম, কোন সাহাবী, সাহাবী নাম , বিষয়ভিত্তিক ইসলামিক বই pdf, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বই pdf, ইসলামিক বই ডাউনলোড ওয়েবসাইট, গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক বই সমূহ, ইসলামিক বই pdf download, ইসলামিক বই লাইব্রেরী, সেরা ইসলামিক বই pdf, ইসলামিক বই কালেকশন,
" target="_blank">Download/View ।। ইসলামী দাওয়াহ প্রসারে গণমাধ্যমের অবদানগি

 নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

সভ্যতার চরম বিকাশের যুগেও নারীর যে অমর্যাদা ও অবমূল্যায়ন দেখা যাচ্ছে, তা আরবের আইয়্যামের জাহেলিয়াতের যুগকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু এদেশেই নয়, পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই নারী জাতি এক অসহনীয় মর্যাদাহীন পরিস্থিতির শিকার। নির্যাতন, নারী পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুকের বিভৎস অত্যাচার প্রভৃতি নিত্যকার ঘটনা আমাদের আতঙ্কগ্রস্থ করে তুলেছে। অপ্রাপ্ত বয়স্কা কিশোরী, হাসপাতালের অসুস্থ রোগিনী এমনকি মৃতা লাশ পর্যন্ত পাশবিকতার হিংস্র থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নারী কর্তৃক নারী নির্যাতনের ঘটনাও এ সমাজে ঘটছে। বিগত যুগেও নারী জাতি এমনিভাবে বিভিন্ন অজুহাতে ও কলা-কৌশলে নির্যাতিত হয়েছে। সে যুগের সমাজ নেতারা এর প্রতিরোধে কিছু কিছু চেষ্টাও নিয়েছিলেন- যা প্রায় সকল যুগেই ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যাপারে বিগত সভ্যতাগুলিতে নারীর দেওয়া মর্যাদার সাথে ইসলামের দেওয়া মর্যাদাকে আমরা তুলনামুলক অলোচনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা পাব।

১. গ্রীক যুগে নারীঃ প্রাচীন সভ্যতা সমূহের মধ্যে গ্রীক সভ্যতা ছিল সবচেয়ে নামকরা। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও চিকিৎসা শাস্ত্রে তারা তৎকালীন পৃথিবীর নেতৃত্ব দিত। কিন্তু নারীর মর্যাদা সেখানে ছিল খুবই দূর্ভাগ্যজনক । গ্রীকদের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে নারীকে ‘মানুষের দুঃখ কষ্টের মূল কারণ' হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই নোংরা আকীদা তাদের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ফলে কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ গ্রীক নাগরিকের নিকটে নারীর মর্যাদা ছিল ভূলুণ্ঠিত। অধিকাংশের নিকটে বিয়ে একটি বোঝা স্বরূপ গণ্য হয়েছিল । নারীদের প্রতি সমাজের দায়িত্ব অতটকুই ছিল যেমন পতিতালয়ের নারীদের প্রতি সমাজের দায়িত্ব। পতনযুগে গ্রীকরা ‘আফ্রোদিত' (APHRODITE) নামক প্রেম দেবীর পূজা শুরু করে। ফলে বেশ্যালয়গুলি উপসনা কেন্দ্রের ন্যায় উঁচু-নীচু সকলের জন্য সম্মেলন কেন্দ্রে পরিণত হয় । এভাবে নারীত্বের অবমাননার সাথে সাথে গ্রীক সভ্যতার মৃত্যুঘন্টা বেজে ওঠে ।

২. রোমক সভ্যতায় নারীঃ গ্রীকদের পরেই ইতিহাসে রোমান সভ্যতার স্থান। তাদের উন্নতির যুগে নারীর সতীত্ব ও সম্মানকে খুবই মর্যাদার চোখে দেখা হ'ত। সেখানে বিবাহ ও পর্দাপ্রথা চালু ছিল। বেশ্যাবৃত্তি চালু থাকলেও লোকেরা এটাকে খুবই ঘৃণা করত । কিন্তু বস্তুগত উন্নতির চরম শিখরে উঠে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যায় এবং নারীদেরকে ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে স্বাধীনতার নামে বের করে নিয়ে আসে। পুরুষের সঙ্গে পাশাপাশি তাদেরকে কর্মজগতে নামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বৈবাহিক জীবনে নেমে আসে চরম স্বেচ্ছাচার। দাম্পত্য বন্ধন শিথিল হ'তে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস দানা বাঁধতে থাকে। বিচ্ছেদের সংখ্যা ভায়াবহভাবে বাড়তে থাকে। বিবাহ এক সময় সামাজিক চুক্তির রূপ ধারণ করে। যা যে কোন সময় ভঙ্গ করা চলে । স্ত্রীরা যে কোন সময় চুক্তি বাতিল করে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিবাহের চুক্তি করতে শুরু করে। পাদ্রী জুরুম (৩৪০-৪২০ খ্রীঃ) বিগত যুগের একজন নারীর কথা বলেন, যে ৩২ জন পুরুষের সঙ্গে বিবাহের চুক্তি করেছে এবং সে তার শেষ স্বামীর ২১তম স্ত্রী ছিল । সমাজের নেতারা এইসব বিয়েকে 'ভদ্ৰ যেনা' গণ্য করতেন । রোম সামাজের নৈতিকতা বিষয়ক ইনস্পেক্টর জেনারেল কাতো (CATO) (মৃঃ ১৮৪ খৃঃ পূ) বিষয়টি স্বীকার করেন এবং সমাজে স্বেচ্ছাচারমূলক বহু বিবাহ প্রথাকে ‘মন্দ কাজ নয়' বলে মন্তব্য করেন। এইভাবে যেনার ছড়াছড়িতে রোমকদের নৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায়- যা তাদের সভ্যতার পতন ডেকে আনে ।

৩.ইউরোপীয় খৃষ্টানদের নিকটে নারীঃ রোমকদের পতনের পর ঈসায়ী ধর্ম ইউরোপীয়দের নিকট প্রসার লাভ করে। রোমকদের পতন দশা তাদের উপরে দারুণ প্রভাব ফেলে । সেকারণ তারা নারী সঙ্গ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। পাদ্রীরা ঈসায়ী ধর্মের মুখপাত্রের দাবী নিয়ে ঘোষণা করেন যে, নারী হ'ল ‘সকল পাপের উৎস' এবং মানব জাতির অভিশাপ। তারতুলিয়ান (TERTULLIAN) ক্রিসোসতাম (CHRYSOSTUM) প্ৰমুখপাদ্রীনেতারা এই ঘোষণা দিয়ে বিয়েকে যদিও হালাল রাখেন, তথাপি এটাকে ‘বিধিবন্ধ যেনা' হিসাবে নিন্দনীয় মনে করেন । খৃষ্টীয় তৃতীয় শতকে প্রচারিত এই চরমপন্থী মতবাদ সমস্ত খৃষ্টান জগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং নারীর প্রায় সকল অধিকার হরণ করে। ১৮শ শতাব্দীতে ফরাসী বিপ্লব পর্যন্ত এই অবস্থা কমবেশী চালু থাকে। কিন্তু এই চরমপন্থী ব্যবস্থা বেশী দিন টেকেনি। ১৯শ শতব্দীতে এসে আবার আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং নারী স্বাধীনতার পক্ষে তারা পাল্টা চরমপন্থী কিছু নীতি চালু করে। যেখানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা বিধান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু উভয় নীতিই ছিল চরমপন্থী এবং মানুষের স্বাভাবধর্ম বিরোধী । ফলে পূর্বেকার বিধ্বস্ত সভ্যতাগুলির ন্যায় খৃষ্টানী সভ্যতাও যৌন স্বেচ্ছাচারে ধ্বংসের পথে দ্রুত এগিয়ে গেল। আধুনিক প্রযুক্তি তাদেরকে এ ব্যাপারে আর উৎসাহ যোগাচ্ছে। গর্ভপাত সেখানে আইনসিদ্ধ হয়েছে। কুমারী মাতা এখন আর কোন লজ্জার ব্যাপার নয়। ‘কলগার্ল’ সে দেশের সভ্যতার অংশ। তাদের সাহিত্য যৌনতায় ভরে গেছে। নগ্নতা এখন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। বল্গাহীন নারী স্বাধীনতা প্রকারান্তরে নারীত্বের অমর্যাদার শামিল । তাই বলা চলে যে, বর্তমানের খৃষ্টানী বা আধুনিক সভ্যতা তাদের পূর্বসূরী রোমক ও গ্রীকদের ন্যায় ক্রমেই ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলেছে।

৪. কম্যুনিষ্ট ও সমাজতন্ত্রী বিশ্বে নারীর মর্যাদাঃ বর্তমান যুগে কম্যুনিষ্ট বিশ্বে যে সামাজিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তা মূলতঃ ইরানের প্রাচীন ‘মাযদাকী' মতবাদেরই প্রতিধ্বনি মাত্র ।বাদশাহ নওশেরওয়া এর পিতা কোবাদ এর আমলে মাযদাক” নামক জনৈক চিন্তাবিদ মত প্রকাশ করেন যে, মানব সমাজে সকল অশান্তির মূল কারণ হ'ল নারী ও অর্থ-সম্পদ। অতএব এই দু'টি বস্তু ব্যক্তি মালিকানা থেকে বরে করে জাতীয় মালিকানায় থাকতে হবে । আগুন, পানি ও মাটিতে যেমন সকলের অধিকার আছে, নারী ও সম্পদেও তেমনি সকলের সমানাধিকার থাকবে। বর্তমান সমাজতন্ত্রী বিশ্বে সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়েছে। নারীর অবস্থা সেখানে মাযদাকী আমলের চেয়ে খুব একটা পৃথক নয়। বিবাহ প্রথাটি যদিও সেখানে চালু আছে, তবুও ঘুনে ধরা কাঠের মতই ক্ষণভঙ্গুর। ফলে নারীর মর্যাদা সেখানে ক্রমেই ভোগ্যপণ্যের অবস্থায় উপনীত হচ্ছে ।

৫. ইহুদী, ব্যবিলনীয়, পরিসিক ও হিন্দ সভ্যতায় নারীঃ ইহুদীদের ধারণামতে মা ‘হাওয়া’ ছিলেন ‘মানব জাতির সকল দুঃখ-কষ্টের মূল'। এই ভূল ধারণাই ইহুদী সমাজ জীবনের সর্বত্র পরিব্যপ্ত। ফলে তাদের সমাজে নারীর মর্যাদা বলতে তেমন কিছুই ছিল না । গ্রীক সভ্যতার চরম অধঃপতন যুগে ব্যবিলনীয় ও পারসিক সভ্যতায় ব্যাপক ধ্বস নামে । ব্যবিলনীয়দের মধ্যে ব্যভিচার সাধারণ রূপ ধারণ করে। পারসিকদের মধ্যে মাযদাকী মতবাদের প্রসার ঘটে। একই সময়ে হিন্দুদের মধ্যে ‘বামমার্গী' নামক চরম নোংরা ধর্মীয় মতবাদ চালু হয়। যেখানে নারীরা পরকালীন মুক্তির ধোকায় পড়ে নিজেরা এসে ঐসব বামমার্গী সাধুদের বাড়ীতে ও মন্দিরে দেহদানে লিপ্ত হ'ত। হিন্দুদের নিকট গ্রীকদের ন্যায় নারীরা 'পাপাত্মা' বলে কথিত ছিল। সেকারণ তাদেরকে সম্পত্তির অধিকার, বিধবা বিবাহের অধিকার ইত্যাদি থেকে বঞ্চিতকরা হয়। এমনকি স্বামীহারা নারীকে ধর্মের নামে মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বিধান ও চালু করা হয়। যা ‘সতীদাহ প্রথা' নামে পরিচিত নারীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণ ও ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ নিষিদ্ধ করা হয়। গান্ধর্ব্য বিবাহ, রাক্ষস বিবাহ, শিবলিঙ্গ পুজা প্রভৃতির মাধ্যমে তারা নারীকে স্রেফ ভোগের সামগ্রী হিসাবে ব্যবহার করে। যা কমবেশী আজও চালু আছে ।

৬। প্রাক ইসলামী যুগে আরবদের নিকটে নারীঃ ইসলাম আসার প্রাক্কালে আরবীয় মহিলা সমাজে দু'টি স্তর ছিল । (ক) উচ্চস্তরের মহিলাঃ এরা ছিলেন কবিতা, বীরত্ব, চিকিৎসা, বক্তৃতা ও জ্ঞানবত্তার দিক দিয়ে সকলের নিকটে শ্রদ্ধার পাত্রী। মা খাদীজা এই স্তরেরই একজন স্বনামধন্যা বিদুষী মহিলা ছিলেন। (খ) সাধারণ স্তরের মহিলাঃ এই স্তরে মহিলারাই ছিলেন সমাজে সংখ্যাগরিষ্ট। তাদের অবস্থা বিগত পতিত সভ্যতা গুলির চাইতে বরং কোন কোন ক্ষেত্রে আর অধঃপতিত ছিল। যার জন্য কণ্যাসন্তানের জন্ম হওয়া বাপ-মায়ের নিকট খুবই দুঃখের কারণ হিসাবে প্রতীয়মান হ'ত। অনেকে এজন্য কন্যা জন্মের সাথে সাথে মাটিতে পুঁতে বা কুয়ায় ফেলে মেরে ফেলত। (সূরায়ে নাহল ৫৮, তাকভীর ৮,৯) সামাজে মেয়েদের কোন অধিকার স্বীকৃত ছিল না। বিবাহ, তালাক, সম্পত্তির অধিকার সবই ছিল পুরুষের একচেটিয়া। ঠিকা বিবাহ, বহু বিবাহ, বদলী বিবাহ, মা ব্যতীত অন্যান্য সকল মহিলা বিবাহ প্রভৃতি নোংরামি চালু ছিল। অধিকাংশ নারীই সমাজে অধিকারহীন ক্রীতদাসী হিসাবে ব্যবহৃত হ'ত। যেনা- ব্যভিচার ব্যাপকহারে চালু ছিল। ফলে সাধারণভাবে নারী ভোগের সামগ্রী হিসাবেই ব্যবহৃত হ'ত।

(৭) ইসলামে নারীর মর্যাদাঃ তৎকালীন পৃথিবীর উপরোক্ত সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইসলাম নারীর জন্য স্থায়ী মর্যাদার গ্যারান্টি দিয়ে ঘোষণা করে যে, ‘(সমাজদেহ পরিচালনার জন্য) নারী ও পুরুষ উভয়ে উভয়ের পোষাক সমতূল্য' (বাক্বারাহ১৮)। একটি গাড়ীতে যেমন দু'খানা চাকার প্রয়োজন। কিন্তু দু'খানা চাকা স্ব স্ব স্থানচ্যুত হ'য়ে একত্রিত হ'লে এ্যাকসিডেন্ট হওয়া স্বাভাবিক, তেমনি নারী ও পুরুষ উভয়ে নিরাপদ দূরত্বে পর্দায় অবস্থান করে সভ্যতার গাড়ী গতিশীল রাখবে। বলা হ'ল তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই, যে অধিকতর তাকওয়ার অধিকারী (হুজুরাত ১৩)। যেনা-ব্যভিচার, ঠিকা বিবাহ, বদলী বিবাহ সবই হারাম ঘোষণা করা হ'ল ৷ পুরুষের ন্যায় নারীকেও স্বামী, সন্তান, পিতা ও ভাইয়ের সম্পত্তিতে অংশীদার করা হ'ল । তাদের জন্য শিক্ষা গ্রহণ ফরয ঘোষণা করা হ'ল । ১৪ জন মহিলার সঙ্গে বিবাহ হারাম করে তাদের ইযযতের গ্যারান্টি দেওয়া হ'ল। ক্রীতদাসীকে মুক্তি দিয়ে বিবাহের মাধ্যমে সম্মানিত জীবন যাপন করাকে অধিক ছওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করা হ'ল। বিবাহের ব্যাপারে যাবতীয় জাহেলী রেওয়াজ বাতিল করে নারীর সম্মতি গ্রহণ, তাকে মোহরানা প্রদান এবং অলী ও সাক্ষীর মাধ্যমে বিবাহ বাধ্যতামুলক করার ফলে তাদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হ'ল। তাদেরকে খোলা তালাক প্রদান ও বিধবা বিবাহের অনুমতি দেওয়া হ'ল। 'নারী সকল অকল্যাণের মূল' এই জাহেলী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হ'ল যে, 'অমরা মানব জাতিকে (নারী- -পুরুষসহ) সম্মানিত করেছি...... এবং অন্যান্য সৃষ্টির উপরে মর্যাদা দান করেছি ‘(বনী ইস্রাঈল ৭০)। অতঃপর নারীর উপরে পুরুষের যে কর্তৃত্ব ও মর্যাদা ইসলাম ঘোষণা করেছে, তা মূলতঃ সামাজিক শৃংখলার ক্ষেত্রে মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রে নয়। রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) এরশ করেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল। নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে' (মুসলিম)। মোটকথা ইসলাম বিগত সভ্যতাগুলির দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে নারীকে সভ্যতার অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য অঙ্গ বলে গণ্য করে। ইসলামের নিকট নারী অকল্যাণকর নয়, ভোগের সামগ্রীও নয়; বরং তা সমাজের অগ্রগতিতে ও সুখে-দুঃখে পুরুষের বিশ্বস্ত ও অপরিহার্য সঙ্গিনী ।এভাবে যে ইসলাম নারী জাতিকে জাহেলিয়াতের জিঞ্জির হ'তে মুক্ত করে এক অভাবনীয় জীবন বোধের সন্ধান দিল এবং তার ফলে মা, খালা, বোন, কন্যা ইত্যাদি হিসাবে যে মহান আত্মমর্যাদা বোধ নিয়ে পুরুষ সমাজে সম্মান ও শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন করল- সেই ইলাহী বিধানকে দূরে ঠেলে দিয়ে প্রগতির ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে মর্যাদার পর্দা দূরে ছুঁড়ে ফেলে নারী আজ বাইরে পরিয়ে আসছে। আল্লাহ প্রদত্ত নিজের গোপন সৌন্দর্যকে স্বাধীনতা ও ফ্যাশনের নামে পুরুষের সামনে মেলে ধরছে। ফলে আগুন আর মোমের যে অবস্থা আজকের সমাজে স্বাভাবিকভাবে তাই-ই ঘটে যাচ্ছে। রোমক সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা, হেলেনীয় সভ্যতা প্রভৃতি বিগত সভ্যতাগুলি ধ্বংসের মূল । বীজ হিসাবে নারী যে ভাবে অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে ক্রিয়াশীল ছিল, আজকের আধুনিক সভ্যতা ধ্বংসের জন্য তথাকথিত প্রগতিবাদী নারীরাই যে দায়ী হবে, তার লক্ষণ প্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্দাহীন নারী রাস্তায় চলবে, পাশাপাশি চেয়ারে বসে চাকুরী করবে, আর পুরুষ সহকর্মী তার দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকাবে না- এটা নিতান্তই বাস্তব বিরোধী কথা। আর সে কারণেই সমাজে ঘটছে যত অঘটন । আধুনিক যুগে নারী এখন সাধারণ পণ্যের চেয়েও সস্তা। সে আজ বিজ্ঞাপনের র্যে বৃদ্ধির হাতিয়ার, সার্কাস, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ । নারী এখন বাংলাদেশের না হওয়া সত্ত্বেও নারীই আজ চরম নির্যাতনের শিকার এই অবস্থার প্রতিকারের জন্য দূরদর্শী পুরুষ সমাজকে যেমন এগিয়ে আসা প্রয়োজন, তেমনি আত্ম মর্যাদাহীন চলন্ত শোকেস সদৃশ বেপর্দা নারী সমাজকে আত্মমর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া সর্বাধিক যরূরী। ইসলাম নারীকে আত্ম মর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ করেছে ও সেই মোতাবেক তাকে সমাজ জীবন চলার জন্য কিছু স্থায়ী নিয়মপদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে। সেই শিক্ষা ও নিয়ম পদ্ধতির কঠোর অনুশীলন ও অনুসরণ ব্যতীত সমাজে নারীকে তার মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব । শুধু যে কঠোর আইন রচনা দ্বারা নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়, বিগত এরশাদ আমলে ও বেগম জিয়া এবং শেখ হাসিনার আমলে তার বাস্তব প্রমাণ দেখা গেছে।

সুতরাং যতদিন নারী তার নিজস্ব গন্ডির মধ্যে বিচরণ করার মানসিকতা অর্জন করতে না রবে যতদিন কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজেদের জীবন গড়ে তোলার মাধ্যমে চরিত্রে, বহারে, আচার- আচরণে গভীর আত্ম মর্যাদাবোধের পরিচয় দিতে না পারবে, যতদিন মাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ, উভয়ের কর্মস্থল পৃথক, রেডিও টিভিতে ও পত্র-পত্রিকা-চলচ্চিত্রে চরিত্র বিধ্বংসী প্রচারণা বন্ধ না হবে, ততদিন নারী তার সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে পারবে না।অতএব আসুন, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নির্দেশিত বিধি-বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালন করি, এবং ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে তার কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের পরিবার ও সমাজ গড়ে তুলি ৷ আমরা যেন আমাদের হারানো মর্যাদাশ পুনরুদ্ধার করে প্রাথমিক যুগের মুসলিম নারীদের ন্যায় শক্তিমান আদর্শ নারী হিসাবে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি আল্লাহ্র নিকটে কায়মনোচিত্তে সেই প্রার্থনা করি- আমীন।

মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস

আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلاَلَةٍ مِّنْ طِينٍ- ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ- ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ- ‘নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’। ‘অতঃপর আমরা তাকে (পিতা-মাতার মিশ্রিত) জনন কোষরূপে (মায়ের গর্ভে) নিরাপদ আধারে সংরক্ষণ করি’। ‘অতঃপর উক্ত জননকোষকে আমরা পরিণত করি জমাট রক্তে। তারপর জমাট রক্তকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে। অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিতে। অতঃপর অস্থিসমূহকে ঢেকে দেই মাংস দিয়ে। অতঃপর আমরা ওকে একটি নতুন সৃষ্টিরূপে পয়দা করি। অতএব বরকতময় আল্লাহ কতই না সুন্দর সৃষ্টিকারী!’ (মুমিনূন ২৩/১২-১৪)

উক্ত আয়াতগুলিতে মানব সৃষ্টির সূচনাগত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে মাটি থেকে সরাসরি আদমকে অতঃপর আদম থেকে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করার পরবর্তী পর্যায়ে আল্লাহ আদম সন্তানদের মাধ্যমে বনু আদমের বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। এখানেও রয়েছে সাতটি স্তর। যেমন : মৃত্তিকার সারাংশ তথা প্রোটোপ্লাজম, বীর্য বা শুক্রকীট, জমাট রক্ত, মাংসপিন্ড, অস্থিমজ্জা, অস্থি পরিবেষ্টনকারী মাংস এবং সবশেষে রূহ সঞ্চারণ।[1] স্বামীর শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে রক্ষিত ডিম্বকোষে প্রবেশ করার পর উভয়ের সংমিশ্রিত বীর্যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে (দাহর ৭৬/২)। উল্লেখ্য যে, পুরুষের একবার নির্গত লম্ফমান বীর্যে লক্ষ-কোটি শুক্রাণু থাকে। আল্লাহর হুকুমে তন্মধ্যকার একটি মাত্র শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করে। এই শুক্রকীট পুরুষ ক্রোমোজম Y অথবা স্ত্রী ক্রোমোজম X হয়ে থাকে। এর মধ্যে যেটি স্ত্রীর ডিম্বের X ক্রোমোজমের সাথে মিলিত হয়, সেভাবেই পুত্র বা কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আল্লাহর হুকুমে।

মাতৃগর্ভের তিন তিনটি গাঢ় অন্ধকার পর্দার অন্তরালে (যুমার ৩৯/৬) দীর্ঘ নয় মাস ধরে বেড়ে ওঠা প্রথমতঃ একটি পূর্ণ জীবন সত্তার সৃষ্টি, অতঃপর একটি জীবন্ত প্রাণবন্ত ও প্রতিভাবান শিশু হিসাবে দুনিয়াতে ভূমিষ্ট হওয়া কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার। কোন মানুষের পক্ষে এই অকল্পনীয় সৃষ্টিকর্ম আদৌ সম্ভব কী? ঐ গোপন কুঠরীতে পিতার ২৩টি ক্রোমোজম ও মাতার ২৩টি ক্রোমোজম একত্রিত করে সংমিশ্রিত বীর্য কে প্রস্ত্তত করেন? অতঃপর ১২০ দিন পরে তাতে রূহ সঞ্চার করে তাকে জীবন্ত মানব শিশুতে পরিণত করেন এবং পূর্ণ-পরিণত হওয়ার পরে সেখান থেকে বাইরে ঠেলে দেন (‘আবাসা ৮০/১৮-২০)

আল্লাহ বলেন,إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا- ‘আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি (পিতা-মাতার) মিশ্রিত জনন কোষ হ’তে, তাকে পরীক্ষা করার জন্য। অতঃপর আমরা তাকে করেছি শ্রবণশক্তি সম্পন্ন ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’ (দাহর ৭৬/২)

আধুনিক বিজ্ঞান এ তথ্য জানতে পেরেছে মাত্র ১৮৭৫ সালে ও ১৯১২ সালে। তার পূর্বে এরিস্টটল সহ সকল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল যে, পুরুষের বীর্যের কোন কার্যকারিতা নেই (সৃষ্টিতত্ত্ব ৪২১ পৃ.; নবীদের কাহিনী ১/২৫ পৃ.)। অথচ রাসূলের হাদীছ এটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে।

যেমন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহা) বলেন, ‘একদিন আনাস (রাঃ)-এর মা উম্মে সুলায়েম (রাঃ) এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ সত্য বলায় লজ্জা পান না। নারীদের স্বপ্নদোষ হলে তাদের গোসল আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। যখন সে পানি দেখে। এতে উম্মে সালামাহ লজ্জায় মুখ ঢাকেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, নারীর কি স্বপ্নদোষ হয়? তিনি বললেন, তোমার ডান হাত ধূলি ধূসরিত হৌক! না হ’লে তার সন্তান তার চেহারার সদৃশ কিভাবে হয়?’ ছহীহ মুসলিমের বর্ণনায় বর্ধিতভাবে এসেছে, ‘পুরুষের বীর্য গাঢ় ও সাদা এবং স্ত্রীর বীর্য পাতলা ও হলদে। উভয়ের মধ্যে (আল্লাহর হুকুমে) যেটি জয়ী হয় অথবা গর্ভাশয়ে প্রবেশ করে সন্তান তার সদৃশ হয়’।[2]

আল্লাহ বলেন,لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَّشَآءُ إِنَاثًا وَّيَهَبُ لِمَنْ يَّشَآءُ الذُّكُورَ- أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَّإِنَاثًا وَّيَجْعَلُ مَنْ يَّشَآءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ- ‘আল্লাহর জন্যই রাজত্ব নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের। তিনি যা চান তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে চান কন্যা সন্তান দান করেন ও যাকে চান পুত্র সন্তান দান করেন’। ‘অথবা যাকে চান পুত্র ও কন্যা যমজ সন্তান দান করেন এবং যাকে চান বন্ধ্যা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান’ (শূরা ৪২/৪৯-৫০)

বীর্য মাতৃগর্ভে ৬ দিন বুদ্বুদ আকারে থাকে। তারপর জরায়ুতে সম্পর্কিত হয়। ৩ মাসের আগে ছেলে বা মেয়ে চিহ্নিত হয় না। ৪ মাস পর তাতে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়। তাতে বাচ্চা নড়েচড়ে ওঠে ও আঙ্গুল চুষতে থাকে। যাতে সে জন্মের পর মায়ের স্তন চুষতে পারে। এ সময় তার কপালে চারটি বস্ত্ত লিখে দেওয়া হয়। আজাল, আমল, রিযিক, ভাগ্যবান বা হতভাগা।[3]

উল্লেখ্য যে, মাটি থেকে সৃষ্ট হওয়া আদমের নাম হ’ল ‘আদম’ এবং জীবন্ত আদমের পাঁজর হ’তে সৃষ্ট হওয়ায় তাঁর স্ত্রীর নাম হ’ল ‘হাওয়া’ (কুরতুবী)। আর আদম থেকেই আল্লাহ সকল মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেন,يَآأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَّاحِدَةٍ وَّخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَّنِسَآءً، وَاتَّقُوا اللهَ الَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا- ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর ঐ জোড়া থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অগণিত পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের নিকট প্রার্থনা করে থাক এবং রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সম্পর্কে সতর্ক থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষক’ (নিসা ৪/১)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা নারীদের সাথে উত্তম আচরণ কর। কারণ তাদেরকে পাঁজরের হাড় হ’তে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বাঁকা হ’ল উপরের হাড় (সে হাড় থেকে নারীদের সৃষ্টি)। অতএব তুমি যদি তাকে সোজা করতে যাও, তবে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি ছেড়ে দাও, তাহ’লে সবসময় বাঁকাই থাকবে। সুতরাং তোমরা নারীদের সাথে ভাল ব্যবহার কর’।[4]

পৃথিবীতে বিচরণশীল সকল প্রাণী আল্লাহর একেকটি পৃথক সৃষ্টি। যেমন তিনি বলেন,وَمَا مِنْ دَآبَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلاَ طَآئِرٍ يَّطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلاَّ أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ، ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রাণীকুল এবং দু’ডানায় ভর করে আকাশে সন্তরণশীল পক্ষীকুল তোমাদের মতই একেকটি সৃষ্টি’ (আন‘আম ৬/৩৮)। অতএব মানুষ ও বানর দু’টিই পৃথক জাতি। মানুষ কখনো বানর ছিল না এবং বানর কখনো মানুষ হয় না। আজও কোন বানর মানুষ হচ্ছে না। 

অতঃপর মায়ের গর্ভে শিশুর আকৃতি গঠন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ- ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি মায়ের গর্ভে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (আলে ইমরান ৩/৬)। তিনি আরও বলেন, خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَّاحِدَةٍ، ثُمَّ جَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ الْأَنْعَامِ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجٍ يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِّنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلاَثٍ، ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একজন ব্যক্তি (আদম) হ’তে। অতঃপর তার থেকে তার জোড়া (হাওয়াকে) সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন আট প্রকার গবাদিপশু। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে ত্রিবিধ অন্ধকারে একটার পর একটা সৃষ্টির মাধ্যমে’ (যুমার ৩৯/৬)। ঐ তিনটি অন্ধকার হ’ল মায়ের পেট, জরায়ু ও জরায়ু মুখ বা গর্ভাধার। আর সবকিছুই আল্লাহ নিজ হাতে করেছেন। যেমন তিনি বলেন,قَالَ يَآإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ، ‘হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু’হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে তোমাকে কোন্ বস্ত্ত বাধা দিল?’ (ছোয়াদ ৩৮/৭৫)

মানুষ সৃষ্টির ৩টি পর্যায় নির্ধারণের মধ্যে প্রথমে অবয়ব গঠন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে শক্তির আনুপাতিক হার বণ্টন, পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান ও সবশেষে রূহ সঞ্চার। মৃত্তিকাজাত সকল প্রাণীর জীবনের প্রথম ও মূল একক (Unit) হ’ল ‘প্রোটোপ্লাজম’ (Protoplasm)। যাকে বলা হয় ‘আদি প্রাণসত্তা’। এ থেকেই সকল প্রাণী সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য ফরাসী চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলী (১৯২০-১৯৯৮ খৃ.) একে Bomb shell বলে অভিহিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মাটির সকল প্রকারের রাসায়নিক উপাদান। মানুষের জীবন বীজে প্রচুর পরিমাণে ৪টি উপাদান পাওয়া যায়। অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ও হাইড্রোজেন।

আর ৮টি পাওয়া যায় সাধারণভাবে সমপরিমাণে। সেগুলি হ’ল- ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন, সালফার ও আয়রণ। আরও ৮টি পদার্থ পাওয়া যায় স্বল্প পরিমাণে। সিলিকন, মোলিবডেনাম, ফ্লুরাইন, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, আয়োডিন, কপার ও যিংক। এই ২০টি উপাদান সংমিশ্রিত করে জীবনের কণা বা Protoplasm তৈরী হয়। জনৈক বিজ্ঞানী ১৫ বছর ধরে উক্ত উপাদানগুলি মিশিয়ে জীবন সৃষ্টির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। জনৈক বিজ্ঞানী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এসব মৌল উপাদান সংমিশ্রিত করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাতে কোন জীবনের ‘কণা’ পরিলক্ষিত হয়নি (সৃষ্টিতত্ত্ব ৪০৮ পৃ.)। এই সংমিশ্রণ ও তাতে জীবন সঞ্চার আল্লাহ ব্যতীত কারু পক্ষে সম্ভব নয়। বিজ্ঞান এক্ষেত্রে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে (নবীদের কাহিনী ১/২৪)

কেননা রূহ সৃষ্টির ক্ষমতা কারু নেই। যেমন আল্লাহ বলেন,وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَآ أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلاَّ قَلِيلاً- ‘আর ওরা তোমাকে প্রশ্ন করছে ‘রূহ’ সম্পর্কে। তুমি বল, রূহ আমার প্রতিপালকের একটি আদেশ মাত্র। আর এ বিষয়ে তোমাদের অতি সামান্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৮৫)। তিনি বলেন,إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَآ أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَّقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ- فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَّإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ- ‘যখন তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন তাকে কেবল বলেন, হও। অতঃপর তা হয়ে যায়’। ‘অতএব (সকল প্রকার শরীক হ’তে) মহা পবিত্র তিনি, যার হাতে রয়েছে সবকিছুর রাজত্ব এবং তাঁর দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (ইয়াসীন ৩৬/৮২-৮৩)

সপ্তম শ্রেণীর ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ে লেখা হয়েছে, শিক্ষার্থী ‘নিসর্গ’ বলছে, ‘আমাদের আদি পুরুষেরা নাকি বানর ছিল?’ উত্তরে শিক্ষিকা ‘খুশি আপা’ তাদেরকে ‘লুসি’র গল্প শোনালেন। আর তা এই যে, ১৯৭৪ সালের ২৪শে নভেম্বর ইথিওপিয়ার হাডর এলাকায় বহু পুরানো একটি ফসিল কংকালের কিছু অংশ পাওয়া যায়। গবেষকরা বলছেন, এই কংকাল ছিল ৩২ লক্ষ বছর পূর্বেকার একজন নারীর। যার পায়ের হাড় ছিল প্রায় মানুষের মতোই। অতঃপর ‘খুশি আপা’র নির্দেশ মতে শিক্ষার্থীরা মানুষ ও সমাজ কোথা থেকে এলো’ সেটি বের করার জন্য স্ব স্ব কল্পনা মোতাবেক পরের দিন এ্যসাইনমেন্ট জমা দিল। অতঃপর ‘বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে চারপাশ দেখি’ অধ্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারা একটি ‘ফ্লো’ ছক তৈরী করে ফেলল। যেখানে ‘বিভিন্ন সময়ের মানুষ’ শিরোনামে ৪টি ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, বানর থেকে তারা অবশেষে একটি যুবতী নারীতে পরিণত হয়েছে। ‘খুশী আপা’ সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। তাতে সবাই উক্ত পরিকল্পনার প্রশংসা করল।

যদি একথা সত্য হয়, তাহ’লে প্রশ্ন হয় বর্তমান যুগের মানুষ আর ৩২ লক্ষ বছর পূর্বেকার ‘ফসিলে’র বানর কি একই? ‘ফসিলে’র ঐ বানর কি এ যুগের মানুষের মত কথা বলতে পারত? তাদের কি এ যুগের মানুষের মত মেধা ছিল? এ যুগের কথিত এসব পন্ডিতদের কান্ড দেখে মূসা (আঃ)-এর উম্মতের কথা মনে পড়ে। যখন তিনি ‘তাওরাত’ গ্রহণের জন্য ৪০ দিনের মেয়াদে তূর পাহাড়ে দ্রুত গমন করেন এবং বনু ইস্রাঈলদের তার পিছে পিছে আসতে বলেন। সেই সময় তার অনুপস্থিতিতে মুনাফিক ‘সামেরী’ স্বর্ণালংকার সমূহ পুড়িয়ে একটা গোবৎসের মূর্তি তৈরী করে। যা থেকে এক প্রকার শব্দ বের হ’ত। এতে সামেরী ও তার সঙ্গী-সাথীরা উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, هَذَا إِلَهُكُمْ وَإِلَهُ مُوسَى فَنَسِيَ- ‘এটাই হ’ল তোমাদের উপাস্য ও মূসার উপাস্য। যা সে পরে ভুলে গেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৮)

মূসা (আঃ)-এর তূর পাহাড়ে গমনকে সে অপব্যাখ্যা দিয়ে বলল, মূসা বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছে। এখন তোমরা সবাই গো-বৎসের পূজা কর’।

মূসার বড় ভাই হারূণ (আঃ) তাদেরকে বললেন, ‘হে আমার কওম! তোমরা এই গো-বৎস দ্বারা পরীক্ষায় পতিত হয়েছ। তোমাদের পালনকর্তা অতীব দয়ালু। অতএব তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল’। ‘কিন্তু সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল, মূসা আমাদের কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজায় রত থাকব’ (ত্বোয়াহা ২০/৯০-৯১)

বস্ত্ততঃ গো-বৎসের শব্দ থেকেই তারা ফিতনায় পড়ে গিয়েছিল (কুরতুবী)। অথচ সে কোন কথা বলতে পারত না এবং সে ছিল মুক-বধির ও বোবা। তবুও ইহূদী নেতারা তাকেই উপাস্য ভেবে নিয়ে পূজা শুরু করল। এ যুগেও কথিত ‘ফসিলে’র ধোঁকায় পড়ে জ্ঞানী-গুণী লোকেরা নিজেদের আদি পুরুষ বানর ছিল বলে ধারণা করেছেন। অথচ এরূপ চিন্তা করাটাও মানুষের জন্য অপমানকর।

সেদিন মূসা (আঃ) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারীদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন (বাক্বারাহ ২/৫৪)। এভাবে তাদের কিছু লোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়।

অতঃপর তিনি উক্ত শিরকের প্রচলনকারী সামেরীর শাস্তি ঘোষণা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘মূসা বলল, দূর হও। তোর জন্য সারা জীবন এ শান্তিই রইল যে, তুই বলবি, ‘আমাকে স্পর্শ করো না’। আর তোর জন্য রইল একটি নির্দিষ্ট সময়কাল। যার ব্যতিক্রম হবে না। তুই তোর সেই উপাস্যের প্রতি লক্ষ্য কর যাকে নিয়ে তুই থাকতিস। আমরা সেটিকে (গো-বৎসটিকে) জ্বালিয়ে দেবই। অতঃপর ওটাকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে ছড়িয়ে দেবই’ (ত্বোয়াহা ২০/৯৫-৯৭)

অর্থাৎ মূসা (আঃ) সামেরীর জন্য পার্থিব জীবনে এই শাস্তি নির্ধারণ করেন যে, সবাই তাকে বর্জন করবে এবং কেউ তার কাছে ঘেঁষবে না। তিনি তাকেও নির্দেশ দেন যে, সে কারও গায়ে হাত লাগাবে না। সারা জীবন এভাবেই সে বন্য জন্তুর ন্যায় সবার কাছ থেকে আলাদা থাকবে। এটাও সম্ভবপর যে, পার্থিব আইনগত শাস্তির ঊর্ধ্বে খোদ তার সত্তায় আল্লাহর হুকুমে এমন বিষয় সৃষ্টি হয়েছিল, যদ্দরুন সে নিজেও অন্যকে স্পর্শ করতে পারত না এবং অন্যেরাও তাকে স্পর্শ করতে পারত না।

যেমন এক বর্ণনায় এসেছে যে, মূসা (আঃ)-এর বদদো‘আয় তার মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সে কাউকে হাত লাগালে বা কেউ তাকে হাত লাগালে উভয়েই জ্বরাক্রান্ত হয়ে যেত’ (কুরতুবী, ত্বোয়াহা ২০/৯৫)। এই ভয়ে সে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরত। কাউকে নিকটে আসতে দেখলেই সে চীৎকার করে বলে উঠতো لامِسَاسَ ‘আমাকে কেউ স্পর্শ করো না’। বস্ত্ততঃ মৃত্যুদন্ডের চাইতে এটিই ছিল কঠিন শাস্তি। যা দেখে অপরের শিক্ষা হয়।

প্রশ্ন হ’ল, বর্তমান যুগের এসব বানরবাদীদের শাস্তি কে দিবে? অথচ দেশের বানরগুলির একটিও মানুষ না হ’লেও মানুষের বাচ্চাগুলি সর্বত্র বাঁদরামী করছে। ইভটিজিং, খুন-ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক সেবন ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। প্রশাসন তাদেরকে ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সমাজ এদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে। এরপরেও সরকারী শিক্ষা সিলেবাসের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। যাতে সমাজের অধঃপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। কি কৈফিয়ত দিবেন প্রশাসন ক্বিয়ামতের দিন?


[1]. মুমিনূন ২৩/১২-১৪; মুমিন ৪০/৬৭; ফুরক্বান ২৫/৪৪; তারেক্ব ৮৬/৫-৭।

[2]. বুখারী হা/১৩০; মুসলিম হা/৩১৩; মিশকাত হা/৪৩৩-৩৪ ‘গোসল’ অনুচ্ছেদ

[3]. বুখারী হা/৭৪৫৪; মুসলিম হা/২৬৪৩; মিশকাত হা/৮২ ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ।

[4]. নিসা ৪/১; বুখারী হা/৩৩৩১; মুসলিম হা/১৪৬৮; মিশকাত হা/৩২৩৮ ‘বিবাহ’ অধ্যায়।




Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.